বটগাছের মতো কোনও বিশাল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব যদি এ দেশের কোনও রাজ্যের মসিহা হয়ে ওঠেন তবে তাঁর বিদায়ের পর সে রাজ্যের রাজনৈতিক, এমনকী সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিবর্তনেও সেই বিদায় অনেক সময় অনুঘটক বা ক্যাটালিস্টের কাজ করে।

তামিলনাড়ু নামক রাজ্যটির ভবিষ্যৎ কী হবে সেটাই এখন ভারতের রাজনীতির পটভূমিতে এক মস্ত বড় আঞ্চলিক কিন্তু সর্বভারতীয় জাতীয় প্রশ্ন। ১৯৬৭ সালে এ রাজ্যে কংগ্রেস কামরাজের হাত ধরে বিদায় নেয় এবং সেই স্থানে প্রবেশ করে ডিএমকে।

সে দিনই বোঝা গিয়েছিল, ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সর্বভারতীয় দাপট ভেঙে একটি আঞ্চলিক দল কী ভাবে তার যাত্রা শুরু করে। তামিল জাতিসত্তার আঞ্চলিকতার প্রতিনিধিত্ব করে সে দিন আন্নার ডিএমকে। আজ ৫০ বছর পরে জয়ললিতার মৃত্যুর পর এখন এআইএডিএমকে-র ভিতর যে অভ্যন্তরীণ আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে তাতে এটা এখন স্পষ্ট।

শশীকলা এবং পনীরসেলভমের সংঘাতে এই দলটি আবার এক চৌমাথায় এসে দাঁড়িয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট শশীকলার বিরুদ্ধে শাস্তি বিধান করে দেওয়ার পর মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে পনীরসেলভমের সিংহাসনে উপবিষ্ট হওয়ার সুযোগ এসেছে। কিন্তু যিনিই মুখ্যমন্ত্রী হোন না কেন, রাজ্যে এআইএডিএমকে-র অভ্যন্তরীণ কলহের অবসান তো হবেই না বরং এই সংঘাত ক্রমশ আরও বাড়বে।

বিজেপি কী চায়? দিল্লির মসনদে বিজেপি থাকলেও কিন্তু তামিলনাড়ুতে বিজেপির ভোটব্যাঙ্ক শতকরা মাত্র তিন ভাগ। এক জন বিধায়কও নেই তাদের। বিজেপি তাই চায় শশীকলা আর পনীরসেলভম, দু’পক্ষই বেশ শক্তিশালী হয়ে উঠুক। দু’পক্ষই যদি শক্তিশালী থাকে তবে এত দিন ধরে চলতে থাকা ডিএমকে বনাম এআইএডিএমকে রাজনৈতিক মেরুকরণের ট্র্যাডিশন ভেঙে খান খান হয়ে যায়। সে ক্ষেত্রে বিজেপির মতো জাতীয় দলের একটা রাজনৈতিক পরিসর গড়ে উঠতে পারে তামিলনাড়ুতে।

বিজেপি বহু দিন থেকে এই চেষ্টা চালাচ্ছে। এই রাজ্যে সংখ্যালঘু ভোট খুবই কম। এমনকী, অন্ধ্রপ্রদেশের কংগ্রেস মুখ্যমন্ত্রী রাজশেখর রেড্ডি যখন ২০০৪ সালে শিক্ষা ও চাকুরি ক্ষেত্রে মুসলমানদের জন্য সংরক্ষণের কথা ঘোষণা করেন তখনও কিন্তু জয়ললিতা তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে এই সংরক্ষণের বিরোধিতা করেন। তামিলনাড়ুতে আরএসএস-এর শক্তি আছে কিন্তু বিজেপির প্রতিপত্তি তা সত্ত্বেও বাড়েনি। বিজেপি কখনও ভাইকো কখনও বিজয়কান্ত— নানা ধরনের চরিত্রকে উস্কানি দিয়ে আঞ্চলিক দলের এই মেরুকরণের হেজেমোনিতে ভাঙন ধরাতে তৎপর হয়, কিন্তু আজও বিজেপি সে কাজে সফল হয়নি। ডিএমকে থেকে এআইডিএমকে হয়েছে,কিন্তু পিএমকে, ডিএমডিকে, ভিসিকে প্রভৃতি দল তৈরি হয়েছে কিন্তু তারাও তো দ্বৈত রাজনীতির কাঠামো ভেঙে তৃতীয় শক্তি হতে পারেনি। রাজীব গাঁধীর হত্যা হয়েছিল এ রাজ্যে। তামিল জঙ্গি সংগঠন এলটিটিই রাজীব গাঁধীকে কেন হত্যা করেছিল? কারণ রাজীব শ্রীলঙ্কা চুক্তি করতে গিয়ে এলটিটিই-কে যে শুধু চটিয়ে দেন তা নয়, তিনি তামিল গণসমাজের বিচ্ছিন্নতাবোধ বাড়িয়ে দেন। কংগ্রেস আজও সেই বিচ্ছিন্নতার শিকার।

কংগ্রেস এখন ডিএমকে-কে সঙ্গে নিয়ে এক নতুন রাজনীতির কথা ভাবছে রাহুল গাঁধীর নেতৃত্বে। কিন্তু কংগ্রেসের নিজস্ব শক্তি কতটুকু? মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির প্রিমিয়ার হন ও পি রামস্বামী রেড্ডিয়ার। এই কংগ্রেস নেতাকে তখন বলা হত মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির প্রিমিয়ার। স্বাধীনতার পর রাজ্যের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন চক্রবর্তী রাজাগোপালাচারী। স্বাধীনতার পর নির্বাচিত সরকার গঠিত হয় ১৯৫২ সালে। রাজাজি নিজে বিধানসভা ভোটে জিতে মুখ্যমন্ত্রী হননি, তিনি নেহরুর সুপারিশে বিধানসভা পারিষদের সদস্য হন। রাজাজি দিল্লির ঘনিষ্ঠ হলেও স্থানীয় নেতা হিসাবে খুব জনপ্রিয় ছিলেন না।

এর পর অন্ধ্রপ্রদেশ পৃথক রাজ্যের মর্যাদা লাভ করে। তারপর ১৯৫৪ থেকে ’৫৭ সাল কামরাজ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হন। কামরাজের পরে আসেন এমজি রামচন্দ্রন। ’৫৭ থেকে ’৬৩ সাল কামরাজ আবার মুখ্যমন্ত্রী হন। কামরাজ সরে গেলে এম ভক্তবৎসলম রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হন। তিনি দিল্লির হিন্দিকে রাষ্ট্রভাষা করার নীতিকে স্বাগত জানিয়ে রাজ্যে জনপ্রিয়তা হারান আর তখন থেকেই সিএন অন্নাদুরাইয়ের নেতৃত্বে ডিএমকে প্রধান বিরোধী দল হিসাবে মাথাচাড়া দেয়।

আরও পড়ুন: বিতাড়িত ভাইপোকে দলে ঢুকিয়ে, দায়িত্বে বসিয়ে জেলে গেলেন শশিকলা

’৫৭ সালে রাজাজি কংগ্রেস থেকে ইস্তফা দিয়ে স্বতন্ত্র পার্টি গঠন করেন। ডিএমকে স্বতন্ত্র পার্টি এবং ফরওয়ার্ড ব্লক মিলে ’৬৭ সালে একটি জোট গঠন করে। অন্নাদুরাই নিজে আগে জাস্টিস পার্টির সদস্য ছিলেন। তিনি পেরিয়ার ই ভি রামস্বামী নাইকার–এর অনুগামী ছিলেন। পেরিয়ার দ্রাবিড়নাড়ু আন্দোলন শুরু করেন ভারত থেকে বেরিয়ে গিয়ে পৃথক দ্রাবিড় দেশ গঠনের জন্য। অন্না নিজে অবশ্য পৃথক দেশ গঠনের দাবি থেকে সরে এসে ডিএমকে-কে প্রকৃত আঞ্চলিক দলের রূপ দেন, কিন্তু কর্কট রোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি ’৬৯ সালের শেষ ভাগে মারা যান।

এর পর ডিএমকে-র কাণ্ডারী হয়ে ওঠেন করুণানিধি। কিন্তু দুর্নীতির ইস্যুতে প্রতিবাদ জানিয়ে করুণানিধির বিরুদ্ধে এমজিআর পৃথক দল করেন এডিএমকে। ’৭৬ সালে জরুরি অবস্থায় রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হয়। করুণানিধি, এমনকী পুত্র স্তালিন জেলে যান। তখন এমজি রামচন্দ্রন জনপ্রিয় ফিল্মনেতা। তিনি হয়ে ওঠেন প্রকৃত নেতা। করুণানিধি তাঁকে সাসপেন্ড করলে তিনি আরও জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। আন্না দ্রাবিড় মুন্নেত্রা কাঝাগাম (এডিএমকে) হল নতুন দলের নাম। পরে এমজিআর-এর মৃত্যুর পর ভি এন জানকী মুখ্যমন্ত্রী হন, তবে তা মাত্র এক মাসের জন্য। জয়ললিতা গঠন করেন এআইএডিএমকে। এডিএমকে-র আগে অল ইন্ডিয়া শব্দটি শুধু জুড়ে দেওয়া হয়। ’৮৯ সালে ডিএমকে আবার জেতে। ’৯১ সালে সেই ডিএমকে জয়ললিতা ঝড়ে উড়ে যায়। মজার ব্যাপার, ডিএমকে এবং এআইএডিএমকে, দু’টি দলেই ভোটব্যাঙ্ক একই দ্রাবিড় তামিল সত্তার ভোটব্যাঙ্ক।

তামিলনাড়ুতে এই ডিএমকে এবং এআইএডিএমকে-র আসা যাওয়া তারপর থেকে চলছে তো চলছেই। দু’টি দলে দু’টি কাল্ট বা মুখ— একটি করুণানিধি, অন্যটি জয়ললিতা। এখন জয়ললিতার মৃত্যুর পরে সাধারণ মানুষের সমর্থন আছে এই দলের প্রতি। এখনও ডিএমকে সে পরিসর পায়নি। কিন্তু এটাও ঠিক, জয়ার মৃত্যু এবং শশীর গ্রেফতারের পরে খেলা সবে শুরু, শেষ নয়।

(এখন থেকে ‘শাহি সমাচার’ বুধবারের পরিবর্তে প্রতি বৃহস্পতিবার প্রকাশিত হবে।)