রাজনীতিতে সত্যিই কোনও পূর্ণচ্ছেদ নেই। উত্তরপ্রদেশে ২০১৪ সালে মায়াবতী একটি আসনও করায়াত্ত করতে পারেননি। এ দিকে শতকরা প্রাপ্ত ভোটের বিচারে বহুজন সমাজ পার্টি ছিল ভারতের রাজনৈতিক দলীয় ব্যবস্থায় তৃতীয় রাজনৈতিক দল।

এ বার কর্নাটকের মতো রাজ্যেও দেখা গেল, দলিত ভোট ব্যাঙ্ক আছে। সে রাজ্যেও মায়াবতীর বহুজন সমাজ পার্টি একটি আসন লাভ করতে সক্ষম হল। ক্রমশ বেশ বোঝা যাচ্ছে, আজও গোটা দেশে দলিত ভোটের অন্যতম ব্র্যান্ড চরিত্র মায়াবতী। এ কথা সত্য, শুধু মায়াবতী নন, গোটা দেশের নানা প্রান্তে নানা ধরনের দলিত নেতার অভ্যুত্থান হচ্ছে। উত্তরপ্রদেশের চন্দ্রশেখর আজাদ অথবা গুজরাতের জিগনেশ মেবানী। কিন্তু আজও বহুজন সমাজ পার্টির মায়াবতীই হলেন সর্বভারতীয় দলিত নেতৃত্বের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর। আর তাই ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের মুখে আবার মায়াবতীর রাজনীতি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

শুধু উত্তরপ্রদেশ নয়, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান এমনকী, ছত্তীসগঢ়েও মায়াবতীর দলিত ভোটব্যাঙ্ক আছে। আর কংগ্রেস যে মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান এবং ছত্তীসগঢ়ে সবচেয়ে বড় দল, সেখানেও মায়াবতীকে অনেকগুলো আসন ছেড়ে দিচ্ছে। এ-ও তো রাজনৈতিক ভাবে খুব তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। ২০১২, ২০১৪ এবং ২০১৭— এই ভোটগুলিতে মায়াবতী তাঁর আসন হারিয়েছেন। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, ভোট এখনও অটুট আছে মায়াবতীর রাজ্যে।

২০১৩-র নির্বাচনের ডেটা অ্যানালিসিস থেকে জানা যাচ্ছে, ২৩০টি আসনে মধ্যপ্রদেশে বিএসপি এবং কংগ্রেস সম্মিলিত হলে বিজেপির সঙ্গে তার ব্যবধান কতটা? দেখা যাচ্ছে, ব্যবধান শুধুমাত্র শতকরা ২.২১ ভাগ। মধ্যপ্রদেশে বিএসপি মাত্র চারটি আসনে জিতেছিল। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, তার ভোটব্যাঙ্ক অনেকটাই। দলিত ভোটারদের একটা বড় অংশ কিন্তু মধ্যপ্রদেশেও মায়াবতীর অনুগত। বিশেষত চম্বল উপত্যকা এলাকায় দলিতদের জনসংখ্যার ঘনত্ব এখনও অনেকটা। মধ্যপ্রদেশে ১৪ বছরের দীর্ঘ শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার হাওয়া তো থাকবেই। আমরা যাকে বলি অ্যান্টি ইনকাম্বেন্সি। মায়াবতী নিজে কতগুলো আসন পাবেন জানি না, কিন্তু বিজেপির খেলা আটকাতে সক্রিয় নির্ধারক ভূমিকা নিতে পারেন মায়াবতী।

রাজস্থানে এর আগে কংগ্রেস ও বহুজন সমাজ পার্টির মোট ভোট ছিল শতকরা ৩৭ ভাগ। বিজেপি অবশ্য ১৬৫টা আসন পায়। আর বিএসপি পায় ২৪টা। এখন রাহুল গাঁধী মনে করছেন, যদি ভোটের আগেই কংগ্রেস ও বহুজন সমাজ পার্টি নির্বাচনী আসন সমঝোতা করে, তা হলে শতকরা ভোটটা আসনে অনেক বেশি সংখ্যায় প্রতিফলিত হতে পারে। ছত্তীসগঢ়ে দু’টি দল মিলে বিজেপির চেয়ে শতকরা ৩.৫৪ ভাগ ভোট বেশি পায়। শাসক দল রমন সিংহ সরকার অবশ্য ৪৯টির মধ্যে ৪০টি আসনে জেতে।

দলিত ভোটারদের একটা বড় অংশ মধ্যপ্রদেশেও মায়াবতীর অনুগত। ফাইল চিত্র।

এ বার তাই কংগ্রেস এবং বহুজন সমাজ পার্টির যদি নির্বাচনী আঁতাঁত না হয়, তা হলে ভোটে রাহুল ও মায়াবতী, দু’জনের জন্যই একটা নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হবে। উত্তর ভারতের সবগুলি রাজ্য তো বটেই, দক্ষিণ ও পশ্চিম ভারতের বহু রাজ্যেও দলিতদের শক্তিশালী ভোটব্যাঙ্ক আছে।

মোদী এবং অমিত শাহ-র বিজেপি দলিত সমাজের জন্য অনেক কথা ঘোষণা করেছে। অনেক বিজ্ঞাপন। তা ছাড়া দলিত দলীয় কর্মীদের বাড়িতে মধ্যাহ্নভোজন করেছেন শীর্ষনেতারা। কিন্তু আরএসএস তথা সঙ্ঘ পরিবার দলিত সমাজের জন্য যতই বড় বড় কথা বলুন না কেন, বাস্তবের জমিতে বিজেপি যে হিন্দুত্বের প্রচার করে, তা সাধারণ ভাবে উচ্চবর্ণ, বিশেষত ব্রাহ্মণ কেন্দ্রিক। দলিত সমাজকে তাত্ত্বিক ভাবে হিন্দু সমাজের অঙ্গ বলা হলেও বাস্তবে সঙ্ঘ পরিবারকে দলিত বিরোধী উচ্চবর্ণের কর্তৃত্ব কেন্দ্রিক বলেই সাধারণ ভাবে মনে করা হয়। আরএসএস তথা সঙ্ঘ পরিবার বিজেপি এবং বিশ্ব হিন্দু পরিষদ বরাবর উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণ্যতন্ত্র দ্বারা পরিচালিত। অবশ্য আডবাণী যখন দলের সভাপতি ছিলেন, তখন থেকেই দলের নেতৃত্বে দলিত সমাজকে আনার কৌশল রচনা হয়। আডবাণী নিজে বঙ্গারু লক্ষণকে দলের সভাপতি করেন। বিজেপির তৎকালীন বিশিষ্ট নেতা গোবিন্দাচার্য ওবিসি তফসিলি জাতি–উপজাতি, এক কথায় দলিত সমাজকে ভোটে টিকিট দিয়ে এক ধরনের সোস্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং শুরু করেন। এই শব্দটিও গোবিন্দজির খুব প্রিয় ছিল। তিনি কথায় কথায় এই শব্দটি ব্যবহার করতেন। নরেন্দ্র মোদী নিজেও জন্মসূত্রে ওবিসি। তবে কখনওই গোটা দেশে তাঁর ভাবমূর্তি ওবিসি নেতা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

আরও পড়ুন: নজরে ৪০০, একের বিরুদ্ধে এক প্রার্থী দিতে আসরে রাহুল

মোদী ক্ষমতায় আসার পর দলিত সমাজের জন্য অপটিকস কিছু কম হয়নি। দলিত বাড়িতে গিয়ে অমিত শাহ এবং বিজেপি নেতাদের নিয়মিত মধ্যাহ্নভোজন, তার ছবি তোলা, এ সবই আমরা প্রতিনিয়ত দেখছি। কিন্তু বাস্তবে কী দেখলাম? দেখলাম, উত্তরপ্রদেশ-বিহার প্রভৃতি রাজ্যে দলিতদের সঙ্গে হিন্দু উচ্চবর্ণের সংঘর্ষ, বিবাদ, সন্ত্রাস হয়েই চলেছে। চার বছর অতিবাহিত হওয়ার পর দলিত সমাজ, কৃষক সমাজ, অর্থনৈতিক দিক থেকে পিছিয়ে পড়া মানুষের ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ গোটা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। আর সেই অসন্তোষের পটভূমিতে উঠে আসছেন আবার মায়াবতী।