ফিলিপস ট্যালবট। ’৪৭ সালে ভারত যখন স্বাধীন হল তখন এই মার্কিন সাংবাদিক এ দেশে কর্মরত। তিনি দেশভাগের সাক্ষী। তিনি আমেরিকার এশিয়া সোসাইটির প্রেসিডেন্ট এমিরেটাস হয়েছেন। তবে দেশভাগের সময় ফিলিপস ছিলেন শিকাগো ডেইলি নিউজের সাংবাদিক। তিনি কেনেডি প্রশাসনে পূর্ব এবং দক্ষিণ এশিয়ার কার্যকলাপের বিষয়ে সহকারী সচিব হিসেবে কাজ করেন। ১৯৬৫ থেকে ’৬৯— এই দীর্ঘ সময়ে তিনি গ্রিসের রাষ্ট্রদূত ছিলেন। ভারত সরকার ফিলিপস ট্যালবটকে পদ্মশ্রী সম্মানও দিয়েছিল। ট্যালবটের একটি বইও সে সময় খুব জনপ্রিয় হয়। বইটির নাম An American witness to India’s partition.

এই বইটির একটি অধ্যায় হল পাকিস্তান। সেখানে তিনি লিখেছিলেন, এই বিভাজনের ফলে পাকিস্তানের প্রাকৃতিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান করা আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। সাংবাদিক ট্যালবট লিখেছেন, তিনি পাকিস্তানে গিয়ে প্রাসঙ্গিক প্রায় একশো জনের সঙ্গে কথা বলেন। তাঁর মনে হয়েছিল এই নতুন দেশের জন্য উৎপাদন, প্রতিভা তৈরি করা, এ সব সহজ কাজ নয়। আর পাকিস্তানের এই ‘প্লবতা’ (buoyancy) শব্দটি ট্যালবট নিজেই ব্যবহার করেন। অদ্ভুত ব্যাপার। দুর্ভাগ্যজনক। আজ এত বছর পরেও পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলির অনেকটাই সমাধান হয়নি, ফলে গণতান্ত্রিক ভাবে নির্বাচিত শাসকদলের চেয়ে সামরিক কর্তাদের দাপট সে দেশে বেশি। আর তাই জিয়াউল হকের অসমাপ্ত কর্মসূচি কাশ্মীর দখল আজও পাকিস্তানের সর্বপ্রধান রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার।

 

ফিলিপস ট্যালবট।

পাকিস্তান তো পাকিস্তানেই আছে। সমস্যা হচ্ছে, আমরাও কি ভোটের রাজনীতি করতে গিয়ে কাশ্মীর নিয়ে রাজনৈতিক অপরিপক্কতার নিদর্শন রাখছি না? কাশ্মীর সমস্যার সমাধানে মোদী সরকারও কি সুষ্ঠু সামঞ্জস্যপূর্ণ নীতি নিয়ে এগোচ্ছে? এই যে প্রাক্তন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি চিদম্বরমের বক্তব্যের ভিত্তিতে স্বশাসন নিয়ে বিতর্ক শুরু করা, এটা কি উচিত কাজ? অন্য কেউ নন, খোদ প্রধানমন্ত্রী বললেন, পি চিদম্বরম নাকি দেশদ্রোহীদের সঙ্গে আপস করেছেন। অথচ, মোদী নিজেই প্রাক্তন গোয়েন্দাপ্রধানকে নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে কাশ্মীর পাঠাচ্ছেন মধ্যস্থতাকারী হিসেবে সব পক্ষের সঙ্গে কথা বলার জন্য। বার বার বলা হচ্ছে, সব পক্ষ মানে সব পক্ষ।

চিদম্বরম কী বলেছিলেন? কাশ্মীরে আজাদি মনস্তত্ত্বের শিকড়টা কোথা থেকে উত্থিত সেটা বুঝতে হবে। এই সাংবিধানিক চৌহদ্দির মধ্যে থেকেই আরও স্বায়ত্তশাসনের সম্ভাবনা বিচার করা যেতে পারে, তাতে আজাদির আওয়াজ নিয়ন্ত্রিত হতে পারে। শুধুমাত্র ‘আজাদ’ শব্দটি শুনেই তাঁকে পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত করা কি উচিত কাজ?

১৯৫০ সালের ২০ জানুয়ারি ট্যালবট তাঁর এক প্রতিবেদনে লিখেছিলেন, কাশ্মীর নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের ৩০ মাস পুরনো বিতর্ক আরও জটিল হয়ে উঠেছে। বিশেষত রাষ্ট্রপুঞ্জ কাশ্মীর নিয়ে কোনও সক্রিয়তার নিদর্শন রাখলো না। এর ফলে পাকিস্তানেও হতাশা ও তিক্ততা বেড়ে গেছে। পাকিস্তান হয়ে উঠেছে এক ‘হ্যাভ নট’ দেশ। লাহৌরকে নয়, জিন্না করাচিকে পাকিস্তানের রাজধানী করেছিলেন প্রথমে। সেই করাচিই হোক আর উত্তর-পশ্চিম ফ্রন্টিয়ার এলাকাতেই হোক, কাশ্মীর ছিল ভারতের বিরুদ্ধে অসন্তোষের এক মস্ত বড় কারণ।

স্বাধীনতার পর সত্তর বছর অতিবাহিত। আজও পরিস্থিতি একই জায়গায়। তৈলাক্ত বাঁশে বাঁদরের ওঠানামা। ভারত-পাকিস্তান-কাশ্মীর। ভারত ও পাকিস্তানের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নতির সঙ্গে কাশ্মীর সমস্যা ঘনিষ্ঠ ভাবে জড়িত। ভোটের কথা ভাবতে ভাবতেই সময় গেল। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বললে আমরা আহ্লাদিত। চিন-পাকিস্তান অক্ষের বিরুদ্ধে আমরা পাল্টা মঞ্চ গড়তে সক্রিয়।

আফগানিস্তানে তালিবান সমস্যায় শুধু তো পাকিস্তান নয়, রাশিয়ার সাম্প্রতিক ভূমিকা নিয়েও আমরা যথেষ্ট উদ্বিগ্ন। কিন্তু গত তিন বছরে বিদেশনীতি কি পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করতে সক্ষম হয়েছে? ১৯৪০ সালে কাশ্মীরের এক প্রত্যন্ত গ্রামে যান ট্যালবট। এক সামাজিক সমীক্ষার জন্য তিনি সেই গ্রামটিতে তিন মাস ছিলেন। ট্যালবট ১৯৫০-এর জানুয়ারিতে এক বার সেই গ্রামে যান। তিনি লেখেন, হয়তো গ্রামটির সঙ্গে এখনও শহরের সংযোগ রক্ষাকারী পাকা রাস্তা তৈরি হয়নি, বাজার-ডাকঘর সব সরু সরু গলির মধ্যে। গলিগুলিও কর্দমাক্ত। একটি ছোট মসজিদের সামনেই জমে থাকা জঞ্জাল। আবর্জনার স্তূপ। কাঠ ও মাটির কিছু নতুন বাড়ি তৈরি হয়েছে। কিন্তু সামাজিক জীবন অনেক বদলে গিয়েছে। কমেছে মৃত্যুর শতকরা হার। অর্থনৈতিক দিক থেকে সেই দশ বছরে গ্রামবাসীদের নাকি অবস্থা খারাপ হয়। তীব্রতর হয় মূল্যবৃদ্ধি ও মুদ্রাস্ফীতি। চালের দাম দ্বিগুণ থেকে তিন গুণ হয়ে যায়। বাজারের যে কোনও পণ্যের মূল্য পাঁচ থেকে ছ’গুণ লাফিয়ে লাফিয়ে ওঠে।

১৯৪০ সালে কাশ্মীরের মানুষ শেখ আবদুল্লার ‘নতুন কাশ্মীর’ গড়ার স্লোগানে মুগ্ধ ছিল। শেখ আবদুল্লা কৃষি সংস্কারের কথা বলেছিলেন। কিন্তু ১৯৫০ সালে গিয়ে ট্যালবট দেখলেন, মানুষ নতুন কাশ্মীর নিয়ে যত না আলোচনা করছেন, শেখ আবদুল্লার কৃষিক্ষেত্রে সংস্কারে যতটা আস্থা রাখছেন, তার থেকে বেশি আলোচনা করছেন ভারত-পাকিস্তান সংঘাত নিয়ে। আলোচনা হচ্ছে দিল্লির সঙ্গে না গিয়ে করাচির সঙ্গেই যাওয়া উচিত ছিল কি না! ট্যালবটের মনে হয়েছিল এ তো ভাল লক্ষণ নয়। এমনকী, ট্যালবট দেখেন, কিছু যুবক মার্কসবাদের পরিভাষায় সমাজবিপ্লবের কথাও বলছেন।

২০১৭ সালে ট্যালবটের এই বইটি পড়তে পড়তে ভাবছি, আজও তো কাশ্মীর অগ্নিগর্ভ। আজও পরিস্থিতি সঙ্কটজনক। আজও মোদী সরকারের সমাধান সূত্র ধোঁয়ায় ঢাকা। কখনও তিনি হুরিয়তদের সঙ্গে কথা বলার জন্য ভারত-পাক বিদেশ সচিব পর্যায়ের বৈঠক বাতিল করেন। আবার কখনও লালকেল্লা থেকে স্বাধীনতা দিবসে কাশ্মীরিদের গলা জড়িয়ে মূলস্রোতে ফিরিয়ে আনার কথা বলেন। ৩৭০ ধারা থেকে ৩৫এ নিয়ে যত আলোচনা হয়, কাশ্মীরের উন্নয়ন নিয়ে ঠিক ততখানি আলোচনা হয় না।