প্রথম দিন ক্রোপোটকিনস্কায়া মেট্রো স্টেশনের বাইরে একটা বেঞ্চে বসে র‌্যাপ খেতে খেতে হঠাৎ চোখে পড়েছিল ফলকটা। ‘সাল ১৯৩৫’। ওটুকুই বুঝতে পারলাম। বাকি সব সিরিলিক লিপিতে। তবে অনুমান করে বোঝা গেল, ওই বছরেই চালু হয়েছিল এই মেট্রো স্টেশন।

মস্কো শহরের বয়স প্রায় ৯০০ বছর, তৈরি হয়েছিল ১১৪৭ সালে। তবে তার চেয়েও যেটা বড় কথা, তা হল সহস্রাব্দ-প্রাচীন ইতিহাস প্রায় জ্যান্ত অবস্থাতেই রয়েছে সেখানে। এবং সে দেশের মানুষের প্রাচীনতার ধারণাও তেমনই। কেমন? যেমন গাইডকে একটা পোস্ট অফিস দেখিয়ে জানতে চেয়েছিলাম, এই বাড়িটা কবে তৈরি? তিনি বলেছিলেন, ‘নতুন’। নতুন মানে? ‘এই উনিশ শতকের গোড়ায় তৈরি।’

ঠাট্টা নয়। ইতিহাস-ভাবনা ও দেশে এমনই। মস্কো তথা গোটা রাশিয়ার উপর দিয়েই কম ঝড়ঝাপটা যায়নি গত হাজার বছরে। এক কালে ইউরোপীয় রাজাদের মধ্যে মারামারি কাটাকাটি, তার পরে মোঙ্গল আক্রমণ, জার আমলে অসংখ্য বিদ্রোহ, সর্বোপরি সোভিয়েত ইউনিয়নের পত্তন ও পতন— এ সবের ভিতরেও হাজার বছরের পুরনো বাড়িগুলো আজও দেখলে ঠিক যেন হাজার বছরের পুরনো বলেই মনে হয়। আর এমন ঝকঝকে করে রাখা, যেন মনে হয় সদ্য ঝাড়পোঁছ, রংচং হল!

আরও পড়ুন: পাখি দেখার সেরা ঠিকানার সুলুকসন্ধান

একে বিশাল, ব্যাপ্ত শহর। তার উপরে সমস্ত খুচরো ইতিহাসের নমুনা পর্যন্ত সংগ্রহ করে রাখা। অতএব, এ শহর এক বারে পুরোটা ঘুরে ফেলা সম্ভব নয়। কার কোন দিকে আগ্রহ, সেই অনুযায়ী কয়েকটা ভাগ করে নেওয়া যেতে পারে। যেমন সম্রাট এবং তাঁর অতুল সম্পদে যাঁর আগ্রহ, তাঁকে অবশ্যই যেতে হবে ক্রেমলিন প্রাসাদের তিনটি অংশে।

এক, প্যাট্রিয়ার্কস প্যালেস। সপ্তদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে মস্কোর তৎকালীন বিশপ প্যাট্রিয়ার্ক নিকনের জন্য তৈরি হয়েছিল এই আনুষ্ঠানিক ‘ক্রস হল’। রুশ সম্রাট জার ও রাষ্ট্রদূতদের ভোজনপর্ব বা ফিস্ট আয়োজিত হত এখানে।

ইতিহাসের ছাপ অট্টালিকার অন্দরেও। 

দুই, আর্কেঞ্জেল ক্যাথিড্রাল। জারদের রাজ্যাভিষেক, বিবাহ ও শেষকৃত্য হত এখানে। ১৩৩৩ সালে মহা-মন্বন্তরের সঙ্কট কাটার পরে এটি তৈরি করিয়েছিলেন মস্কোর গ্র্যান্ড ডিউক ইভান কালিতা। মনে করা হয়, মস্কোর রাজকুমারদের অভিভাবক আর্কেঞ্জেল মাইকেলের উদ্দেশে নিবেদিত এই ক্যাথিড্রাল।

তিন, আর্মারি বা অস্ত্রাগার। ১৫১১ সালে মস্কোর গ্র্যান্ড প্রিন্স তৃতীয় ভ্যাসিলির তত্ত্বাবধানে রাজকীয় হাতিয়ার ও রাজ-আদালতের রাজদণ্ড নির্মাণ এবং সঞ্চিত রাখার জন্য অস্ত্রাগারটি প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে সেখানে গহনা, আইকন ফ্রেম ও এমব্রয়ডারির কাজও হয়। জার পিটার দ্য গ্রেটের শাসনকালে সব শিল্পী, স্বর্ণকার ও রৌপ্যকারকে সেন্ট পিটার্সবার্গে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। অস্ত্রাগারটি পরিণত হয় রাজসম্পদের সংগ্রহশালায়। আজও চোখ ঝলসে দেওয়ার মতো সম্পদ সেখানে। সুতরাং ক্রেমলিনে ঢুকলে অস্ত্রাগার ঘুরে দেখার জন্য কিছুটা সময় রাখা উচিত।

আরও পড়ুন: অপার নিস্তব্ধতায় মোড়া ভালবাসার চারখোল

কেউ যদি সোভিয়েতের ইতিহাসে আগ্রহী হন, তা হলে তার পীঠস্থান বলতে হয় লেনিনের সমাধিকে। হোটেলের রিসেপশনে জানা গেল, এখনও সেই সমাধি দেখতে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মানুষ আসেন কমিউনিস্ট কিংবা পূর্বতন কমিউনিস্ট দেশ থেকে। যেমন চিন, উত্তর কোরিয়া, কিউবা বা জার্মানি। ক্রেমলিনের দেওয়ালের বাইরে অবস্থিত লেনিনের সমাধিস্থল। সেখানে প্রবেশ করে তাঁকে শ্রদ্ধা জানাতে গেলে রেড স্কোয়্যারের আর এক প্রান্তে গিয়ে লাইন দিতে হয়। অনেক অপেক্ষার পরে পৌঁছনো যায় লেনিনের দেহের কাছে। ১৯২৪ সাল থেকে আজ পর্যন্ত, নশ্বর দেহটিকে রাসায়নিকের মাধ্যমে ঠিক তেমন ভাবেই রেখে দেওয়া হয়েছে।

মস্কো শহরের মেট্রোও অবশ্য-দ্রষ্টব্য। এক একটা স্টেশন এক একটা শিল্পকর্ম। কোনওটায় শ্বেতপাথর কিংবা সোনার কারুকাজ, কোনওটায় ফ্রেস্কো। ১৬টা রুট ও ২২৪টি স্টেশন সংবলিত মস্কো মেট্রোয় রোজ ৭০ লক্ষ মানুষ যাতায়াত করেন। প্রত্যেক দু’মিনিট অন্তর মেট্রো থাকার কারণে ভিড়ে ধাক্কাধাক্কি সে ভাবে হয় না। তবু ঘুরে দেখতে হলে শনি-রবির সকাল কিংবা অন্য পাঁচ দিন রাত ৮টার পরেই মেট্রোয় ওঠা ভাল। চমকের শেষ নেই। কোনও কোনও এস্ক্যালেটরে উঠতে বা নামতে আড়াই থেকে তিন মিনিটও লাগতে পারে। কারণ, বহু স্টেশনই মাটির অনেক নীচে। যেমন পার্ক পোবেদি স্টেশনের গভীরতা ২৭৬ ফুট (৮৪ মিটার)। আর সবচেয়ে সুন্দর পাঁচটা স্টেশনের তালিকায় অবশ্যই থাকবে কমসোমলস্কায়া, বেলোরুসস্কায়া, মায়াকভস্কায়া, তিত্রালনায়া ও প্লোশ্‌চাদ রেভোলিউৎসাই।

আরও পড়ুন: ফিনিক্সের আর এক নাম কিউবা: পরমব্রত

কেজিবি-র সদর দফতর লুবিয়াঙ্কা দেখার জন্য একটা বাড়তি উৎসাহ থাকবেই। যদিও সেই সোভিয়েতও নেই, গুপ্তচর পুলিশও নেই। কিন্তু আজও লুবিয়াঙ্কায় পর্যটক তথা জনগণের প্রবেশ নিষেধ। রুশবাসীর আতঙ্কের কুখ্যাত বাড়িটি তৈরি হয়েছিল ১৯০০ সালে। তখন সেটা ছিল বিমা সংস্থার সদর দফতর। নভেম্বর বিপ্লবের পরে ১৯১৯ সালে বলশেভিক গুপ্ত পুলিশ ‘চেকা’ সেটা দখল করে এবং গুপ্তচর বাহিনীর নাম বদলালেও (যথাক্রমে ওজিপিইউ, এনকেভিডি, এমজিবি, কেজিবি) ঠিকানা বদলায় না।

এত ক্ষণ যে সব দ্রষ্টব্যের নামোল্লেখ করা হল, সে সবই মোটামুটি ভাবে একটি এলাকায় অবস্থিত। ক্রেমলিন ও কিটাই গোরোদ চত্বর। নিঃসন্দেহে এটাই মস্কোর ঐতিহাসিক, ভৌগোলিক ও ধর্মীয় প্রাণকেন্দ্র। ৯০০ বছর ধরেই। ক্ষমতাবান ক্রেমলিন প্রাসাদ, সেন্ট বেসিলস ক্যাথিড্রালের গম্বুজ (যা মস্কো তথা রাশিয়ার প্রতীক) এবং ভ্লাদিমির লেনিনের গ্রানাইট স্মৃতিসৌধই তো দেখতে আসেন পর্যটকরা। প্রত্যেক দিন সুবিপুল রেড স্কোয়্যারের গমগম করে ওঠা দেখেই তা