Advertisement
E-Paper

উচ্চ মাধ্যমিকে সাফল্য বন্ধুর ‘চোখের আলো’র

এ ভাবে পড়াশোনা চলার সময়েই সর্বশিক্ষা মিশনের সঙ্গে কাজ করা এক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা রেশমার সাহায্যে এগিয়ে আসে। তারা ওই পড়ুয়াকে একটি ‘টকিং বুক’ দেয়, যাতে সব ক’টি পাঠ্য বই রেকর্ড করা রয়েছে।

দীক্ষা ভুঁইয়া

শেষ আপডেট: ০১ জুন ২০১৯ ০১:১২
ভরসা: মার্কশিট হাতে বন্ধু অনুশ্রীর সঙ্গে রেশমা (সামনে)। নিজস্ব চিত্র

ভরসা: মার্কশিট হাতে বন্ধু অনুশ্রীর সঙ্গে রেশমা (সামনে)। নিজস্ব চিত্র

ছোটখাটো চেহারার মেয়েটি স্কুলে ভর্তি হতে এলে শিক্ষকেরা জানতে পারেন, সে একটি চোখেও দেখতে পায় না। ছোটবেলায় প্রথমে ডান, পরে বাঁ চোখ— দু’টিরই দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হয়ে গিয়েছে। কিন্তু হার মানেনি একাদশ শ্রেণিতে পড়তে আসা রেশমা খাতুন।

দৃষ্টিহীনদের একটি স্কুল থেকে মাধ্যমিক পাশ করেছে রেশমা। কিন্তু উচ্চ মাধ্যমিকের পড়াশোনার জন্য আশপাশে কোনও ব্লাইন্ড স্কুল পায়নি সে। তাই মাধ্যমিক পাশ করেই মগরাহাট এক নম্বর ব্লকের শেরপুর রামচন্দ্রপুর হাইস্কুলে ভর্তি হয় সে। সেখানে দৃষ্টিহীন পড়ুয়াদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা না থাকলেও, তাকে ভর্তি নিতে আপত্তি করেনি স্কুল। বরং রেশমাকে কী ভাবে পড়ানো হবে, তা নিয়ে শুরু হয় নানা ভাবনা। স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক জ্ঞানরঞ্জন নস্কর ও সহকারী শিক্ষক পল্লব সেনগুপ্ত সিদ্ধান্ত নেন, রেশমার জন্য কিছু বিশেষ ব্যবস্থা করার।

রেশমাকে কে বই পড়ে দেবে? কে-ই বা তাকে স্কুল পর্যন্ত নিয়ে আসবে? সে ভাবনার ভার নেন স্কুলের শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মীরাও। একাদশ শ্রেণিতে প্রথম দিনই রেশমাকে নিয়ে গিয়ে পরিচয় করিয়ে জানতে চাওয়া হয়, তার সঙ্গী হয়ে টানা দু’বছর সাহায্য করবে কে। সেই সময়েই এগিয়ে আসে একাদশ শ্রেণির আর এক পড়ুয়া অনুশ্রী চক্রবর্তী। প্রথম দিনই স্কুলের শিক্ষকদের অনুশ্রী জানায়, এই কাজ করতে আগ্রহী সে। পাশে থাকার আশ্বাস দেয় ওই ক্লাসের আরও কয়েক জন পড়ুয়া।

এর পর থেকে শুরু হয় অনুশ্রীর অক্লান্ত পরিশ্রম। পল্লব সেনগুপ্তের কথায়, নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে রেশমার বাবা নেই। মায়েরও তেমন কোনও রোজগার নেই। বোন জরির কাজ করে যা আয় করে, তাতে সংসারের পাশাপাশি রেশমার পড়াশোনাও চলে। ফলে রেশমাকে স্কুলে পৌঁছে দেওয়ার জন্য বাড়িতে কেউ নেই। স্কুলের শিক্ষকেরা জানান, রেশমার মা শেরপুর মোড়ে মেয়েকে নিয়ে পৌঁছে দিতেন। সেখান থেকে অনুশ্রী রেশমাকে হাত ধরে স্কুলে আনত। স্কুলে পাঠ্য বই পড়ে শোনানো এবং বাড়িতে কোনও কাজ দিলে, তা পড়ে রেশমাকে বুঝিয়েও দিত অনুশ্রী। শৌচাগারে নিয়ে যাওয়া থেকে শুরু করে যে কোনও ধরনের অসুবিধাতেও রেশমার পাশে থাকত অনুশ্রীই।

এ ভাবে পড়াশোনা চলার সময়েই সর্বশিক্ষা মিশনের সঙ্গে কাজ করা এক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা রেশমার সাহায্যে এগিয়ে আসে। তারা ওই পড়ুয়াকে একটি ‘টকিং বুক’ দেয়, যাতে সব ক’টি পাঠ্য বই রেকর্ড করা রয়েছে। কিন্তু সেই ‘টকিং বুক’ও চুরি হয়ে যায় বলে অভিযোগ। ফলে আবার অনুশ্রীই এগিয়ে আসে বন্ধুর সাহায্যে। এক দিকে নিজের পড়াশোনা, অপর দিকে রেশমাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া— রোজ দু’দিক সামলানোর কাজ করছিল অনুশ্রী।

এ ভাবে বন্ধুর পাশে দাঁড়িয়েছে বলেই শেরপুর রামচন্দ্রপুর হাইস্কুলের শিক্ষকেরাও খুব গর্বিত অনুশ্রীকে নিয়ে। তাঁরা জানান, অনুশ্রী নিজেও নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে। দাদা পুরোহিত। তাঁর রোজগারেই চলে সংসার ও বোনের পড়াশোনা। অনুশ্রী দাদার সেই পরিশ্রমের মান রেখেছে বলেই দাবি শিক্ষকদের। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের পরে দেখা গিয়েছে, ৯২ শতাংশ নম্বর নিয়ে পাশ করেছে অনুশ্রী। তবে প্রধান শিক্ষক জানান, নিজের পরীক্ষার ফলের থেকেও অনুশ্রী বেশি চিন্তা করেছে বন্ধু রেশমার ফল নিয়েই। বন্ধুর চিন্তা দূর করেছে রেশমাও। দৃষ্টিহীন হওয়া সত্ত্বেও, আর পাঁচ জন পড়ুয়ার সঙ্গে পা মিলিয়ে ৪৬ শতাংশ নম্বর নিয়ে পাশ করেছে সে।

এ রকম এক সহানুভূতিশীল ছাত্রীকে পেয়ে গর্বিত শেরপুর রামচন্দ্রপুর হাইস্কুলের শিক্ষক-অশিক্ষক কর্মীরাও। তাঁরা জানিয়েছেন, স্কুলের সেরা ‘স্বয়ংসিদ্ধা’-র সম্মান পেয়েছে অনুশ্রী!

Blind Student Higher Secondary Examination
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy