Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

২৫ জানুয়ারি ২০২২ ই-পেপার

বিদেশিনিই এখন অম্মাদের অম্মা

শনিবার, দক্ষিণ কলকাতায় বিশ্ব মাতৃত্ব দিবস উপলক্ষে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে এসেছিলেন লিন্ডসে।

সুচন্দ্রা ঘটক
১৩ মে ২০১৮ ০১:০১
অনুষ্ঠানের আগে লিন্ডসে বার্ন। শনিবার, শহরে। নিজস্ব চিত্র

অনুষ্ঠানের আগে লিন্ডসে বার্ন। শনিবার, শহরে। নিজস্ব চিত্র

ছিলেন সমাজতত্ত্বের গবেষক, হয়ে উঠেছেন মায়েদের ত্রাতা!

জন্মসূত্রে তাঁর নাম লিন্ডসে বার্ন। এখন তিনি শুধুই অম্মা। বলা ভাল— তিনি অসংখ্য অম্মার অম্মা। শিশুর জন্মের সময়ে যে সবচেয়ে বেশি যত্ন নেওয়া দরকার মায়ের, ঝাড়খণ্ডের প্রত্যন্ত কিছু গ্রামে তা-ই শিখিয়ে চলেছেন তিনি বছর কুড়ি ধরে।

শনিবার, দক্ষিণ কলকাতায় বিশ্ব মাতৃত্ব দিবস উপলক্ষে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে এসেছিলেন লিন্ডসে। এসে জানালেন, গত কয়েক বছরে মায়েদের সামাজিক অবস্থানের উন্নতি হয়েছে ঠিকই।

Advertisement

তবে আরও অনেক কাজ বাকি এখনও। ফলে বিভিন্ন কয়লা খনিতে কর্মরত মহিলাদের সামাজিক অবস্থান নিয়ে গবেষণার কাজ শেষ করেও ইংল্যান্ডে বাড়ি ফেরা হয়নি তাঁর। বোকারো স্টিল সিটি থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে চন্দনকিয়েরি গ্রামে তাঁর নেতৃত্বে তিলে তিলে তৈরি হয়েছে স্বাস্থ্য কেন্দ্র। প্রথাগত শিক্ষা ছাড়াই, তিনি শুধু বই পড়ে ধীরে ধীরে হাত পাকিয়েছেন প্রসবের কাজে।

এ দিন লিন্ডসে বলছিলেন, ‘‘এ কাজে আমি স্বেচ্ছায় আসিনি।

কাজটাই টেনে এনেছে আমাকে।’’ সময়টা নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি ছিল। তখনও গবেষণা শেষ হয়নি তাঁর। খনিতে কাজের সূত্রে ততদিনে আলাপ জমে গিয়েছে

স্থানীয় বহু পরিবারের সঙ্গে। হঠাৎ এক রাতে তাঁদেরই কয়েক জন এসে উপস্থিত অসহায় ভাবে। জানালেন, বাড়িতে ছটফট করছেন এক প্রসূতি। কিন্তু কোনও চিকিৎসক নেই এলাকায়। যে এলাকার কথা, সেখানে চিকিৎসার সরকারি ব্যবস্থা বদলায়নি আজও। প্রসবে সাহায্য পেতেও ছুটতে হয় মাইল কয়েক। লিন্ডসে বলেন, ‘‘আমার ওই কাজটা শিখে নেওয়া ছাড়া উপায় ছিল না।’’

ভয় করেনি তাঁর?

অম্মা জানান, ভয় তো করেছে বটেই। কিন্তু প্রথম কয়েকটি প্রসব সুস্থ ভাবে করে ফেলতে পেরে শেখার ইচ্ছেও বাড়ে। সহায় হয়েছে ডেভিড ওয়ার্নারের বই ‘হোয়্যার দেয়ার ইজ নো ডক্টর’। তিনি বলেন, ‘‘স্থানীয় অনেকেও এগিয়ে আসেন কাজে হাত লাগাতে। বহু বাড়ির মেয়েরা প্রশিক্ষণ নিতে শুরু

করেন।’’ তত দিনে লিন্ডসেরও কিছু পরিচিতি হয়েছে কাজের সূত্রে। ফলে দিল্লি, পুণে, কলকাতা থেকে মাঝেমাঝে চিকিৎসকদের সাহায্য পান। জটিল অস্ত্রোপচারে প্রয়োজন হলে এগিয়ে যান তাঁরা।

পাশাপাশি, স্থানীয় মহিলাদের প্রশিক্ষণ দিতেও সাহায্য করেন লিন্ডসেকে। এ ভাবেই ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে তাঁর আদরের স্বাস্থ্য কেন্দ্র। এখন বিভিন্ন গ্রামের হাজার সাতেক মহিলা নানা ভাবে যুক্ত তাঁর কাজের সঙ্গে। তাঁদেরই তত্ত্বাবধানে মাসে গড়ে ৪০টি শিশুর জন্ম হয় লিন্ডসের তৈরি কেন্দ্রে।

পড়তে যতটা সুখের, ততই কি সহজ তবে তাঁর কাজটা? মোটেও নয়। লিন্ডসে জানান, এত বছর কাজের পরেও নিয়মিত অর্থের ব্যবস্থা করতে পারেননি তাঁরা। তা ছাড়াও সরকারি পরিকাঠামোরও অভাব রয়েছে। ফলে এলাকার গরিব মানুষদের থেকে সামান্য হলেও টাকা নিতে

হয় তাঁদের। একেবারে বিনামূল্যে চিকিৎসা দিতে পারেন না। পারেন না পরিকাঠামোর একটু উন্নতি করতে। তবু কাজটা এগিয়ে নিয়ে যেতে স্বামী রঞ্জন ঘোষের সঙ্গে তিনি তৈরি করেছেন জনচেতনা মঞ্চ। ইচ্ছে আছে, ওই এলাকার শিশুদের দেখভালের ভাল ব্যবস্থা করার।

কিন্তু অ-চিকিৎসকের হাতে প্রসবের ঝুঁকি থাকে না কোনও? এ শহরের স্ত্রীরোগ চিকিৎসক সুদীপ বসু চন্দনকিয়েরি গিয়ে কাজ করে এসেছেন লিন্ডসের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘‘প্রশিক্ষিত দাইমারা যে ভাবে কাজ করেন, সে ভাবেই কাজ করে চলেছেন লিন্ডসে। স্বাভাবিক প্রসবের ক্ষেত্রে কোনও সমস্যা হওয়ার কথা নয়।’’ তিনি জানান, বিভিন্ন হাসপাতালেও প্রসবের ক্ষেত্রে ভরসা করা হয় নার্সদের উপরে। আর জটিল অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হলে? লিন্ডসে জানান, সে ক্ষেত্রে হয় চিকিৎসকদের নিয়ে আসা হয় গ্রামে, নয় তো প্রসূতিকে রেফার করা হয় চিকিৎসকের কাছে। তবে সেটাই এখনও সমস্যার। চিকিৎসকের কাছে যাওয়া এবং সেই খরচ বহন করা সহজ নয় ওই এলাকার মানুষের কাছে।

আরও পড়ুন

Advertisement