Advertisement
E-Paper

গোপালেই দৌড় শেষ পুলিশের

ওই গোপাল পর্যন্তই! এর বেশি এগোনোর বুকের পাটাই নেই পুলিশের। লালবাজারের এক কর্তাই সোমবার এটা কবুল করলেন অকপটে। নিজে সুবোধ নয় মেনেও গোপাল, মানে গিরিশ পার্ক কাণ্ডের গোপাল তিওয়ারিও আঁচ করেছিল, এমন কিছুই হতে চলেছে। বাগুইআটির হোটেলে ধরা পড়ার পরে আক্ষেপ করে সে বলেছিল, কাজ হাতিয়ে নিয়ে এখন তাকে বলির পাঁঠা করছেন তৃণমূলের নেতারা।

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ১৪ জুলাই ২০১৫ ০৩:১৬
গোপাল তিওয়ারি

গোপাল তিওয়ারি

ওই গোপাল পর্যন্তই! এর বেশি এগোনোর বুকের পাটাই নেই পুলিশের। লালবাজারের এক কর্তাই সোমবার এটা কবুল করলেন অকপটে। নিজে সুবোধ নয় মেনেও গোপাল, মানে গিরিশ পার্ক কাণ্ডের গোপাল তিওয়ারিও আঁচ করেছিল, এমন কিছুই হতে চলেছে। বাগুইআটির হোটেলে ধরা পড়ার পরে আক্ষেপ করে সে বলেছিল, কাজ হাতিয়ে নিয়ে এখন তাকে বলির পাঁঠা করছেন তৃণমূলের নেতারা। তার স্ত্রীও বলেছিলেন, স্বার্থ মিটে যাওয়ার পরে নেতারা এখন তাঁর স্বামীকে ঝেড়ে ফেলতে চাইছেন।

বাস্তবেও দেখা গেল সেটাই!

কলকাতায় পুরভোটের দিন গিরিশ পার্কে পুলিশের সাব-ইনস্পেক্টর জগন্নাথ মণ্ডলকে গুলি করার মামলায় লালবাজার যে চার্জশিট সোমবার ব্যাঙ্কশাল আদালতে জমা দিয়েছে, তাতে নাম নেই শাসক দলের কোনও নেতারই। শুধু ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’-র ভঙ্গিতে ওই চার্জশিটে বলা হয়েছে, খুনের চেষ্টার এই মামলার সাক্ষীরা বলেছেন, মূল অভিযুক্ত গোপাল তিওয়ারি তৃণমূল-ঘনিষ্ঠ। কিন্তু তৃণমূলের কোন নেতার ঘনিষ্ঠ গোপাল, কে তাঁকে পুরভোটের দিনে অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে মাঠে নামিয়েছিলেন— তার কোনও উল্লেখ নেই চার্জশিটে। বরং শাসক দলের নেতাদের ‘ক্লিনচিট’ দিতে চার্জশিটে বলা হয়েছে, সাব-ইনস্পেক্টরকে গুলি করার ওই ঘটনায় নেতাদের কোনও ভূমিকা নেই।

চার্জশিটে বলা হয়েছে, ভোট মেটার পর গোপাল নিজের উদ্যোগেই দলবল নিয়ে কংগ্রেস নেতাদের উপরে হামলা চালায় এবং পুলিশের উপরে গুলি চালায়। অর্থাৎ, গোপাল ও তার স্ত্রীর শঙ্কা সত্যি হল শেষে। পুলিশের চার্জশিটে স্পষ্ট হয়ে গেল, ‘বলির পাঁঠা’ হতে হল শুধু গোপালকেই।

কেন গোপালের মদতদাতাদের নাম এল না চার্জশিটে? লালবাজারের এক কর্তার মন্তব্য, ‘‘আমাদের দৌড় গোপাল পর্যন্তই। তার উপরের কাউকে নিয়ে তদন্ত করার মতো বুকের পাটা আমাদের নেই।’’

গত ১৮ এপ্রিল পুরভোটের পরে গিরিশ পার্কে পুলিশকর্মী জগন্নাথ মণ্ডলের গুলিবিদ্ধ হওয়ার দৃশ্য সিসিটিভি-র ফুটেজে দেখার পর শোরগোল পড়ে গিয়েছিল। এই গুলি চালানোর ঘটনার পরেও মূল অভিযুক্ত গোপাল তিওয়ারি এলাকার দাপুটে তৃণমূল নেতাদের আশ্রয়েই ছিল বলে পুলিশের একাংশের অভিযোগ। পরে সংবাদমাধ্যমে ওই নেতাদের সঙ্গে গোপাল ও তার সঙ্গীদের কয়েক জনের ছবি ছাপা হতে থাকে। ওই নেতারা গোপালের সঙ্গে তাঁদের ঘনিষ্ঠতার কথা অস্বীকার করলেও বিরোধীরা এ নিয়ে নানা অভিযোগ তুলতে থাকেন। এ পরেই কলকাতা থেকে উধাও হয়ে যায় গোপাল। এর পরে তার বাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয় প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র। ঘটনার ৪০ দিন পরে বাগুইআটির একটি হোটেলে ধরা পড়ে গোপাল। এই সময়ে পুলিশ কর্তারাই বলেছিলেন, গোপাল তৃণমূল-ঘনিষ্ঠ। চার্জশিটেও বলা হয়েছে, ঘটনাস্থলে থেকে সে হামলায় নেতৃত্বও দিয়েছিল।

গিরিশ পার্ক কাণ্ডে এই চার্জশিট জমা পড়ল ঘটনার ৮৭ দিনের মাথায়। লালবাজারের খবর, ২৬১ পাতার চার্জশিটে গোপাল-সহ মোট ১১ জন ধৃতের নাম রয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, এদের অধিকাংশই তৃণমূলকর্মী। এদের মধ্যে দু’জনকে ধরা হয়েছিল গিরিশ পার্কের দলীয় অফিস থেকেই। ফেরার দেখানো হয়েছে ৮ অভিযুক্তকে। তাদের বিরুদ্ধে আগেই হুলিয়া জারি করেছিল আদালত। মোট ৫৭ জনের সাক্ষীর পাশাপাশি তিন জনের গোপন জবানবন্দির কথা রয়েছে চার্জশিটে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে খুনের চেষ্টার মামলার পাশাপাশি অস্ত্র ও বিস্ফোরক আইন-সহ একাধিক ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।

১৮ এপ্রিল এসআই জগন্নাথ মণ্ডল গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরে পুলিশের তরফে দায়ের করা এফআইআরে বলা হয়েছিল, গিরিশ পার্কের সিংহিবাগানে কংগ্রেস ও তৃণমূলের মধ্যে রাজনৈতিক সংঘর্ষ হয়েছে। সে দিন ঘটনাস্থলে থাকা একাধিক পুলিশ অফিসারেরও দাবি, পুরভোটের পরে বিকেলে কংগ্রেসের অফিসে ভাঙচুর চালায় গোপাল তিওয়ারির দল। এই সময়ে তারা এক কংগ্রেসকর্মীকে মারধর করছিল। ওই পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়েই জগন্নাথবাবু গুলিবিদ্ধ হন। এর পরেও চার্জশিটে শাসক-যোগের উল্লেখ না-থাকায় লালবাজারের একাংশ বিস্মিত। এক পুলিশকর্তা বলেন, ‘‘ঘটনার পরে তৃণমূল নেতা সঞ্জয় বক্সীর অফিস থেকেই গ্রেফতার করা হয়েছিল অশোক শাহ ও দীপক সিংহ নামে দুই তৃণমূলকর্মীকে। এর পরে কী করে চার্জশিটে শাসক দলের নেতাদের ভূমিকা অস্বীকার করা হয়?’’

শুধু ওই পুলিশই নয়, স্থানীয় বাসিন্দারাও বলছেন, অশোক-দীপক সহ ধৃতদের প্রায় সকলেই এলাকায় সক্রিয় তৃণমূলকর্মী বলেই পরিচিত। রাজনীতির টক্কর নিতেই তারা সে দিন সিংহিবাগানে হাজির হয়েছিল। গিরিশ পার্ক-কাণ্ডের পরে প্রকাশ্যে আসা কয়েকটি ছবিতে গোপালের সঙ্গে একমঞ্চে দেখা গিয়েছে সঞ্জয় বক্সীকেও। সঞ্জয়বাবু অবশ্য গোপাল-ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন বারবারই। এ দিন মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন ধরেননি। এসএমএসের জবাব আসেনি।

এক পুলিশ অফিসার গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরেও অভিযুক্তদের মদতদাতা শাসক দলের নেতা-নেত্রীদের বিরুদ্ধে কোনও তদন্ত না করায় শাসক দলকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন বিরোধীরা। সিপিএমের সাংসদ মহম্মদ সেলিম বলেন, ‘‘এই চার্জশিট মমতা-রাজের নমুনা। তৃণমূলের কর্মী হলে সাত খুন মাফ! গার্ডেনরিচে খুন হওয়া পুলিশ অফিসার তাপস চৌধুরীর খুনের অভিযুক্তরা প্রকাশ্যেই ঘুরছে। এমনই হাল এ রাজ্যের পুলিশের!’’ কংগ্রেস নেতা আব্দুল মান্নানের প্রতিক্রিয়া, ‘‘হাস্যকর চার্জশিট! অপরাধীরা যাতে বেকসুর খালাস পায়, তাই ষড়যন্ত্র করে গুরুত্বহীন এই চার্জশিট দেওয়া হয়েছে।’’ আর বিজেপি বিধায়ক শমীক ভট্টাচার্যের প্রশ্ন, ‘‘ওখানে কারও নাম না করে শুধু তৃণমূল আশ্রিত দুষ্কৃতীর কথা বলা হয়েছে। এটা কি অবয়বহীন কোনও অস্তিত্ব? সাইনবোর্ডহীন কোনও ফাঁকা ঘর?’’

বিরোধীদে অভিযোগ উড়িয়ে তৃণমূলের মহাসচিব পার্থ চট্টোপাধ্যায় অবশ্য পুলিশের পাশেই দাঁড়িয়েছেন। তিনি বলেন, ‘‘তদন্ত করে পুলিশ যে প্রমাণ পেয়েছে, সেই মতো ব্যবস্থা নিয়েছে। এতে বিরোধীদের অভিযোগ করার কিছু নেই।’’

কী বলছে লালবাজারের শীর্ষ মহল? কলকাতার পুলিশ কমিশনার সুরজিৎ করপুরকায়স্থের সঙ্গে এ দিন মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন ধরেননি। পরে তিনি এসএমএসে জানান, এ ব্যাপারে যা বলার গোয়েন্দা-প্রধান বলবেন। পরে গোয়েন্দা-প্রধান পল্লবকান্তি ঘোষ বলেন, ‘‘সে দিন যা ঘটেছিল, তার ভিত্তিতে তদন্ত করেই অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে।’’

inspector jagannath mondal gopal tiwari girish park firing chargesheet kolkata police
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy