Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

২৭ জানুয়ারি ২০২২ ই-পেপার

এক দিনের ঘরে ফেরা তিন বোনের

টিভি-র উপরে ভাই আর ভাইয়ের বৌয়ের বিয়ের ফ্রেমবন্দি ছবি দেখে জানতে পারলেন, ভাই সংসারি হয়েছে। কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে দিদির স্বগতোক্তি, ‘‘বাড়িতে

সোমা মুখোপাধ্যায়
০৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭ ০০:৫৭
পাতপেড়ে: বাড়িতে শিখা, সীমা ও রূপসী। নিজস্ব চিত্র

পাতপেড়ে: বাড়িতে শিখা, সীমা ও রূপসী। নিজস্ব চিত্র

মা মারা গিয়েছেন। ওঁরা খবর পাননি। ভাইয়ের বিয়ে হয়েছে। কেউ ওঁদের জানায়নি। বহু বছর পরে বাড়ি ঢুকে মাকে খুঁজতে গিয়ে মায়ের মৃত্যুর খবর পেলেন ওঁরা। টিভি-র উপরে ভাই আর ভাইয়ের বৌয়ের বিয়ের ফ্রেমবন্দি ছবি দেখে জানতে পারলেন, ভাই সংসারি হয়েছে। কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে দিদির স্বগতোক্তি, ‘‘বাড়িতে এত কিছু হয়ে গেল! কেউ এক বার জানালও না?’’

লুম্বিনী পার্ক মানসিক হাসপাতাল থেকে এক দিনের জন্য বাড়ি ফিরেছিলেন তিন বোন শিখা (৪৮), সীমা (৪৫) আর রূপসী (৩৫)। শিখা লুম্বিনী পার্কে রয়েছেন ২০ বছর ধরে। সীমা ১৫ বছর আর রূপসী ১০ বছর। তিন জনেই অতীতে মানসিক রোগে আক্রান্ত হলেও বহু আগেই হাসপাতালের চিকিৎসকেরা ওঁদের ‘সুস্থ’ বলে সার্টিফিকেট দিয়েছেন। হাসপাতাল থেকে বারবার বাড়িতে খবর দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তাঁরা কোনও যোগাযোগই করেননি। এ বার তাই মানসিক হাসপাতালে কাজ করা একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার তরফে ওই তিন বোনকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বাড়িতে। যদি আলোচনার মাধ্যমে ওঁদের বাড়ি ফেরার বন্দোবস্ত করা যায়! বাড়ির লোকেরা রাজি হননি। কিন্তু এগিয়ে এসেছেন এলাকার বাসিন্দারা। তাঁরা জানিয়েছেন, যে ভাবেই হোক এর একটা বিহিত তাঁরা করবেনই। আপাতত সেই আশ্বাসে ভরসা করেই ফের হাসপাতালে ফিরেছেন তিন বোন। হাসপাতালে যাঁকে সামনে পাচ্ছেন, তাঁদের কাছেই ওঁদের প্রশ্ন, ‘‘আচ্ছা, পুজোর আগে বাড়ি ফিরতে পারব তো?’’

আরও পড়ুন: বাড়িতে পুলিশ, ঘর ছাড়লেন ছেলে-বৌমা

Advertisement

সংশ্লিষ্ট স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার তরফে রত্নাবলী রায় বলেন, ‘‘পরিবার থাকা সত্ত্বেও মানসিক রোগীরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এ ভাবে হাসপাতালে থেকে যেতে বাধ্য হন। আর তাই হাসপাতাল উপচে পড়ে রোগীতে। ২০০ জনের খাবারে ৪০০ জনকে খেতে হয়। গাদাগাদি করে থাকতে হয়। প্রতি মুহূর্তে লঙ্ঘিত হয় মানবাধিকার। সেই কারণেই আমরা রোগীদের অন্তত কিছুটা সময়ের জন্য বাড়ি নিয়ে গিয়ে মূল স্রোতে ফেরানোর চেষ্টাটা চালাতে চাইছি।’’ রত্নাবলী জানান, তাঁরা ওই তিন বোনের জীবন নিয়ে একটি তথ্যচিত্রও তৈরি করছেন।

জেল থেকে যেমন কোনও বন্দি প্যারোলে মুক্তি পান, এও অনেকটা তেমনই! যদিও এটা জেল নয়, হাসপাতাল। কিন্তু তাঁদের পরিচয়টা এখানে রোগীর চেয়ে অনেক বেশি বন্দিরই। কারণ সুস্থ হওয়ার পরেও তাঁরা বছরের পর বছর হাসপাতালের চার দেওয়ালের মধ্যেই কাটাতে বাধ্য হন। কারণ পরিবার তাঁদের ফিরিয়ে নেয় না। মানসিক হাসপাতালে পড়ে থাকা, পরিবারে উপেক্ষিত এই মানুষদের জন্য স্বাস্থ্য দফতর সম্প্রতি চালু করেছে ‘লিভ অব অ্যাবসেন্স’ প্রক্রিয়া। হাসপাতাল থেকে এক-দু’দিনের ছুটিতে ওঁরা পরিবারের কাছে যাচ্ছেন। যাতে পরিবারের লোকেরাও দেখে-বুঝে নিতে পারেন, আদতে এঁরা ঠিক কেমন আছেন। স্বাস্থ্য দফতর সূত্রে খবর, এর পরেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বাড়ির লোকেরা পিছিয়ে যান। নানা অজুহাত দেখিয়ে বাড়ি ফিরিয়ে নিতে অস্বীকার করেন। কিন্তু কোনও কোনও ক্ষেত্রে আবার উল্টোটাও ঘটে। হাসপাতালের বাইরে স্বাভাবিক ভাবে ঘুরে বেড়াতে, কথা বলতে দেখে বাড়ির লোকেরাও বোঝেন, তাঁরা যে ভয়টা পেয়েছিলেন, তা ঠিক নয়। সে ক্ষেত্রে স্থায়ী ভাবে মানসিক হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরার সুযোগ পান ওই মানুষেরা।

এই তিন বোনের ক্ষেত্রে অবশ্য এখনও তা ঘটেনি। লুম্বিনী পার্ক থেকে বনগাঁর রেটপাড়ায় নিজেদের পৈতৃক বাড়ি থেকে ফেরার পরে এখনও পরিবারের কেউ হাসপাতালে যোগাযোগ করে তাঁদের ফিরিয়ে নেওয়ার কথা বলেননি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অবশ্য আশাবাদী, গোড়াতে না হলেও ধীরে ধীরে নিশ্চয় বাড়ির লোকজন এঁদের ফেরানোর কথা ভাববেন।

বনগাঁর রেটপাড়ার ছোট্ট বাড়িতে আাপতত থাকেন পাঁচ ভাই-বোন। এ ছাড়া এক ভাই কলকাতায় কাজ করেন। আর এক ভাই বিয়ে করে আলাদা হয়ে গিয়েছেন। বাবা প্রয়াত বুদ্ধদেব চক্রবর্তী বনগাঁ মহকুমা শাসকের অফিসে চাকরি করতেন। তিনি মারা গিয়েছেন আট বছর আগে। মাও মারা গিয়েছেন। বাবার পেনশনের টাকায় তাদের সংসার চলে। সঙ্গে এক ভাইয়ের গৃহশিক্ষকতার সামান্য রোজগারের টাকা। ভাই-বোনেদের দাবি, মূলত আর্থিক কারণেই মানসিক অসুস্থ তিন বোনকে তাঁরা বাড়িতে ফিরিয়ে নিতে পারছেন না। অসুস্থ তিন বোনকে অতীতেও এক বার বাড়িতে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল। কিন্তু তখনও তাঁদের বাড়িতে রাখা সম্ভব হয়নি। দিদি নীতা চক্রবর্তীর কথায়, ‘‘আমরা সংসার চালাতে হিমসিম খাচ্ছি। ঠিক মতো সংসার চলে না। এর মধ্যে মানসিক ভাবে অসুস্থ তিন বোনকে বাড়িতে রাখলে খাওয়াব কী? তাদের দেখাশোনা ও চিকিৎসার খরচই বা আসবে কোথা থেকে?’’ কিন্তু ওঁরা তো এখন সুস্থ। নীতাদেবী জানিয়েছেন, এটা তাঁরা বিশ্বাস করেন না। স্থানীয় ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূল কাউন্সিলর মৌসুমী চক্রবর্তীর সঙ্গেও যোগাযোগ করা হয়েছিল। মৌসুমীদেবী জানিয়েছেন, ওই তিন বোন যদি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে গিয়ে থাকেন এবং ডাক্তারি শংসাপত্র দেখাতে পারেন, তা হলে তাঁরা ওঁদের বাড়ি ফেরানোর চেষ্টা করবেন। একই কথা বলেছেন এলাকার বাসিন্দারাও। তাঁদের বক্তব্য, সুস্থ হয়ে ওঠার পরে এ ভাবে মানসিক হাসপাতালে ফেলে রাখা বড় অন্যায়। প্রয়োজনে তাঁরা ওই পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে সাহায্য করবেন। কিন্তু এত বড় অন্যায়টা হতে দেবেন না।

তথ্য সহায়তা: সীমান্ত মৈত্র

আরও পড়ুন

Advertisement