Advertisement
০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৩

লিলুয়ায় সৌহার্দ্যের ঘেরাও সুনিদ্রায় শেষ

কর্তৃপক্ষকে ঘেরাও করে রাখার জন্য কলেজের যে-সব গেটে বৃহস্পতিবার রাতে তালা দেওয়া হয়েছিল, শুক্রবার ভোর হওয়া মাত্র বিক্ষোভকারী পড়ুয়ারাই সেগুলো খুলে দিলেন। আবার যে-সব ঘেরাওকারী পড়ুয়া কলেজ ক্যাম্পাসে ঘুমিয়ে ছিলেন, বাড়ি যাওয়ার সময় তাঁদের ডেকে তুললেন সারা রাত ঘেরাও হয়ে থাকা অধ্যক্ষ-শিক্ষকেরাই।

শান্তনু ঘোষ
কলকাতা শেষ আপডেট: ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৪ ০৩:১৮
Share: Save:

কর্তৃপক্ষকে ঘেরাও করে রাখার জন্য কলেজের যে-সব গেটে বৃহস্পতিবার রাতে তালা দেওয়া হয়েছিল, শুক্রবার ভোর হওয়া মাত্র বিক্ষোভকারী পড়ুয়ারাই সেগুলো খুলে দিলেন। আবার যে-সব ঘেরাওকারী পড়ুয়া কলেজ ক্যাম্পাসে ঘুমিয়ে ছিলেন, বাড়ি যাওয়ার সময় তাঁদের ডেকে তুললেন সারা রাত ঘেরাও হয়ে থাকা অধ্যক্ষ-শিক্ষকেরাই।

Advertisement

এমনই এক সম্প্রীতির আবহে বৃহস্পতিবার সারা রাত ঘেরাও-বিক্ষোভের কর্মসূচি চলল লিলুয়ার এক বেসরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে। শুক্রবার কলেজের অন্যান্য কাজকর্ম হলেও পঠনপাঠন বন্ধ ছিল।

কলেজের অধ্যক্ষ অশোক কুমার বলেন, “ভোর সাড়ে ৫টা নাগাদ দেখি, কলেজের গেট খোলা। তখন কেউই কাউকে বেরোতে বাধা দেননি। এ দিন পরিবহণ ধর্মঘট ছিল। তাই আমরা, শিক্ষকেরা বাড়ি যাওয়ার সময় ঘুমিয়ে পড়া পড়ুয়াদের ডেকে দিয়েছিলাম। যাতে ওরা বাড়ি ফিরতে পারে।” সন্তানতুল্য ছাত্রদের প্রতি অধ্যক্ষ-শিক্ষকদের এই স্নেহ-সৌজন্য যেমন ছিল, সমান শ্রদ্ধা-সৌজন্য শিক্ষকদের প্রতি দেখিয়েছেন পড়ুয়ারাও। সারা রাত কলেজের দরজা আগলে বসে থাকা এক পড়ুয়ার কথায়, “ক্যাম্পাসিংয়ের দাবিতে বিক্ষোভ দেখাতে গিয়ে অনেক রাত হয়ে যায়। তাই স্যারেদের ছাড়তে পারিনি। ওঁদের প্রতি আমাদেরও তো কর্তব্য রয়েছে। তবে ভোর হতেই গেটের তালা খুলে দিয়েছিলাম।”

সৌজন্য শুধু ঘেরাওয়ের অবসানে নয়। বৃহস্পতিবার রাতে ঘেরাওয়ের মধ্যেও পারস্পরিক সম্প্রীতির অভাব হয়নি। বিক্ষোভকারী পড়ুয়ারা রাতের খাবার হিসেবে রুটি-তরকারি এনে ঘেরাও হয়ে থাকা শিক্ষকদেরও তা খাওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। ছাত্রবৎসল অধ্যক্ষ-শিক্ষকেরা তাঁদের জানান, বিক্ষোভকারীরা তো সংখ্যায় অনেক। তাই তাঁরাই যেন ওই তরকারি-রুটি ভাগ করে খেয়ে নেন। শিক্ষকেরা ভাগ বসালে পড়ুয়াদের কম পড়ে যেতে পারে। নিজেদের জন্য খিচুড়ির ব্যবস্থা করেন শিক্ষকেরা।

Advertisement

মঙ্গলবার রাতে পড়ুয়াদের বিক্ষোভের জেরে ঘেরাও থেকে মুক্ত হতে পুলিশ ডেকেছিলেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্থায়ী উপাচার্য। আর তার পরিণামে চূড়ান্ত লাঞ্ছনা জুটেছিল ছাত্রছাত্রীদের কপালে। সেই ঘটনা নিয়ে তোলপাড় চলছে। লিলুয়ার কলেজ দেখাল ঠিক তার উল্টো ছবি। সেখানে ঢাল ও লাঠিধারী পুলিশ গেলেও তাদের ভূমিকা ছিল কার্যত নীরব দর্শকের মতো। কলেজ-কর্তৃপক্ষ পুলিশকে ক্যাম্পাসে ঢোকাননি। কলেজের ভিতরে গিয়েছিলেন শুধু সাদা পোশাকের কিছু পুলিশকর্তা। বাইরে একটি স্কুলের ক্যাম্পাসে বসে ছিলেন উর্দিধারী পুলিশকর্মীরা। কর্তৃপক্ষ পরিষ্কার জানিয়ে দেন, পুলিশ ডাকা হয়েছে সম্পত্তি রক্ষার জন্যই। ছাত্রছাত্রীদের উপরে কোনও আক্রমণের পক্ষপাতী নন তাঁরা। অধ্যক্ষ বলেন, “ছাত্রছাত্রীরা আমাদের সন্তানের

মতো। ওদের নিয়েই থাকতে হবে আমাদের। ওরা যদি সারা রাত বা তারও পরে ঘেরাও চালিয়ে

যায়, আমরা ঘেরাও হয়ে থাকব। পুলিশকে বলব না যে, ঘেরাও-মুক্ত করো।” পুলিশ এলেও তাই তারা দর্শকের ভূমিকা নেয়। ঘেরাওয়ের রাত কাটতেই পড়ুয়া-শিক্ষকদের মতো ফিরে যান সেই সব পুলিশকর্মীও।

শুক্রবার কলেজ খোলা থাকলেও ভোরে বাড়ি গিয়ে আবার ক্যাম্পাসে আসতে পারেননি পড়ুয়ারা। তবে অধ্যক্ষ, অন্য কিছু শিক্ষক ও কর্মী ভোরে বাড়ি গিয়েও বেলা সাড়ে ১১টা নাগাদ ফের চলে আসেন কলেজে। অধ্যক্ষ বলেন, “পড়ুয়াদের দাবি নিয়ে ডিরেক্টর ও প্লেসমেন্ট অফিসারের সঙ্গে আলোচনার প্রয়োজন ছিল। তাই বাড়ি গিয়ে আমরা বেশ কয়েক জন ফের কলেজে চলে এসেছি।”

কী দাবি পড়ুয়াদের?

ছাত্রছাত্রীরা জানান, ২০১৩ সালের প্রথম দিকে একটি সংস্থা ওই কলেজে ভুয়ো ক্যাম্পাসিং করতে গিয়ে ধরা পড়ে যায়। তাই বৃহস্পতিবার সকালে চতুর্থ বর্ষের ‘কোর’ (মেকানিক্যাল, ইলেকট্রিক্যাল ও অটোমোবাইল) বিভাগের পড়ুয়ারা শিক্ষকদের কাছে গিয়ে বলেন, যে-সব সংস্থা ক্যাম্পাসিং করবে, তাদের লিখিত তালিকা দিতে হবে। শিক্ষকেরা সেই দাবি না-মানতে চাওয়ায় শুরু হয় বিক্ষোভ। সন্ধ্যায় শিক্ষিকা ও কর্মীদের ছেড়ে দিয়ে গেটে তালা ঝুলিয়ে দেন পড়ুয়ারা। রাত ১২টা নাগাদ কর্তৃপক্ষ ও পড়ুয়াদের বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, ২৭ সেপ্টেম্বর ক্যাম্পাসিং নিয়ে আলোচনা হবে।

কলেজ সূত্রের খবর, বৈঠকের পরে বিক্ষোভকারীরা দাবি তোলেন, প্রথম বর্ষের পড়ুয়াদের বিশ্রামের জন্য শ্রেণিকক্ষ খুলে দিতে হবে। কলেজ-কর্তৃপক্ষ সেই দাবি মেনে নেন। কলেজের একতলায় কয়েকটি ঘর খুলে দেওয়া হয়। সেখানেই শুয়ে পড়েন বেশ কয়েক জন পড়ুয়া। অধ্যক্ষ-শিক্ষকেরা থাকেন অফিসঘরে।

সৌহার্দ্য ও সুনিদ্রার ছন্দেই কেটে যায় ঘেরাওয়ের অভিনব রাত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, Twitter এবং Instagram পেজ)
Follow us on: Save:
Advertisement
Advertisement

Share this article

CLOSE
Popup Close
Something isn't right! Please refresh.