Advertisement
E-Paper

হারানো আত্রেয়ীর খোঁজে পথে নামছে শহর

একসময় আত্রেয়ী নদীকে ঘিরেই আবর্তিত হত শহরের জীবন। সবুজ জঙ্গলে ঘেরা মেঠো রাস্তা সর্বস্ব তৎকালীন দিনাজপুরের মহকুমা শহর ছিল বালুরঘাট। দেশ ভাগের আগে থেকেই এই নদী সঙ্গে তার সখ্যতা। এই নদীকে ঘিরেই গড়ে উঠেছিল জীবন-জীবিকার নানা উপায়। তখন তিস্তার সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক ছিল আত্রেয়ীর। ভরা নদীকে ভিত্তি করেই বিস্তার ঘটেছিল শহরের ব্যবসা বাণিজ্যের।

অনুপরতন মোহান্ত

শেষ আপডেট: ১৪ জুন ২০১৫ ০২:০১
আত্রেয়ী তখন।

আত্রেয়ী তখন।

একসময় আত্রেয়ী নদীকে ঘিরেই আবর্তিত হত শহরের জীবন। সবুজ জঙ্গলে ঘেরা মেঠো রাস্তা সর্বস্ব তৎকালীন দিনাজপুরের মহকুমা শহর ছিল বালুরঘাট। দেশ ভাগের আগে থেকেই এই নদী সঙ্গে তার সখ্যতা। এই নদীকে ঘিরেই গড়ে উঠেছিল জীবন-জীবিকার নানা উপায়।

তখন তিস্তার সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক ছিল আত্রেয়ীর। ভরা নদীকে ভিত্তি করেই বিস্তার ঘটেছিল শহরের ব্যবসা বাণিজ্যের। কখনও বৃহৎ আকারের নৌকার উপর ধান, পাট, গুড়, তামাক পাতার গাঁট ও বস্তা চাপিয়ে, কখনও আবার নৌকার উপর ট্রাকশুদ্ধ পণ্য তুলে সোজা গন্তব্য ছিল পূর্ব পাকিস্তান অধুনা বাংলাদেশে। ধামইরহাট ছিল নিকটবর্তী বাণিজ্য কেন্দ্র।

দেশভাগের পর ওপার বাংলা থেকে ছিন্নমূল মানুষ আত্রেয়ী পাড়ে গড়ে তোলেন বসতি। আত্রেয়ী দু হাত ভরে মাছের জোগান দিয়ে তাদের দুবেলা নিশ্চিত আহারের বন্দোবস্ত করে দেয়। আত্রেয়ীতে স্নান করতে গিয়ে গামছায় জল ছাঁকলেই উঠে আসতো মুঠো ভর্তি চাঁদা, বউমাছ ও রাইখর পোনা। শহরের দক্ষিণ-পশ্চিম থেকে উত্তরদিক বরাবর খিদিরপুর, মণিমেলা, আত্রেয়ী কলোনি থেকে মালোপাড়া হয়ে সোজা রঘুনাথপুর এলাকা জুড়ে গড়ে ওঠে মৎস্যজীবী ও কৃষিজীবীদের জনবসতি।

খিদিরপুরের প্রবীণ মৎস্যজীবী জীবন হালদারের কথায়, ‘‘তখন বিয়েতে বর পণে নৌকা যৌতুকের চল ছিল। বড় আকারের না হলেও পাত্রপক্ষের আবদার মতো অন্তত ডিঙি নৌকা দেওয়া হতো। ফি বছর বান ডাকতো আত্রেয়ীতে। জলভাসি নদীপাড়ের মানুষের তখন যোগাযোগে একমাত্র নৌকাই ভরসা।’’ কালের গতিতে আত্রেয়ী ক্রমশ গতিপথ বদলে নিজেকে শহর থেকে একটু একটু করে পশ্চিমে সরিয়ে নিয়েছে। ওইদিকে বিশাল চর জাগিয়ে ফের পূর্বদিকের প্রতি ঝোঁক বেড়েছে। কিন্তু স্রোতোস্বিনী আত্রেয়ীর গর্ব সেই জলরাশি আজ উধাও।

আত্রেয়ী এখন।

সড়ক পথে যোগাযোগ বিহীন একটি জনপদের বাসিন্দারা নদীকে আঁকড়ে ধরে কিভাবে সমাজগঠনে এগিয়েছিল, স্রোতস্বিনী আত্রেয়ী-ই, তার একমাত্র সাক্ষী। প্রবীণেরা জানান, এখন যেখানে শহরের নিউমার্কেট এলাকায় বুড়াকালীর মন্দির, সেখানেই ছিল আত্রেয়ীর প্রধান গতিপথ। অর্থাৎ শহরের বুক চিরেই বয়েছিল আত্রেয়ী। কালক্রমে আত্রেয়ী তার গতিপথ পরিবর্তন করে পশ্চিম দিকে সরে যায়। রেখে যায় শহরের মঙ্গলপুর থেকে বাসস্ট্যান্ড এলাকা পর্যন্ত খাঁড়ির সরু ধারা। আত্রেয়ী-ই বালুরঘাটের জনবসতির বিস্তারে জায়গা ছেড়ে পশ্চিমে সরে যায় বলে কথিত আছে। বলাবাহুল্য, বুড়াকালী মন্দির থেকে পূর্বদিকে আজকের প্রাচ্যভারতী রোড এলাকা নিয়ে আত্মপ্রকাশ ঘটে মূল বালুরঘাট শহরের।

পশ্চিম দিকে চকভৃগু গ্রাম পঞ্চায়েতের দিকে সরে যায় আত্রেয়ী। তখন আত্রেয়ীর খাঁড়ি শহরের চকভবানীর অংশকে আলাদা করে দিয়েছিল। খাঁড়ির ওপারে চকভৃগুর জনবসতি তখন নামমাত্র। ঝোপঝাড়ে ঘেরা একটা নিম্নভূমি অঞ্চল। পরবর্তীকালে দেশভাগের সৌজন্যে পূর্ববাংলা থেকে শরণার্থীর যত চাপ বালুরঘাটের ওই পূর্ব অংশ প্রাচ্যভারতী ও সংলগ্ন এলাকায় পড়েছিল চকভবানী এলাকায় ততটা দেখা যায়নি বলে জানিয়েছেন প্রবীণেরা।

সেই সময় থেকেই পূর্ব বাংলা অধুনা বাংলাদেশ থেকে আগত শরণার্থীরা বালুরঘাটের ওই পূর্ব অংশকে নিশ্চিন্ত এলাকা বলে ধরে নিয়ে বসবাস শুরু করেন। বর্তমান সাড়ে তিন নম্বর মোড় ও বিশ্বাসপাড়া বলে শহরবাসীর কাছে পরিচিত এলাকাটি সেসময় ফুটানিগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড বলে পরিচিত ছিল। ওই ফুটানিগঞ্জ থেকে সে সময়ে হাটবাস নামে পরিচিত বেসরকারি যাত্রীবাস চলতো সারাদিনে দুটি। একদিকে মালদহ। অন্যদিকে রায়গঞ্জ। তা ছাড়া ব্যবসা বাণিজ্যের জন্য আত্রেয়ী নদীর জলপথই ছিল প্রধান ভরসা।

সেই নদীর শীর্ণ ধারায় এখন উদ্বেগের মেঘ বালুরঘাটে। দিনাজপুরের পুরনো ইতিহাস ঘেঁটে জানা গিয়েছে, এই অঞ্চল ছিল সব দিক দিয়ে সমৃদ্ধ। কথিত আছে, ‘কারও পোখরির(পুকুরের) জল কেহ নাই খায়, মণিমুক্তা সব রোদেতে শুকায়।’ অর্থাৎ সকল বাসিন্দাই ছিলেন সম্পন্ন। ফলে কারও পুকুরের জল অন্য কারও ব্যবহারের প্রয়োজন ছিল না। কালে কালে হারিয়ে গিয়েছে অনেককিছুই। এখন সেই পুরনো আত্রেয়ী আর বালুরঘাট শহরকে মেলাতে না পেরে হা হুতাশ করেন শহরের প্রবীণ বাসিন্দারা। তবে তাঁরা হাল ছেড়ে দিলেও এগিয়ে এসেছেন শহরের নতুন প্রজন্ম। আপন নদী আত্রেয়ীকে বাঁচানোর শপথ নিয়ে আন্দোলনে নেমেছেন তাঁরা।

—ফাইল চিত্র।

anupratan mohanto Balurghat amar sohor bangladesh
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy