Advertisement
০৫ ডিসেম্বর ২০২২

উদ্যান হাসি ফোটাল খুদেদের মুখে

কারও আক্ষেপ। কারও মনে জমেছিল চাপা অভিমান। কচিকাঁচাদের মনে দীর্ঘ দিন ধরে জমে থাকা সেই অভিমান, আক্ষেপ দূর করে দিল পঞ্চায়েত। শিশু উদ্যান গড়ে ত্রয়ী, রিচাদের মুখে হাসি ফুটিয়ে সাড়া ফেলেছে ঢেকা পঞ্চায়েত।

শিশু উদ্যানে খেলতে ব্যস্ত কচিকাঁচারা। ছবি:  সোমনাথ মুস্তাফি।

শিশু উদ্যানে খেলতে ব্যস্ত কচিকাঁচারা। ছবি: সোমনাথ মুস্তাফি।

অর্ঘ্য ঘোষ
ময়ূরেশ্বর শেষ আপডেট: ২৯ মে ২০১৫ ০১:৫৯
Share: Save:

কারও আক্ষেপ। কারও মনে জমেছিল চাপা অভিমান। কচিকাঁচাদের মনে দীর্ঘ দিন ধরে জমে থাকা সেই অভিমান, আক্ষেপ দূর করে দিল পঞ্চায়েত। শিশু উদ্যান গড়ে ত্রয়ী, রিচাদের মুখে হাসি ফুটিয়ে সাড়া ফেলেছে ঢেকা পঞ্চায়েত।

Advertisement

ময়ূরেশ্বরের লোকপাড়া সবুজকলি বিদ্যাপিঠের অঙ্কুরের ছাত্রী স্থানীয় মর্জ্যাতপুরের ত্রয়ী পালের পিসির বাড়ি বোলপুরে। বহরমপুরে মামারবাড়ি ওই স্কুলেরই প্রথম শ্রেণির ছাত্রী, লাগোয়া মুর্শিদাবাদের সূর্যবাটির রিচা ঘোষের। যত বারই তারা ওই সব আত্মীয়বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছে তত বারই পিসতুতো–মামাতো ভাইবোনেরা নিয়ে গিয়েছে ‘চিলড্রেন পার্কে’। স্লিপারে নামতে নামতে কিংবা দোলনায় দুলতে দুলতে আনন্দে ত্রয়ীরা ভুলেই যেত বাড়ির কথা। কিন্তু ভাইবোনেদের একটি প্রশ্নই তাদের মধ্যে বিভেদরেখা টেনে দিয়েছে। যখনই ভাইবোনেরা প্রশ্ন করেছে, ‘তোদের ওখানে এমন ‘পার্ক’ আছে?’ সেই প্রশ্নের সামনে মুখ চুন করে দু’দিকে নাবোধক ঘাড় নাড়তে হয়েছে ত্রয়ীদের। আর বাড়ি ফিরে ওই সব কচিকাঁচাদের অভিমান আছড়ে পড়েছে অভিভাবকদের উপরে। ত্রয়ীর বাবা স্থানীয় পঞ্চায়েত কর্মী উজ্জ্বল পাল, রিচার বাবা ব্যবসায়ী রাজকুমার ঘোষরা বলেন, ‘‘আত্মীয় বাড়ি থেকে ঘুরে আসার পরেই ছেলেমেয়েরা পার্ক তৈরি করে দেওয়ার বায়না ধরত। বুঝতেই চাইত না, আমাদের মতো লোকের পক্ষে ব্যক্তিগত উদ্যোগে পার্ক তৈরি করা সম্ভব নয়। কিন্তু, অক্ষমতার গ্লানি আমাদের কুড়ে কুড়ে খেত।’’

পঞ্চায়েত ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, পার্ক গড়ার পরিকল্পনা প্রথম মাথায় আসে পঞ্চায়েতের নির্মাণ সহায়ক গৌতম মণ্ডলের। তিনি বলেন, ‘‘অভিজ্ঞতায় দেখেছি বিনোদনের ব্যাপারে গ্রামাঞ্চলের ছেলেরা বঞ্চিত থাকে। কারণ পঞ্চায়েত স্তরে বেশির ভাগ প্রকল্প নেওয়া হয় বড়দের জন্য। ছোটদের জন্য কিছু করার তাগিদেই পঞ্চায়েতের কাছে পার্ক তৈরির প্রস্তাব রাখি।’’ বিগত আর্থিক বছরে স্বশক্তিকরণ নির্মাণ প্রকল্পে (আইএসজিপি) ৩ লক্ষ ৪৭ হাজার টাকা ব্যয়ে ওই পার্ক তৈরি করে পঞ্চায়েত। গ্রন্থাগারের আশ্রমিক পরিবেশের আমবাগান ঘিরে তৈরি হয় পার্ক। লাগানো হয় রঙিন আলোও। এখন পার্ক থাকার জন্য এলাকার শিশুদের শুধু বিনোদনই নয়, প্রকৃতি পরিচিতিও ঘটে। পার্কের এক দিকে নানা মরসুমি ফুলের পাশাপাশি রয়েছে প্রায় শতাধিক দুষ্প্রাপ্য প্রজাতির গাছ। পার্কের কাছেই থাকা একটি স্কুলের শিক্ষক খোকন পটুয়া বলছেন, ‘‘ওই পার্কে খেলতে গিয়ে ছেলেমেয়েদের নানা ফুল এবং গাছের সঙ্গেও পরিচিতি ঘটে। তাতে পড়াশোনার মানও বাড়ছে।’’

এখন তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী লোকপাড়ার অর্পিতা পটুয়া, চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র তিলডাঙার প্রীতম চন্দ্ররা তাদের সম্পর্কিত ভাইবোনেরা গ্রামে এলেই পার্কে বেড়াতে নিয়ে আসে। কিন্তু, ভুলেও তাদের সেই প্রশ্নটি করে না। প্রীতমরা বলছে, ‘‘আমাদের যখন প্রশ্ন করা হত, এমন পার্ক তোদের আছে? তখন খুব আক্ষেপ হতো। মনে হতো, আমাদেরও যদি থাকতো। না থাকার কষ্টটা বুঝি বলেই ভাইবোনেদের প্রশ্ন করার বদলে বলি আবার তাড়াতাড়ি এসো। আমরা খুব খেলবো।’’ পার্ক দেখভালের দায়িত্বে থাকা স্থানীয় প্রতিবাদ ক্লাবের সম্পাদক কেশব ভাণ্ডারী জানান, দিনভর পার্কে ছেলেমেয়েরা হুটোপাটি করে। সন্ধ্যায় রঙিন আলো জ্বলে উঠলে বাড়িও ফিরতে চায় না। তখ বকে বকেই তাদের বাড়ি পাঠাতে হয়!

Advertisement

শুধু স্কুল পড়ুয়ারাই নয়, অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে আসা আত্মীয়স্বজনদেরও নিয়ে পার্কে আসছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। সম্প্রতি ভাইপোর বিয়েতে দেশের বাড়ি বাঁকুড়া থেকে আসা আত্মীয় পরিজনদের নিয়ে ওই পার্কে যান স্থানীয় বাসিন্দা আনন্দময় কোলে। কলকাতা থেকে আসা মেয়ে নাতিকে নিয়ে আসেন নিমাই দাস। তাঁরা বলছেন, ‘‘গ্রামাঞ্চলে এমন পার্কের কথা ভাবাই যায় না। আত্মীয়স্বজনদের কাছে আমাদের গর্ব বাড়িয়ে দিল পঞ্চায়েত।’’ স্থানীয় বাসিন্দা দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়, অনিল দাসরা জানান, এমন একটা শিশু উদ্যানের প্রয়োজন ছিল। ভোট রাজনীতির তাগিদে প্রশাসনের কর্তারা বিশেষত গ্রামাঞ্চলে রাস্তা-সাঁকো তৈরির বাইরে কিছু ভাবতেই চান না। কিন্তু, ওই সব নির্মাণের থেকে কচিকাঁচাদের হাসিও যে কম মূল্যবান নয়, তা অনুধাবন করে এই পঞ্চায়েত দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে বলেই তাঁদের মত। সংশ্লিষ্ট ঢেকা পঞ্চায়েতের প্রধান মিঠু গড়াই বলছেন, ‘‘প্রথম দিকে আমাদেরও পার্ক গড়া বিষয়ে দোটানা ছিল। কিন্তু, এখন দেখছি ছোটবড় সবার মুখে পার্কের কথা!’’ ময়ূরেশ্বর ২ বিডিও সৈয়দ মাসুদুর রহমান জানান, ওই পঞ্চায়েতের পার্ক তৈরির উদ্যোগ প্রশংসনীয়। অন্যান্য পঞ্চায়েতও এ ব্যাপারে অনুপ্রাণিত হবে বলে তাঁর আশা।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, Twitter এবং Instagram পেজ)
Follow us on: Save:
Advertisement
Advertisement

Share this article

CLOSE
Popup Close
Something isn't right! Please refresh.