Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

২৭ জানুয়ারি ২০২২ ই-পেপার

ডাইনি অপবাদ

নির্যাতিতার ছেলের বিরুদ্ধেও অভিযোগ

ডাইনি অপবাদ দিয়ে আগে গ্রামছাড়া করা হয়েছিল এক প্রৌঢ়াকে। সেই নির্যাতিতাকে ফেরানোর পরে এ বার তাঁর ছেলের বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগ সামনে এল

নিজস্ব সংবাদদাতা
পুরুলিয়া ২৪ জুন ২০১৫ ০১:২০

ডাইনি অপবাদ দিয়ে আগে গ্রামছাড়া করা হয়েছিল এক প্রৌঢ়াকে। সেই নির্যাতিতাকে ফেরানোর পরে এ বার তাঁর ছেলের বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগ সামনে এল। যে মহিলার অসুস্থতা নিয়ে ডাইনি অপবাদ দেওয়া হয়েছিল, ঘটনাচক্রে সেই মহিলাই শ্লীলতাহানির অভিযোগ দায়ের করেছেন। আর এর জেরেই প্রৌঢ়ার ছেলের দাবি, তিনি মায়ের উপরে নির্যাতন নিয়ে থানায় অভিযোগ করার পর দিনই (১৮ জুন) তাঁকে চাপে ফেলতে পাল্টা শ্লীলতাহানির ‘মিথ্যা’ অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।

আর এই অভিযোগকে ঘিরে ফের পুরুলিয়া শহরের খেজুরিয়াডাঙা এলাকায় অশান্তির আশঙ্কা করছেন বাসিন্দাদের একাংশ। এত দিন পুরুলিয়া জেলার প্রত্যন্ত এলাকায় ডাইনি অপবাদ দিয়ে অত্যাচার বা জোরজুলুমের অভিযোগ উঠত। কিন্তু ১৭ জুন পুলিশের কাছে খোদ পুরুলিয়া শহরেরই ১৬ নম্বর ওয়ার্ডের খেজুরিয়াডাঙার ওই অভিযোগ দায়ের হওয়ায় অনেকেই তাজ্জব হয়ে গিয়েছেন। প্রৌঢ়ার ছেলে অভিযোগ করেছিলেন, তাঁর মাকে গ্রামের কয়েকজন ডাইনি অপবাদে অভিযুক্ত করার পরে গয়ায় নিয়ে গিয়ে পিণ্ডদান এবং শরীরে থাকা অপদেবতা তাড়ানোর নামে নিগ্রহ করে। এ নিয়ে তাঁদেরই খরচ করানো হয়। তারপরেও গ্রামে হুমকি, টিপ্পনি এবং শেষমেশ মারধর খেয়ে অপমানে বাড়ি ছেড়ে নিখোঁজ হয়ে যান প্রৌঢ়া। এই পরিস্থিতিতে বাড়িতে থাকতে না পেরে সপরিবারে বাড়ি ছাড়ে প্রৌঢ়ার পরিবার।

দিন দুয়েক শহরের এখানে-সেখানে কাটানোর পরে ১৭ জুন রাতে পুরুলিয়া সদর থানায় আশ্রয় নেয় নির্যাতিতার পরিবার। সেই রাতেই ওই অসুস্থ মহিলা-সহ চারজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করা হয়। পরের দিন দুপুরে পুলিশ নির্যাতিতার পরিবারকে বাড়িতে পৌঁছে দেয়। ১৯ জুন রাতে স্থানীয় কাউন্সিলর, বাসিন্দা ও জেলা বিজ্ঞান মঞ্চের প্রতিনিধিরা এলাকায় শান্তি বৈঠক করেন। সেই বৈঠকে এলাকার তৃণমূল নেতৃত্বও ছিলেন। সেই রাতেই নির্যাতিতাকে বান্দোয়ান থেকে উদ্ধার করে পরের দিন বাড়ি ফিরিয়ে দেয় পুলিশ। সে দিনও ওই প্রৌঢ়া এলাকায় স্বস্তিতে থাকতে পারবেন কি না তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছিলেন।

Advertisement

এ দিকে, মামলার গতিপ্রকৃতি নিয়ে সোমবার পুরুলিয়া সদর থানায় খোঁজ নিতে গিয়ে নির্যতিতার ছেলে জানতে পারেন, তাঁর নামে ওই বধূ শ্লীলতাহানির অভিযোগ দায়ের করেছেন। তাঁর কথায়, ‘‘যাঁর অসুখ নিয়ে আমার মাকে ডাইনি অপবাদ দিয়ে এত অত্যাচার করা হল, সেই মহিলাই আমার বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগ করেছেন! আর পুলিশ জানাচ্ছে, ১৮ জুন উনি অভিযোগ করেছেন, অথচ গ্রামে গত ক’দিন ধরে সচেতনতা শিবির থেকে শান্তি বৈঠক হয়ে গেল। কোথাও কেউ এই অভিযোগ নিয়ে কথা তোলেননি। পুরোটাই আমাকে অভিযোগ তুলিয়ে নেওয়ার জন্য মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর চেষ্টা।’’ তিনি দাবি করেন, গ্রামে ফেরার পর থেকেই তাঁর উপরে নানাস্তর থেকে মামলা প্রত্যাহার করানোর চাপ চলছে। উল্লেখ্য যে চারজন অভিযুক্তের তালিকায় রয়েছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম অভিযুক্ত ওই মহিলা।

নির্যাতিতার পরিবারকে আইনি সহায়তা দিতে এগিয়ে এসেছে একটি সংগঠন। ওই সংগঠনের মুখপাত্র স্বদেশপ্রিয় মাহাতো মনে করছেন, ‘‘নির্যাতিতার ছেলে পুলিশের কাছে অত্যাচারের অভিযোগ জানিয়েছিলেন বলেই ওই পাল্টা অভিযোগ করা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।’’ তাঁর যুক্তি, ‘‘ওই যুবক সপরিবারে বেশ কয়েকদিন গ্রামছাড়া ছিলেন। তাহলে কী ভাবে তিনি গ্রামে ঢুকে ওই মহিলার শ্লীলতাহানি করলেন? তার আগে শ্লীলতাহানি হয়ে থাকলে সেই অভিযোগ জানাতেই বা এত দেরি হল কেন? পুরো বিষয়টির মধ্যে অস্বচ্ছতা রয়েছে।’’ তিনি জানান, ওই পরিবারটিকে তাঁরা আইনি সহায়তা দেবেন। ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতির জেলা সম্পাদক মধুসূদন মাহাতো বলেন, ‘‘এই অভিযোগ এতদিন সামনে আসেনি। মাতব্বরদের বিরুদ্ধে মুখ খোলার জন্য এই অভিযোগ সাজানো হয়েছে কি না জানা দরকার।’’ জেলা বিজ্ঞান মঞ্চের সম্পাদক নয়ন মুখোপাধ্যায়ও বলেন, ‘‘অভিযোগ সত্যি হলে বিচার প্রক্রিয়া নিজের মতো চলবে। কিন্তু দেখা দরকার এই অভিযোগ পাল্টা চাপ দিতে করা হয়েছে কি না।’’

স্থানীয় কাউন্সিলর কৃষ্ণেন্দু মাহালি বলেন, ‘‘দু’পক্ষই পরস্পরের বিরুদ্ধে পুলিশের কাছে অভিযোগ দায়ের করেছে বলে শুনেছি। এ নিয়ে যাতে আর গোলমাল না হয় আমি ফের এলাকায় কথা বলব।’’ জেলা তৃণমূল নেতা নবেন্দু মাহালি বলেন, ‘‘শান্তি বৈঠকের পর এই অভিযোগ সামনে আসায় নতুন করে যাতে উত্তেজনা না ছড়ায় তা দেখতে হবে। আদতে দুই পরিবারের ঝামেলার মধ্যে ডাইনির অভিযোগ এসে পড়ে জট পাকিয়েছে। তবে এ বার বিষয়টি সহজে মিটিয়ে নেওয়া দরকার।’’

শ্লীলতাহানির অভিযোগ তোলা মহিলার সঙ্গে অনেক চেষ্টা করেও কথা বলা যায়নি। তবে, তাঁর দেওরের দাবি, ‘‘পাড়ায় গোলমাল চলার দিনেই ওই যুবক আমার বৌদির শ্লীলতাহানি করে। নানা গোলমালের জন্যই অভিযোগ জানাতে দেরি হয়েছে। ও কেমন ছেলে সবাই জানে।’’ এলাকার ষোলআনার সম্পাদক সুশান্ত রাজোয়াড় বলেন, ‘‘দুই পরিবারের লোকজন ঝামেলা মিটিয়ে যাতে শান্তিতে থাকেন, তা নিয়ে আলোচনা করব।’’

আরও পড়ুন

Advertisement