Advertisement
E-Paper

টেরাকোটার অভিনবত্বে লক্ষ্মীলাভ

সাবেক ঘরানাকে সময়ের ছাঁচে ধরেছেন পাঁচমুড়ার টেরাকোটা শিল্পী বিশ্বনাথ কুম্ভকার। লক্ষ্মীপুজোর এই টেরাকোটা শিল্পীর বাড়তি কিছু লক্ষ্মীলাভও হয়েছে এর ফলে। তাঁর বিশেষ ভাবে গড়া তিনটি লক্ষ্মী প্রতিমা আপাতত বিভিন্ন জেলায় পাড়ি দেওয়ার অপেক্ষায়। বিভিন্ন জায়গায় এবার পুজো পাবে।

রাজদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ১৫ অক্টোবর ২০১৬ ০২:৩৮
শেষ মুহূর্তের ব্যস্ততা। —নিজস্ব চিত্র

শেষ মুহূর্তের ব্যস্ততা। —নিজস্ব চিত্র

সাবেক ঘরানাকে সময়ের ছাঁচে ধরেছেন পাঁচমুড়ার টেরাকোটা শিল্পী বিশ্বনাথ কুম্ভকার। লক্ষ্মীপুজোর এই টেরাকোটা শিল্পীর বাড়তি কিছু লক্ষ্মীলাভও হয়েছে এর ফলে। তাঁর বিশেষ ভাবে গড়া তিনটি লক্ষ্মী প্রতিমা আপাতত বিভিন্ন জেলায় পাড়ি দেওয়ার অপেক্ষায়। বিভিন্ন জায়গায় এবার পুজো পাবে।

বায়নাদারদের হাতে প্রতিমা তুলে দেওয়ার আগে শেষ ছোঁয়ায় নিজের শিল্প যথাসম্ভব নিখুঁত করায় ব্যস্ত ছিলেন বিশ্বনাথবাবু। প্রতিমা তিনটিরই আদল এক। কিন্তু সাবেকি ধরনের চেয়ে অভিনবত্ব এক ঝলকেই চোখে পড়ে। কাজের ফাঁকে শিল্পী জানান, তিনটি প্রতিমার মধ্যে একটি যাবে কলকাতার মণ্ডপে। মেদিনীপুরের কোনও এক ব্যবসায়ী সেটির বায়না করে গিয়েছেন। বাকি দু’টির একটি কিনেছেন মুকুটমণিপুরের এক ব্যবসায়ী। অন্যটি যাচ্ছে রামসাগরে। প্রতিমাগুলির দর সাধারণের চেয়ে বেশ কয়েক গুণ বেশি। কিন্তু চাহিদায় খামতি হয়নি তাতে।

টেরাকোটা শিল্পের জন্য বিষ্ণুপুর লাগোয়া তালড্যাংরা থানার পাঁচমুড়া গ্রামের খ্যাতি রয়েছে। এই গ্রামের শিল্পী রাষ্ট্রপতি পুরষ্কারও পেয়েছেন। পোড়ামাটির ঘোড়া, বোঙ্গা হাতি বা মনসার চালি কিনতে প্রতি বছরই বহু পর্যটক ভিড় জমান পাঁচমুড়া গ্রামে। সময়ের চাহিদা মেনে অনেক দিন ধরেই ঘর সাজানোর জন্য পোড়ামাটির টালি বানাতে শুরু করেছেন পাঁচমুড়ার শিল্পীরা। তার চাহিদাও রয়েছে বাজারে। পাঁচমুড়ার শিল্পী গৌরাঙ্গ কুম্ভকার এই বার হলদিয়ার একটি লক্ষ্মীপুজোর মণ্ডপসজ্জার জন্য টেরাকোটার বিভিন্ন জিনিস গড়ার বরাত পেয়েছেন। তিনি জানান, পোড়ামাটির প্রদীপ, টালি, খাজু ঘোড়ার মতো অনেক কিছু বানিয়ে সেখানে পাঠিয়ে দিয়েছেন।

পাঁচমুড়ার শিল্পীরা জানান, সময়োপযোগী ভাবে শিল্পকে ভিন্ন খাতে বয়ে নিয়ে যেতে বরাবরই চেষ্টা করেন তাঁরা। বিশ্বনাথবাবুও লক্ষী প্রতিমাও তারই ফল। তাঁর কথায়, “বাজারে পোড়ামাটির শিল্পের প্রচুর চাহিদা রয়েছে। তবে ধরাবাঁধা ছক থেকে বেরিয়ে আসার সময় হয়েছে আমাদের। এতদিন পোড়ামাটির দেবদেবীর মূর্তি শুধু ঘর সাজানো বা ঠাকুরঘরে রাখার জন্যই আমরা বানাতাম। এখন বারোয়ারি পুজোর মণ্ডপেও জায়গা করে নেওয়ার পালা।’’

বারোয়ারি মণ্ডপ দখলে ঐতিহ্যের সঙ্গে কুমোরটুলির কৌশল এবং আদলের মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন পাঁচমুড়ার শিল্পীরা। বিশ্বনাথবাবু জানান, টেরাকোটার লক্ষ্মী প্রতিমার আকৃতি হয় ছোট। বড়জোর দেড় থেকে দু’ফুট। তাঁর গড়া প্রতিমা সেই তুলনায় অনেকটাই বড়। চার ফুটেরও বেশি উঁচু সেগুলি। গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হল, পরিবহণের সুবিধার জন্য তিন-চারটি খণ্ডে পুরো প্রতিমা বানানো হয়েছে। অনায়াসেই সেগুলি খুলে ছোট করে নিয়ে আলাদা করে মুড়ে পরিবহণ করা যাবে। গড়নেও রয়েছে অভিনবত্ব। তিনি বলেন, ‘‘সাধারণ টেরাকোটার প্রতিমায় লক্ষ্মীর বাহন প্যাঁচা থাকে দেবীর পাশে। আমার প্রতিমাগুলিতে কুমোরটুলির ধাঁচে বাহনের উপরে দেবী বসে রয়েছেন। একই সঙ্গে লোকসংস্কৃতির রেশও ফুটে উঠেছে প্রতিমায়।’’

ওন্দার রামসাগর ব়ড়বাজার লক্ষ্মীপুজো কমিটি এই বার তাঁদের থিমে টেরাকোটা শিল্পকে তুলে ধরছে। পাঁচমুড়া থেকে বিশ্বনাথবাবুর একটি প্রতিমা নিয়ে গিয়েছেন তাঁরা। পুজো কমিটির সভাপতি উত্তম নন্দী বলেন, ‘‘পাঁচমু়ড়ার টেরাকোটা শিল্প আমাদের জেলার গর্ব। নিজের চোখে প্রতিমা দেখার আগে বিশ্বাসই করতে পারিনি টেরাকোটাতেও যে কুমোরটুলির মতো পেশাদার ভাবে কাজ হতে পারে।’’

সাবেক রীতি থেকে বেরিয়ে এই ধরনের ব্যতিক্রমী প্রতিমা গড়তে খাটুনিও অনেকটাই বেশি বলে দাবি বিশ্বনাথবাবুর। তিনি জানান, অনেক সূক্ষ্ম কারুকাজ রয়েছে তাঁর গড়া প্রতিমাগুলিতে। এই ধরনের প্রতিমা গড়তে প্রায় এক মাস সময় লেগে যায়। শুকোতেও সময় লাগে অনেকটাই বেশি। ন’য়ের দশকের মাঝামাঝি থেকেই টেরাকোটার কাজে নানা পরীক্ষানীরিক্ষা শুরু করেছিলেন বিশ্বনাথবাবু। কলকাতার বড় পুজো মণ্ডপে টেরাকোটার দুর্গাপ্রতিমা গড়েছেন তিনি। এ বছর বিশ্বকর্মা পুজোতেও তাঁর টেরাকোটার মূর্তি নজর কেড়েছে। গত কয়েক বছর ধরে সরস্বতী প্রতিমাও বানিয়ে আসছেন বিশ্বনাথবাবু। প্রতিটি ক্ষেত্রেই নিজস্ব ছোঁয়া আর পাঁচটি সাবেকি প্রতিমার থেকে আলাদা করে তাঁকে চিনিয়ে দেয়।

তবে টেরাকোটা শিল্পের যথাযথ বাজার ধরতে আরও প্রচার জরুরি বলে পাঁচমুড়ার শিল্পীদের দাবি। তাঁদের কথায়, ‘‘প্রচারের আলো পড়লে আমাদের ঘরেও বছরভর লক্ষ্মী থাকতে পারেন।’’

laxmi puja
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy