Advertisement
২৩ জুলাই ২০২৪

চাকায় পিষ্ট হয়ে মৃত্যু কিশোরের

পরিবেশ আদালতের নির্দেশে নদীর বালি তোলায় সরকারি নীতিতে পরিবর্তন এসেছে। প্রশাসনের কড়াকড়িতে বালি পাচারকারীরা নিত্য নতুন ফন্দি ফিকির বের করছে। তারই সূত্রে মুরারই এলাকায় পড়শি ঝাড়খণ্ড থেকে বালি পাচার বেড়ে গিয়েছে বলে এলাকার মানুষের অভিযোগ।

প্রতিবাদ: অবরোধ চলছে মুরারই-মহেশপুর সড়কে। নিজস্ব চিত্র

প্রতিবাদ: অবরোধ চলছে মুরারই-মহেশপুর সড়কে। নিজস্ব চিত্র

নিজস্ব সংবাদদাতা
মুরারই শেষ আপডেট: ০৬ মার্চ ২০১৭ ০১:০৯
Share: Save:

পরিবেশ আদালতের নির্দেশে নদীর বালি তোলায় সরকারি নীতিতে পরিবর্তন এসেছে। প্রশাসনের কড়াকড়িতে বালি পাচারকারীরা নিত্য নতুন ফন্দি ফিকির বের করছে। তারই সূত্রে মুরারই এলাকায় পড়শি ঝাড়খণ্ড থেকে বালি পাচার বেড়ে গিয়েছে বলে এলাকার মানুষের অভিযোগ। আর ওই এলাকাতেই বালিভর্তি এক ট্রাক্টরের ধাক্কায় এক কিশোরের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়াল। এলাকায় পৌঁছলে পুলিশকে তাড়া করল ক্ষিপ্ত জনতা। পরিস্থিতি বুঝে মাঠ ধরে চম্পট দেয় বিপন্ন পুলিশ।

রবিবার সকালে মুরারই–মহেশপুর রাস্তায় স্থানীয় ধীতোড়া গ্রামের কাছে জোড়সাঁকো এলাকার ঘটনা। পুলিশ জানায়, মৃতের নাম জসিমউদ্দিন শেখ (১২)। তার বাড়ি ঝাড়খণ্ডের মহেশপুর থানার নুরাই গ্রামে। ওই ঘটনায় জসিমের ভাই হাসিমউদ্দিন এবং জামাইবাবু রিটু শেখও জখম হয়েছে। হাসিমকে প্রাথমিক চিকিৎসার পরে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। রিটুর আঘাত গুরুতর থাকায় তিনি এখনও রামপুরহাট মহকুমা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, এ দিনের ঘটনা নিয়ে গত চার মাসে মুরারই থানা এলাকায় ঝাড়খণ্ড থেকে বালি নিয়ে আসা বেপরোয়া গাড়ির ধাক্কায় মোট তিন জনের মৃত্যু হল। এর আগে গত ২০ জানুয়ারি বিকালে মুরারই থেকে বাড়ি ফেরার পথে বঁড়ুয়া গ্রামে ট্রাক্টরের ধাক্কায় মারা যায় মহেশপুর থানা এলাকারই জয়পুর গ্রামের আট বছরের বালক কার্তিক মাল। ওই ঘটনায় মৃতদেহ উদ্ধার করতে গিয়ে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসীর তাড়া খেতে হয়েছিল পুলিশকে। অপর ঘটনায় গত ডিসেম্বরে মুরারইয়ের মহুরাপুরে ঝাড়খণ্ড থেকে অবৈধ ভাবে বালি পাচারের সময়ে ট্রাক্টরের ধাক্কায় ওই গ্রামেরই এক প্রৌঢ় মারা যান। পরপর একই রকম ঘটনায় পুলিশ-প্রশাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ বাড়ছে মুরারইয়ে।

ঠিক কী হয়েছিল এ দিন?

রামপুরহাট হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মুর্শিদাবাদের সুতি থানার কাঁন্দুয়ার বাসিন্দা বছর চব্বিশের যুবক রিটু জানান, মুরারই থানার ডুমুরগ্রামে এক আত্মীয়ের বাড়ি থেকে মোটরবাইকে দুই নাবালক শ্যালককে চাপিয়ে তিনি ঝাড়খণ্ডের নুরাই গ্রামে যাচ্ছিলেন। পথে জোড়সাঁকো এলাকায় ঝাড়খণ্ড থেকে এলাকায় খালি করতে উল্টো দিক থেকে আসা একটি বালি ভর্তি ট্রাক্টর আচমকা বাঁক ঘুরিয়ে নেয়। রিটুর দাবি, ‘‘জোরে ব্রেক কষলেও মোটরবাইক নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারিনি। ট্রাক্টরে গিয়ে ধাক্কা লাগতেই পিছনে বসে থাকা জসিম পড়ে যায়। তখনই ট্রাক্টরের চাকা ওকে পিষে দেয়।’’

দুর্ঘটনা ঘটতেই ট্রাক্টর ফেলে চালক ও অন্য কর্মীরা এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়। স্থানীয় বাসিন্দারাই দুর্ঘটনাগ্রস্তদের উদ্ধার করে মুরারই ১ ব্লক প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভর্তি করে। সেখান থেকে রামপুরহাট মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে গেলে জসিম মারা যায়। এ দিকে, দুর্ঘটনার খবর পেয়ে এলাকায় পুলিশ পৌঁছয়। পুলিশকে দেখে আরও উত্তেজনা ছড়ায়। স্থানীয় ডুমুরগ্রাম, ধীতোড়া, রঘুনাথপুর, মিয়াঁপুর এলাকার বাসিন্দাদের একাংশ পুলিশকে রীতিমতো তাড়া করেন। জনতার রোষ থেকে বাঁচতে পুলিশ মাঠ দিয়ে ছুটে পালিয়ে যায় বলে এলাকার মানুষের দাবি। তাঁদের আরও দাবি, পুলিশ-প্রশাসনের একাংশই টাকাপয়সা খেয়ে বালি পাচারে মদত দিচ্ছে। বেপরোয়া যান চলাচলের প্রতিবাদে এবং দোষী পুলিশ কর্মীদের ধরার দাবিতে এলাকাবাসী মুরারই–মহেশপুর রাস্তা অবরোধ করেন। পরে বিশাল পুলিশ বাহিনী এলাকায় পৌঁছে অবরোধ তুলে দেয়।

রাজ্যে ই-অকশনের মাধ্যমে বালিঘাট লিজ দেওয়ার নিয়ম চালু হওয়ার পর থেকে সরকারি ভাবে মুরারই থানা এলাকার বাঁশলৈ নদীতে বালি তোলার কাজ বন্ধ রয়েছে। বেকায়দায় পড়ে বালি মাফিয়ারা তাই ওই নদীর ঝাড়খণ্ডের অংশ থেকে বালি পাচারে সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে বাসিন্দাদের অভিযোগ। যদিও জেলা পুলিশের দাবি, ঝাড়খণ্ড থেকে বৈধ ভাবেই বালি নিয়ে আসা হচ্ছে। জেলার পুলিশ সুপার নীলকান্ত সুধীরকুমার বলেন, ‘‘রাজস্ব দিয়ে ঝাড়খণ্ড থেকে বৈধ নথি নিয়ে বালির গাড়ি পশ্চিমবঙ্গে ঢুকছে। সেই গাড়ি পুলিশ কেন আটকাবে? তবে, গাড়িগুলি বেপরোয়া ভাবে দুর্ঘটনা ঘটিয়ে থাকলে পুলিশ অবশ্যই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।’’ পুলিশের বিরুদ্ধে বালির গাড়ি থেকে টাকা তোলার অভিযোগও তিনি মানেননি।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)

অন্য বিষয়গুলি:

Murarai Road Accident Sand Mafia
সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি:
Advertisement

Share this article

CLOSE