Advertisement
E-Paper

বহু হাসপাতাল নিধিরাম, রেফার তাই দায়ে পড়েই

দুর্ঘটনায় আহত মুমূর্ষুকে রাতবিরেতে হাসপাতালে নিয়ে গেলে বহু ক্ষেত্রেই তাঁদের রেফার করে দায় সারেন ইমার্জেন্সির ডাক্তারেরা। বহু ক্ষেত্রে ভর্তি নিয়ে টালবাহানায় রোগীর মৃত্যুও হয়। এ সব ক্ষেত্রে ডাক্তারদের দায় এড়ানো মনোভাব নিয়ে যে সব অভিযোগ ওঠে, তা হয়তো সব সময়ে মিথ্যাও নয়। কিন্তু ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে এরই পাশাপাশি যে কারণটি সামনে এসেছে, তা আঙুল তুলছে সরকারি হাসপাতালে পরিকাঠামোর অভাবের দিকেই। শুধু তা-ই নয়। চিকিৎসকদের অভিযোগ, বহু ক্ষেত্রে স্রেফ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করাতেও পাঠাতে হচ্ছে অন্যত্র। কারণ পরিকাঠামোর অভাব।

সোমা মুখোপাধ্যায় ও পারিজাত বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ১৫ জানুয়ারি ২০১৬ ০০:৫৩

দুর্ঘটনায় আহত মুমূর্ষুকে রাতবিরেতে হাসপাতালে নিয়ে গেলে বহু ক্ষেত্রেই তাঁদের রেফার করে দায় সারেন ইমার্জেন্সির ডাক্তারেরা। বহু ক্ষেত্রে ভর্তি নিয়ে টালবাহানায় রোগীর মৃত্যুও হয়। এ সব ক্ষেত্রে ডাক্তারদের দায় এড়ানো মনোভাব নিয়ে যে সব অভিযোগ ওঠে, তা হয়তো সব সময়ে মিথ্যাও নয়। কিন্তু ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে এরই পাশাপাশি যে কারণটি সামনে এসেছে, তা আঙুল তুলছে সরকারি হাসপাতালে পরিকাঠামোর অভাবের দিকেই। শুধু তা-ই নয়। চিকিৎসকদের অভিযোগ, বহু ক্ষেত্রে স্রেফ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করাতেও পাঠাতে হচ্ছে অন্যত্র। কারণ পরিকাঠামোর অভাব।

ধরা যাক, কলকাতার যে কোনও জায়গায় দিনে বা রাতে কেউ পথ-দুর্ঘটনায় মাথায় গুরুতর চোট পেলেন। প্রাণ বাঁচাতে তাঁকে কোনও সরকারি মেডিক্যাল কলেজে নিয়ে যাওয়া হল। সকলেই রেফার করবেন এসএসকেএমে। কারণ, এসএসকেএম ছাড়া আর কোনও মেডিক্যাল কলেজে ইমার্জেন্সি নিউরোসার্জারি হয় না।

গত শনিবার আর জি কর মেডিক্যাল কলেজে দুর্ঘটনায় আহত দীপক সিংহের মৃত্যুর পরে খোদ চিকিৎসকদের একাংশ রাজ্যের চিকিৎসা পরিষেবার এই বিচ্যুতি নিয়ে প্রকাশ্যে যে ভাবে সরব, তাতে অস্তস্তিতে স্বাস্থ্যকর্তারা। আর জি করের জুনিয়র ডাক্তারদের কথায়, ‘‘ইমার্জেন্সি ডিউটিতে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আমরাই থাকি। দুর্ঘটনায় মাথায় গুরুতর চোট নিয়ে কেউ এলেও তাঁকে ভর্তি করতে পারি না। কারণ, জানি ভর্তি করলেও জরুরি অস্ত্রোপচার হবে না। বেঘোরে লোকটা মারা যাবে। তাই রেফারে বাধ্য হই। স্বভাবত লোকের রাগ এসে পড়ে আমাদের উপরে।’’ শুধু আর জি কর নয়, এসএসকেএম ছাড়া সর্বত্রই এই হাল জানিয়ে তাঁদের বক্তব্য, ‘‘দীপক সিংহের সিটি স্ক্যানে যদি দেখা যেত যে, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হচ্ছে, তখনও তো ভর্তি করতে পারতাম না। কারণ ইমার্জেন্সি অস্ত্রোপচার করা যেত না। পরিকাঠামো দেবে না সরকার আর মার খেতে হবে আমাদের। সরকার কেন সব ইমার্জেন্সিতে বোর্ড ঝুলিয়ে জানিয়ে দিচ্ছে না যে, এখানে ইমার্জেন্সি নিউরোসার্জারি হয় না?’’

কলকাতায় যেখানে অহরহ পথ দুর্ঘটনা ঘটছে, সেখানে এসএসকেএম ছাড়া অন্য কোনও হাসপাতালে মাথায় আঘাত লাগা রোগীদের অস্ত্রোপচারই হবে না? স্বাস্থ্যশিক্ষা অধিকর্তা সুশান্ত বন্দ্যোপাধ্যায়ের জবাব, ‘‘দিন না আমাকে কিছু নিউরোসার্জন, তা হলে শুরু করি। সারা দেশেই তো নিউরোসার্জন নেই। ইমার্জেন্সি নিউরোসার্জারি হবে কী করে?’’ নিউরোসার্জনের এই আকালে সরকার তা হলে কী করে ঢাকঢোল বাজিয়ে বিভিন্ন জায়গায় সুপার স্পেশ্যালিটি হাসপাতাল আর ট্রমা কেয়ার সেন্টার চালু করতে চলেছে? উত্তর মেলেনি।

কলকাতারই একটি মেডিক্যাল কলেজের এক ইমার্জেন্সি মেডিক্যাল অফিসারের কথায়, শুধু এসএসকেএমের পক্ষে সব কেস নেওয়া অসম্ভব। রেফার করলে রাস্তাতেও অনেক রোগী মারা যেতে পারেন। ওই অফিসার বলেন, ‘‘তাই বহু ক্ষেত্রে আমরা রেফার করি না। প্রেশার ব্যান্ডেজ করে, ড্রিপ চালিয়ে, ওষুধ দিয়ে রেখে দিই। বরাতজোরে তিনি যদি পরের দিন পর্যন্ত বেঁচে যান, তখন অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থা হয়।’’

আর এক মেডিক্যাল কলেজের ইমার্জেন্সি অফিসারের বক্তব্য, ‘‘ইমার্জেন্সি নিউরোসার্জারির জন্য শুধু নিউরোসার্জন নয়, দক্ষ টিমও দরকার। সেই পরিকাঠামো রাজ্যে প্রায় কোনও সরকারি হাসপাতালেই নেই। মানুষ তা জানেন না বলেই তাঁদের রাগ গিয়ে পড়ে ইমার্জেন্সি মেডিক্যাল অফিসারদের উপরে।’’ রাজ্যের বিভিন্ন হাসপাতালের জুনিয়র ডাক্তারেরা একবাক্যে জানান, অহেতুক তাঁরা কাঠগড়ায়। ঢাল-তরোয়ালহীন নিধিরাম সর্দার হয়ে থেকে তাঁদের পক্ষে এর চেয়ে বেশি করা সম্ভব নয়।

যে এসএসকেএমে একমাত্র ইমার্জেন্সি নিউরোসার্জারি হয়, তার কী অবস্থা? এসএসকেএমের নিউ ক্যাজুয়ালটি ব্লকে এই ধরনের রোগী ভর্তির ব্যবস্থা রয়েছে। সেখানে ৬০টির মতো শয্যা। কিন্তু ভর্তি থাকেন ১০০-রও বেশি রোগী। সোমবার সকালে ওয়ার্ডে ঢুকে দেখা গেল, মেঝে তো বটেই, এমনকী খাটের নীচেও রোগী। সাধারণ ভাবে নিউরোসার্জারির রোগীদের মেঝেতে রাখলে শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি তো ঘটেই, এমন কী সংক্রমণ ছড়ানোর ভয়ও বাড়ে। ওয়ার্ডের এক চিকিৎসক বলেন, ‘‘এই তো দেখছেন অবস্থা! আরজিকরের ডাক্তাররা সে দিন যদি রোগীকে রেফার করে থাকেন, তা হলে তাঁদের ভুলটা কোথায়? তাঁদের হাসপাতালে তো পরিকাঠামোটাই নেই। এখানে পরিকাঠামো আছে বটে, কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় তা এতই সামান্য যে আমাদেরও বেশির ভাগ সময়ে কিছু করার থাকে না।’’

হাসপাতাল যথাযথ পরিকাঠামো দিতে না পারলে তার মূল্য কেন তাঁদের মার খেয়ে চোকাতে হবে, সেই প্রশ্ন বুধবার ফের নতুন করে তুলেছেন কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের জুনিয়র ডাক্তারদের একটা বড় অংশ। এ দিন দুপুরে মূলত পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ট্রেনিদের (পিজিটি) ডেকে মেডিক্যালের সুপার শিখা বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়ে দেন, বেশ কিছু শারীরিক পরীক্ষা, বিশেষত কিছু জেনেটিক পরীক্ষা আচমকা অনেক বেশি লেখা হচ্ছে। মেডিক্যালের সেন্ট্রাল ল্যাবরেটরিতে ওই পরীক্ষা হয় না বলে হয় না বলে রোগীদের বাইরে করাতে বলা হচ্ছে। এটা বন্ধ করতে হবে। পিজিটি-রা পাল্টা জানান, প্রয়োজন আছে বলেই পরীক্ষাগুলি লেখা হচ্ছে। কর্তৃপক্ষ তা বন্ধ করতে চাইলে সেটা তাঁদের লিখিত জানাতে হবে। তা না-হলে রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে মার খেতে হবে পিজিটি-সহ অন্য জুনিয়র ডাক্তারদের।

কিন্তু প্রশ্ন হল, স্বাস্থ্য দফতর জানিয়েছিল, যে পরীক্ষা হাসপাতালে হবে না, সেগুলি হাসপাতালের কাছের বাইরের কোনও ডায়গনস্টিক ক্লিনিক থেকে করানো যাবে। টাকা মেটাবে স্বাস্থ্য দফতর। সেটা করা হচ্ছে না কেন? শিখাদেবীর জবাব, ‘‘স্বাস্থ্য দফতর স্পষ্ট করে জানায়নি। গাইডলাইন চেয়েছি।’’ জুনিয়র ডাক্তারদের অভিযোগ, ‘‘বাইরের একাধিক ডায়গনস্টিক ক্লিনিকে সরকারের এমনিতেই কয়েক লক্ষ টাকা বাকি পড়েছে। তাই এখন আমাদের পরীক্ষা লিখতে বারণ করছে। এর জেরে রোগীর অবনতি হলে তার দায়ও আবার আমাদের ঘাড়েই চাপানো হবে।’’

refer obligation hospital doctors nurses
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy