Advertisement
১৮ জুন ২০২৪

দেদার মাছ চুরি, মানছেন সৌগতও

বেসরকারি ভেড়ি হোক বা সরকারি জলাশয়, মাছ চুরি সর্বত্রই চলেছে পাল্লা দিয়ে। রবিবার প্রকাশ্য সভায় সেটা স্বীকার করে নিলেন শাসক দলের সাংসদ সৌগত রায়। শুধু স্বীকারোক্তি নয়, মাছ চুরি ঠেকাতে এ বার যে একটা ব্যবস্থা না-নিলেই নয়, সেই বিষয়ে মৎস্য দফতরকে সচেতন করিয়ে দিয়েছেন দমদমের তৃণমূল সাংসদ।

মাছ চুরি নিয়ে ১১ এপ্রিল আনন্দবাজারে প্রকাশিত প্রতিবেদন।

মাছ চুরি নিয়ে ১১ এপ্রিল আনন্দবাজারে প্রকাশিত প্রতিবেদন।

নিজস্ব সংবাদদাতা
কলকাতা শেষ আপডেট: ১১ জুলাই ২০১৬ ০৩:৩০
Share: Save:

বেসরকারি ভেড়ি হোক বা সরকারি জলাশয়, মাছ চুরি সর্বত্রই চলেছে পাল্লা দিয়ে। রবিবার প্রকাশ্য সভায় সেটা স্বীকার করে নিলেন শাসক দলের সাংসদ সৌগত রায়। শুধু স্বীকারোক্তি নয়, মাছ চুরি ঠেকাতে এ বার যে একটা ব্যবস্থা না-নিলেই নয়, সেই বিষয়ে মৎস্য দফতরকে সচেতন করিয়ে দিয়েছেন দমদমের তৃণমূল সাংসদ।

লাগাতার মাছ চুরি নিয়ে চেঁচামেচি, অভিযোগ-হাহুতাশ অনেক দিন ধরেই করে আসছেন মৎস্যজীবীরা। শুধু বেসরকারি ভেড়ি নয়, সরকারি জলাশয় থেকেও নিয়মিত লোপাট হয়ে চলেছে মাছ। ঠিক তিন মাস আগে আনন্দবাজারে এই নিয়ে প্রতিবেদন বেরোয়। দেদার মাছ চুরির জেরে রাজস্বের ক্ষতি হলেও সরকারের তরফে বিশেষ হেলদোল দেখা যায়নি। কিন্তু বিষয়টি যে আর হেলাফেলা করার পর্যায়ে নেই, সৌগতবাবু এ দিন সেটাই মনে করিয়ে দিয়েছেন। মৎস্যমন্ত্রী চন্দ্রনাথ সিংহ সভায় ছিলেন না। কিন্তু মঞ্চে ছিলেন অনেক সরকারি আধিকারিক। তাঁদের তখন ‘ছেড়ে দে মা..’ অবস্থা।

সৌগতবাবুর অবশ্য সে-সবে ভ্রুক্ষেপ নেই। মাছ চুরির কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘‘বরাহনগরের নন্দননগরের ঝিল থেকে লোকে দেদার মাছ চুরি করছে। মাছ চুরি বন্ধ হলে উৎপাদন বাড়বে। বরাহনগরের মতো বড় বড় ঝিলে মাছ চুরি ঠেকাতে মৎস্য দফতর ব্যবস্থা নিক।’’

মাছ চুরি কী ভাবে তাঁদের রুজিরোজগারের পথে কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে, সাংসদের আগে এ দিন ধীবরেরাই তা ব্যাখ্যা করেন। মৎস্যচাষি দিবস উপলক্ষে রবিবার মৎস্যজীবীদের সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়েছিল কলকাতার উত্তর উপকণ্ঠে, বনহুগলিতে। সংবর্ধনার পরে উদ্যোক্তাদের তরফে ধীবরদের কিছু বলার আমন্ত্রণ জানাতেই মঞ্চে ওঠেন ধনেখালির মৎস্যজীবী তপন দাস। মঞ্চে উপস্থিত সাংসদ, কাউন্সিলর, সরকারি আধিকারিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘‘মুখ্যমন্ত্রী মাছ উৎপাদন বাড়াতে বলছেন। অথচ রাজ্য জুড়ে দেদার মাছ চুরি চলছে। প্রশাসন মাছ চুরি রুখতে উদ্যোগী না-হলে আমরা বাঁচি কী করে!’’

এ দিন ওয়েস্ট বেঙ্গল প্রফেশনাল ফিশারিজ গ্র্যাজুয়েটস অ্যাসোসিয়েশনের ওই অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হলেও মৎস্যমন্ত্রী উপস্থিত হননি। তবে এলাকার সাংসদ সৌগতবাবু ছাড়াও ছিলেন বরাহনগর পুরসভার চেয়ারপার্সন অপর্ণা মৌলিক, ভাইস চেয়ারম্যান জয়ন্ত রায়, স্থানীয় তৃণমূল কাউন্সিলর সীমা দাস, অঞ্জন পাল-সহ রাজ্যের মৎস্য দফতরের কিছু কর্তা। বেলা ১টায় অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার পরে প্রথম তিন ঘণ্টায় রাজ্যের মৎস্য দফতরের বিভিন্ন প্রকল্প ও উদ্যোগের প্রশংসাই করছিলেন বক্তারা। কিন্তু বলতে উঠে মৎস্যজীবীরা মাছ চুরি নিয়ে উদ্বেগ-অভিযোগ মিশিয়ে দুঃখের বারমাস্যা তুলে ধরতেই বদলে যায় সুর।

মাছ চুরি এ রাজ্যে প্রায় মহাশিল্পের পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে মৎস্যজীবীদের অভিযোগ। ওই শিল্পের রমরমায় বেসরকারি ভেড়ির মালিকদের কপালে ভাঁজ যত বাড়ছে, মৎস্য দফতরের কর্তাদের কপালের কুঞ্চন তার থেকে কিছু কম নয়। কারণ, মাছের উৎপাদন বাড়লে সরকারি ভাঁড়ার বা ভেড়ি-মালিকের ঘরে যতটা লভ্যাংশ জমা পড়ে, চুরি মাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ায় তা পড়ছে না। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, চোরেদের পিছনে আছেন রাজনৈতিক দলের বড়-ছোট-মেজো-সেজো নেতা। ঠিক জায়গায় যথাসময়ে ‘প্রণামী’ পৌঁছে দিয়ে চোরেরা কাজ হাসিল করে চলেছে। মার খাচ্ছেন মৎস্যজীবীরা। মার খাচ্ছে সরকারের ভাঁড়ারও।

রাজ্যের মৎস্য উন্নয়ন নিগমের এক আধিকারিকের হিসেব, ‘‘আমাদের যা মাছ চাষ হয়, তার কুড়ি শতাংশই চুরি হয়ে যায়।’’ সারা দেশে মাছ উৎপাদনে অন্ধ্রপ্রদেশ প্রথম, দ্বিতীয় স্থানে আছে পশ্চিমবঙ্গ। মৎস্য দফতরের কর্তাদের কথায়, মাছ চুরি ঠেকাতে পারলে সারা দেশের গড় উৎপাদনের নিরিখে অন্ধ্রকে টেক্কা দিতে পারত বাংলা। অর্থাৎ এই ক্ষেত্রে বাংলার প্রথম হওয়ার পথে কাঁটা মাছচোরেরাই। এ দিন সংবর্ধনাসভায় সেটাই তুলে ধরেন মৎস্যজীবীরা।

শুধু মাছ চুরি নয়, ধীবর-কল্যাণে সরকার যে-সব ব্যবস্থা নিয়েছে বা নিচ্ছে, তার সুযোগ-সুবিধে ঠিক ঠিক জায়গায় পৌঁছচ্ছে কি না, এ দিনের সভায় ধীবরেরা সেই প্রশ্নও তুলে ধরেন। তপন মাইতি নামে কাকদ্বীপের এক মৎস্যজীবীর প্রশ্ন, ‘‘সরকারের তরফে ব্লকে ব্লকে মৎস্যচাষিদের যে-সব চারামাছ বা মাছের খাবার দেওয়ার কথা, সেগুলো তাঁরা আদৌ পাচ্ছেন কি?’’ সুবিধা-প্রাপকদের তালিকা খতিয়ে দেখার দাবিও তোলেন তপনবাবু। নৈহাটির সুপ্রভাত সরকারের বক্তব্য, মাছের সঙ্কর প্রজনন বন্ধ না-করলে উৎপাদন বাড়বে না। ‘‘সরকারের তরফে ব্যাঙ্কের মাধ্যমে মাছচাষিদের ঋণ দেওয়ার কথা বলা হলেও আমরা তো কিছুই পাচ্ছি না,’’ অভিযোগ করলেন বর্ধমানের সৌমিত্র ত্রিপাঠী।

তার পরেই বক্তৃতা দিতে উঠে মৎস্যজীবীদের অভিযোগ মেনে নেন সৌগতবাবু। চুরি বন্ধ করার ব্যাপারে ধীবরদের দাবির সঙ্গে মিলে যায় তাঁর সুর। এই নিয়ে পরে মৎস্যমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘‘মাছ চুরি সামাজিক ব্যাধি। তবে সরকারের তরফে চুরি আটকাতে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’’ ব্লকে ব্লকে মাছের চারা, মাছের খাবার কারা পাচ্ছেন? ‘‘তালিকা ঠিক হয় জেলা পরিষদ, পঞ্চায়েত সমিতির মাধ্যমে। আমরা কী করব,’’ বলেন মৎস্যমন্ত্রী।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)

অন্য বিষয়গুলি:

Saugata Roy Fish Theft
সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি:
Advertisement

Share this article

CLOSE