Advertisement
০২ মার্চ ২০২৪
বজ্রাঘাতে মৃত ২, প্রাণ গেল গাছ ভেঙেও

ঝড়ে ভাঙল বহু বাড়ি,চিন্তায় আম চাষিরাও

মাসখানেক ধরে চলা দাবদাহের আঁচ এক লাফে বেশ খানিকটা কমিয়ে দিয়েছে শনিবার সন্ধ্যার ঝড়-বৃষ্টি। আবার সেই স্বস্তির ঝড়ই চিন্তুার ভাঁজ ফেলেছে কাটোয়ার তাঁত শিল্পী ও পূর্বস্থলীর আম চাষিদের কপালে। প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, ভাতার পূর্বস্থলী ও বৈকুণ্ঠপুর এলাকায় বজ্রপাত ও দেওয়াল চাপা পড়ে মারাও গিয়েছেন তিন জন।

নিজস্ব প্রতিবেদন
শেষ আপডেট: ০৯ মে ২০১৬ ০১:২৭
Share: Save:

মাসখানেক ধরে চলা দাবদাহের আঁচ এক লাফে বেশ খানিকটা কমিয়ে দিয়েছে শনিবার সন্ধ্যার ঝড়-বৃষ্টি। আবার সেই স্বস্তির ঝড়ই চিন্তুার ভাঁজ ফেলেছে কাটোয়ার তাঁত শিল্পী ও পূর্বস্থলীর আম চাষিদের কপালে। প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, ভাতার পূর্বস্থলী ও বৈকুণ্ঠপুর এলাকায় বজ্রপাত ও দেওয়াল চাপা পড়ে মারাও গিয়েছেন তিন জন।

পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, শনিবার সন্ধ্যায় খেতের কাজ সেরে বাড়ি ফিরছিলেন ভাতারের রামচন্দ্রপুরের বাসিন্দা দিলীপ ঘোষ (৬৭)। আচমকা বজ্রপাতে ঝলসে যান তিনি। বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসা হলে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত বলে জানান। বাড়ির উঠোনে কাজ করার সময় বজ্রাহত হন বর্ধমানের বৈকুণ্ঠপুরের বাসিন্দা অভয় গড়াই (৪২) নামে এক মহিলা। বাড়িতে নারকেল গাছ ভেঙে পড়ে মৃত্যু হয়েছে পূর্বস্থলীর ছাতনি গ্রামের বাসিন্দা রিনা ধারা (৪৫) নামে এক মহিলারও।আহত তাঁর ছেলেও।

রবিবার কাটোয়ার একাধিক গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, কোথাও বাড়ির ছাউনি উড়ে গিয়েছে, কোথাও আবার তাঁতযন্ত্র নষ্ট হয়ে গিয়েছে। কাটোয়ার জগদানন্দপুর পঞ্চায়েতের ঘোড়ানাশ গ্রামের তাঁতশিল্পী প্রশান্ত দে, লক্ষ্মণ খাঁরা জানান, গ্রামের প্রায় প্রতিটি পরিবারে তিন থেকে চারটি তাঁতযন্ত্র রয়েছে। এক একটির মূল্য প্রায় হাজার দশেক টাকা। ঝড়ে বাড়ির চাল উড়ে তার বেশির ভাগই ভেঙে গিয়েছে। পঞ্চায়েত সদস্য ভাস্কর চট্টোপাধ্যায়েরও দাবি, ঝড়ে ক্ষতির পরিমাণ আনুমানিক ১ কোটি টাকা। প্রশান্তবাবুদের চিন্তুা, ‘‘এখন কী ভাবে রুটি-রুজির সংস্থান করব, বুঝতে পারছি না।’’ সোনামণি খাঁ নামে এক বাসিন্দারও জানান, ঝড়ে তাঁর বাড়ি ও তাঁতঘরের চাল উড়ে গিয়েছে। আপাতত পড়শি এক জনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন তিনি।

তাঁতঘরগুলির পাশাপাশি বহু বাড়ির খড়, অ্যাসবেস্টসের চাল উড়ে গিয়েছে। বিপর্যয় মোকাবিলা দফতরের কর্মী প্রশান্ত ভাণ্ডির দাবি, ‘‘গ্রামের অন্তত ২০০টি বাড়িতে কম-বেশি ক্ষতি হয়েছে।’’ জগদানন্দপুর পঞ্চায়েতের প্রধান চায়না দাস বলেন, ‘‘গ্রামের দক্ষিণ-পূর্ব, দক্ষিণ-পশ্চিম ও দক্ষিণপাড়াতে ক্ষতির পরিমাণ সবথেকে বেশি।’’ এই এলাকাগুলিতে মোট ১২টি বিদ্যুতের খুঁটি উপড়ে গিয়েছে। অন্তত ৩০টি জায়গায় বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে গিয়েছে। এর জেরে শনিবার সন্ধ্যা থেকে রবিবার রাত পর্যন্ত গ্রামটি বিদ্যুৎহীন অবস্থায় রয়েছে বলেও জানা গিয়েছে। বিদ্যুৎ দফতরের দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদার দীনবন্ধু দে জানান, সব সারিয়ে গ্রামে ফের বিদ্যুৎ আসতে আরও অন্তত তিন দিন সময় লেগে যাবে। ইতিমধ্যেই ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরির প্রাথমিক কাজও শুরু হয়েছে বলেও পঞ্চায়েত সূত্রে জানা গিয়েছে। রবিবার বেলা ১২টা নাগাদ ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনে যান কাটোয়া বিধানসভার তৃণমূল প্রার্থী রবীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়। তাঁর বক্তব্য, ‘‘নির্বাচনী বিধি-নিষেধ রয়েছে। তবে জেলাশাসককে ব্যবস্থা নেওয়ার আর্জি জানিয়েছি।’’

পূর্বস্থলীর বিভিন্ন এলাকাতেও বহু চাষের জমি ও বসতবাড়ি ভেঙে গিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, শনিবার সন্ধ্যা ৬টা নাগাদ পূর্বস্থলীতে শুরু হয় কালবৈশাখীর দাপট। ঘণ্টাখানেকের ঝড়ে পাটুলি, ঝাউডাঙা, সন্তোষপুর, নারায়ণপুর, কাঁকনাইল, শ্রীরামপুর, ছাতনি, দামপাল, সাতপোতা প্রভৃতি এলাকায় বহু মাটির বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বহু গ্রামেই বিদ্যুৎ ও টেলিফোনের খুঁটি উপড়ে গিয়েছে। ছিড়ে গিয়েছে বিদ্যুতের তার। রবিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত গ্রামগুলিতে বিদ্যুৎ সংযোগ আসেনি বলে খবর। কিছু এলাকায় দুর্গতদের মধ্যে ত্রিপল বিলি করা হয়েছে।

তবে সব থেকে বেশি ক্ষতি হয়েছে আমে। পূর্বস্থলী ২ ব্লকের আম চাষিরা জানান, এমনিতেই এই মরসুমে বৃষ্টির অভাব ও ম্যাঙ্গোহুপার পোকার উৎপাতে আমে ক্ষতির সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। তার উপর ঝড়ে বহু আম ঝডে গিয়েছে। পূর্বস্থলীর আমচাষি আমেদ শেখ বলেন, ‘‘স্বাভাবিকের তুলনায় এক চতুর্থাংশ ফল কমে গিয়েছে।’’ এর সঙ্গে উপরি হিসেবে যোগ হল শনিবারের ঝড়। চাষিরা জানান, ঝড়ের দাপটে গাছ থেকে অধিকাংশ আম ঝরে গিয়েছে। নষ্ট হয়েছে বহু গাছও। খোকন বিশ্বাস নামে এক চাষির আশঙ্কা, ‘‘এর মধ্যেই অনেক টাকার কীটনাশক খরচ হয়েছে। ঝড়ের ক্ষতি কী ভাবে সামলাব সেটাই ভাবছি।’’ আম চাষের পাশাপাশি পেঁপে, কলা চাষেও ব্যাপক প্রভাব পড়েছে বলে খবর। পেঁপেচাষি গৌড় বিশ্বাস বলেন, একেই এই মরসুমে পেঁপের ফলন কম। তার উপরে ঝড়ে অধিকাংশ গাছ নুয়ে পড়ল।’’

তবে ঝড়-বৃষ্টির দাপট কিছুটা হলেও স্বস্তি দিয়েছে পাট, তিল ও সব্জি চাষে। জেলার সহ কৃষি অধিকারিক পার্থ ঘোষ বলেন, ‘‘সব্জি ও পাট চাষের জন্য বৃষ্টিটা দরকার ছিল। এরপর কালনায় চাষিরা আমন ধানের বীজতলা তৈরির কাজও শুরু করতে পারবেন।’’

জেলা প্রশাসনের দাবি, ঝড়ে প্রায় দেড় হাজার বাড়ি ভেঙেছে। তার মধ্যে পূর্বস্থলী এলাকাতেই রয়েছে প্রায় ৫০০ বাড়ি। কাটোয়ার জগদানন্দপুরে প্রায় ১০০ তাঁত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রতি ব্লক থেকে বিস্তারিত রিপোর্ট পাঠানোরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on: Save:
Advertisement

Share this article

CLOSE