তথাকথিত ‘পুরুষের জগৎ’, তার উপরে দেশটার নাম ভারত! এখানে কাজ করতে ঠিক কী ধরনের মুশকিলে পড়তে হয় বলুন তো?

প্রশ্নটা ধেয়ে এল দর্শকদের মধ্য থেকে। জবাব দিতে ব্যাট ধরলেন প্যানেলের দু’জন বিদেশিনি। ‘‘স্রেফ একটা মুশকিল নাকি?’’ সরস ভঙ্গিতে শুরু করেন পাঁচতারা হোটেলের ড্যানিশ জেনারেল ম্যানেজার বিরজিট হোম। দ্ব্যর্থহীন ভঙ্গিতে বললেন, ‘‘গোড়ায় এ দেশের পুরুষদের সামলাতে গায়ে জ্বর এলেও পুষিয়ে দিয়েছেন মেয়েরা। আমার কাজের জায়গাতেই তো পুরুষদের তুলনায় মেয়েরা হাতে গোনা! কিন্তু তাঁদের পাশে ছেলেরা দাঁড়াতেই পারবে না।’’ আমেরিকান কনস্যুলেটের ভাইস কনসাল হিদার লরেশ্চেরও বিচিত্র অভিজ্ঞতা: ‘‘আমার বরকে রাতদিন শুনতে হয়, আপনি এখানে কী করছেন? বৌয়ের চাকরির জন্য বিদেশে পড়ে থাকা বা বরের ঘরদোর সামলানোর বিষয়টা অনেকেরই দেখি সহজে হজম হচ্ছে না!’’

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বণিকসভা সিআইআই-এর ইন্ডিয়ান উইমেন নেটওয়ার্কের আলোচনাসভার এটুকু শুনলে কিন্তু বুঝতে ভুল হতে পারে! বিশাখপত্তনমের মেয়ে, কলকাতার আকাশে নিত্য বিমান চালাতে ব্যস্ত পাইলট স্পন্দনা গাঁধী সেটা খোলসা করলেন। সভার তরুণতম বক্তা স্পন্দনার মতে, ‘‘এটা পুরুষ বনাম নারীর সমস্যা নয়! সমান অধিকারে অবিশ্বাসের সমস্যা। ওটাই নষ্টের গোড়া!’’ আইসিসিআর-এ ওই আলাপচারিতার আসর কলকাতায় কর্মরত এক ঝাঁক সফল মেয়ের মনের কথা বলার খোলা জানলা হয়ে উঠেছিল। আড্ডাধারীরা ফুরফুরে মেজাজে হাসলেন, হাসালেন! অজস্র সেকেলে ধারণা খানখান করলেন! আবার নারী ও পুরুষ— এই দু’‌টো ডানায় ভারসাম্য রেখে চলার বার্তাও দিলেন সকলের জন্যই।

ভারসাম্যের অভাবের সমস্যাটা শুধু ভারতের নয়! আমেরিকাতেও ভোটদাতাদের মধ্যে মেয়েরাই বেশি! কিন্তু পেশাগত ক্ষেত্রে বা কর্পোরেট-শীর্ষে তাঁরা নিতান্তই সংখ্যালঘু। এ কথা বলে ধরতাই দিয়েছিলেন কলকাতার নতুন আমেরিকান কনসাল জেনারেল প্যাটি হফম্যান। কথায় কথায় উঠে এল: সাফল্যের চুড়ো ছুঁলেও এক ধরনের অদৃশ্য কাচের দেওয়াল ঘিরে থাকে মেয়েদের। তাঁদের যোগ্যতা, উপরে ওঠার পথটা নিয়ে তির্যক ঠাট্টা চলে। সফল কর্পোরেট কর্ত্রী শালিনী বিশ্বাস হাসলেন, ‘‘মহিলা ‘বস’-কে অনেকেই অবলা নারী বলে ভুল করে।’’ আর মাস্টার শেফ ফাইনালিস্ট, রন্ধন বিশেষজ্ঞ তথা উদ্যোগপতি প্রিয়াঙ্কা মালিকের কথায়, ‘‘অজস্র জখম পুরুষালি ইগোর ভিড়ে মেয়েদের হাঁটা যেন, সরু দড়িতে পা ফেলে চলা।’’

আলাদা নজর কাড়লেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, পশ্চিমবঙ্গের প্রথম মুসলিম মহিলা পুলিশ অফিসার পাপিয়া সুলতানা। বোরখা থেকে পুলিশি উর্দিতে উত্তরণের টানাপড়েনে ঘরে-বাইরে নানা মূল্য চোকানোর গল্প শোনালেন তিনিও। পাপিয়া এক জন গর্বিত একলা-মা। তাঁর মতে, ‘‘পুলিশে ছেলে বা মেয়ে, সকলেরই চ্যালেঞ্জ, মাথা না-নুইয়ে তদন্ত করে যাওয়া।’’ পার্ক স্ট্রিট ধর্ষণ-কাণ্ডে নির্ভীক তদন্তের জন্য নন্দিত আইপিএস-কর্তা দময়ন্তী সেনের দৃষ্টান্তও তুলে ধরলেন পাপিয়া।

বৃহত্তর সমাজের মেয়েদের জন্য আরও ‘রোলমডেল’-এর হদিস দিতে এমন আলোচনাসভার গুরুত্বের কথা বললেন সিআইআই-এর সভাপতি অগ্নিমিত্রা পল এবং সঞ্চালক, জনসংযোগ বিশারদ পারমিতা ঘোষ। কিন্তু পাপিয়া এক অন্য দৃষ্টিভঙ্গিও মেলে ধরলেন। ‘‘আরও অনেক মেয়ে অফিসার দরকার পুলিশে। পাচার হওয়া মেয়ে বা দুর্বলদের জন্য সমানুভূতির তাগিদেও মেয়েদের বিকল্প নেই,’’ হাততালি ছাপিয়ে তাঁর দৃপ্ত স্বরটুকু ভাসতে থাকল সভাঘরে।