শরীরটা ভাল ছিল না বছর চুয়াল্লিশের জয়ন্তী গাওয়াড়ের। ধুম জ্বর। তার মধ্যে মাসিক ঋতুস্রাব শুরু হল। জয়ন্তীকে যেতে হল গ্রামের প্রান্তে জঙ্গলের ধারে জীর্ণ ‘গাউকোর’ বা ঋতুকালীন ঘরে। 

এটাই গোন্ড ও মারিয়া উপজাতির রীতি। না মানলে সমাজচ্যুত হতে হবে মহিলার পরিবারকে। ঋতুর প্রথম চার দিন নারীকে ‘অপবিত্র’ মনে করেন এই উপজাতির মানুষ। সেই সময়ে কোনও মহিলার গ্রামে স্থান নেই। গ্রামের পুকুরও তিনি ব্যবহার করতে পারবেন না। তাঁর সঙ্গে কথাও বলবেন না কেউ। ঠাঁই হবে গ্রাম থেকে দূরে গাউকোরে। সে সব ঘর প্রায় ভগ্নস্তূপ। জানলাহীন, দরজার কপাট নেই। গাছের পাতা, ছেঁড়া কাপড় দিয়ে কোনও রকমে আড়াল করা জায়গায় মলমূত্র ত্যাগ করতে হয়। 

 ২০১৭ সালের ১৫ নভেম্বর মহারাষ্ট্রের গড়ছিরৌলি জেলার এটাপল্লিটোলা গ্রামে এই রকমই এক গাউকোরে পড়ে ছিল জয়ন্তীর দেহ। জ্বরে রক্তচাপ বেড়ে মস্তিষ্কের ধমনী ফেটে গিয়েছিল তাঁর। যখন অসুস্থ বোধ করছিলেন, ধারেকাছে কেউ ছিল না। এরও বছর খানেক আগে ঘোর বর্ষার মধ্যে মহারাষ্ট্রের ভমরাগড় জেলায় গাউকোরে ছিল বছর তেরোর এক কিশোরী। প্রবল রক্তপাত হচ্ছিল তার। নিস্তেজ হতে-হতে ক্রমে থেমে যায় হৃদ্‌স্পন্দন। ২০১৫ সালের নভেম্বরে পাদাটোলার এক ভাঙাচোরা গাউকোর থেকে এক কিশোরীকে তুলে নিয়ে যায় ভাল্লুক! সাপের কামড়ে, নড়বড়ে দেওয়াল ধসে পড়ে, ফাটা চালের উপর গাছ ভেঙে পড়েও গাউকোরে মারা গিয়েছেন মহিলারা।

দিল্লি দখলের লড়াইলোকসভা নির্বাচন ২০১৯ 

২০১১ সালে মহারাষ্ট্রের উপজাতি-অধ্যুষিত গড়ছিরৌলি জেলার ২২৩টি গাউকোরের অবস্থা ঘুরে দেখে একটি রিপোর্ট তৈরি করে স্থানীয় একটি স্বেচ্ছাসেবী  সংগঠন। গাউকোরগুলির নরকতুল্য অবস্থা তখনই সামনে আসে। ২০১১ থেকে ২০১৩-র মধ্যে ওই জেলায় তারা বিভিন্ন গাউকোরে ১৫ জন বিভিন্ন বয়সের নারীর মৃত্যুর তথ্য সংগ্রহ করেছিল।

ঋতুকালীন সময়ে মহিলারা ‘অপবিত্র’— এই ধারণা থেকেই কেরলের শবরীমালা মন্দিরে নির্দিষ্ট বয়সের মেয়েদের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পরেও নারীর কাছে সেই মন্দিরের পথ সুগম হয়নি। ভারতে ঋতুকালীন সময়ে অযৌক্তিক নানা নিয়মকে কেন্দ্র করে তৈরি তথ্যচিত্র ‘পিরিয়ড. এন্ড অব সেনটেন্স’ সম্প্রতি অস্কার পেয়েছে। তার পরেও প্রান্তবাসী জনজাতির মেয়েদের মাসের এই কয়েকটা দিনে আরও প্রান্তবাসী করে দেওয়ার ঐতিহ্য অটুট। অভিযোগ, এ নিয়ে  প্রশাসনও চুপ। 

গড়ছিরৌলির যে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা প্রথম গাউকোরের দুরবস্থা নিয়ে মুখ খোলে তার প্রধান দিলীপ বর্ষাগাডের কথায়, ‘‘এতে মহিলাদের স্বাস্থ্য ও প্রজনন ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাঁদের ‘অপবিত্র’ তকমা দিয়ে একঘরে করে দিয়ে চূড়ান্ত অপমান করা হয়। অথচ সরকার তা নিয়ে চুপ।’’ এই সংস্থাই ২০১৩ সালে গাউকোরের কথা প্রথম জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে লিখিত ভাবে জানায়। যার উত্তরে মানবাধিকার কমিশন লিখেছিল, ‘সভ্য সমাজে এমন প্রথা অকল্পনীয়।’ 

কেন্দ্রীয় মানবাধিকার কমিশনের এক সদস্যের কথায়, ‘‘মোট ৬ বার মহারাষ্ট্র সরকারকে এই প্রথা বন্ধে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অথচ উপজাতি মহিলাদের মর্যাদাহানিকর গাউকোর এখনও রয়ে গিয়েছে। কমিশনের ফৌজদারি ক্ষমতা নেই বলে প্রশাসন কথা শোনার প্রয়োজনীয়তা বোধ করে না।’’ মহারাষ্ট্র সরকারের নির্লিপ্ততার সমালোচনা করে কমিশন শেষ নির্দেশিকা দিয়েছে ২০১৮ সালের ১৬ জানুয়ারি। তারপরেও কিচ্ছু হয়নি। ধানুরা তালুকের গিরোলা গ্রামের মারিয়া জনজাতির মেয়ে সানঝি কোরচে এখন দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে। টেলিফোনে বলল, ‘‘যখন প্রতি মাসে গ্রাম থেকে বেরিয়ে জঙ্গলে গাউকোরে ঢুকতে হয় তখন মনে হয় এত কষ্ট করে লেখাপড়া শেখা বৃথা। এতটুকু এগোয়নি আমার সমাজ।’’ সীতাটোলার বছর চব্বিশের সতীশীলা হরিদাস টেলিফোনে বলেন, ‘‘দশ-এগারো বছরের ছোট্ট মেয়েগুলোকে একা ঋতুর সময়ে গাউকোরে রেখে আসতে হয়। ভয়ে আধমরা হয়ে থাকে।’’

গড়ছিরৌলির কালেক্টর শেখর সিংহের সঙ্গে টোলিফোনে যোগাযোগ করা হলে বললেন, ‘‘উপজাতীয় রীতিনীতির মতো স্পর্শকাতর বিষয় এখানে জড়িত। ফলে প্রশাসনকে ধীরে পা ফেলতে হচ্ছে। গোন্ড-মারিয়া সম্প্রদায়কে সচেতন করতে উপজাতি এলাকার স্কুলে সম্প্রতি আমরা ইউনিসেফের সহযোগিতায় ‘উড়ান’ নামে একটি প্রকল্প শুরু করেছি। এর পর এলাকার বাড়ি বাড়ি গিয়ে মহিলা ও গ্রামপ্রধানদের সচেতন করা হবে।’’