(সামনে) ভেনেজ়ুয়েলার বন্দি প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো। ডোনাল্ড ট্রাম্প (নেপথ্যে) — ফাইল চিত্র।
সোমবার আদালতে হাজির করা হতে পারে ভেনেজ়ুয়েলার অপহৃত প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে। ম্যানহাটনের এক আদালতের মুখপাত্র জানিয়েছেন, মাদুরো এবং তাঁর স্ত্রীকে সোমবার ফেডারেল ম্যানহাটন আদালতে হাজির করানোর কথা রয়েছে। স্থানীয় সময় দুপুর ১২:০০টা নাগাদ শুনানি শুরু হওয়ার কথা।
আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনেজ়ুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রড্রিগেসকে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘দ্য আটলান্টিক’-কে ট্রাম্প বলেন, “যদি রড্রিগেস সঠিক ভাবে কাজ না করেন, তা হলে তাঁকে মাদুরোর থেকেও বড় মূল্য দিতে হতে পারে।”
মার্কিন বিদেশ সচিব রুবিয়ো আরও জানিয়েছেন, আমেরিকা সরাসরি ভেনেজ়ুয়েলা চালাবে না। তবে তেল নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের উপর চাপ বৃদ্ধি করার চেষ্টা করা হবে। তেলের ট্যাঙ্কারগুলির উপর আরও কড়া নিষেধাজ্ঞা চাপানো হবে। যত ক্ষণ না ভেনেজ়ুয়েলায় পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে কিংবা ভেনেজ়ুয়েলার পরিস্থিতি আমেরিকার জাতীয় স্বার্থের সহায়ক হবে, তত দিন এই নিষেধাজ্ঞা চলবে।
ভেনেজ়ুয়েলার তৈলভান্ডার নিয়ে মার্কিন বিদেশ সচিব বলেন, ‘‘তেলের কথা বলতে গেলে বলতে হবে যে ভেনেজ়ুয়েলার তেলশিল্প সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। ওরা দেউলিয়া হয়ে গিয়েছে। এই খাতে পুনরায় বিনিয়োগ করা দরকার। এটা স্পষ্ট যে ওদের সেই শিল্পকে আবার গড়ে তোলার ক্ষমতা নেই। তাই বেসরকারি সংস্থাগুলির বিনিয়োগ প্রয়োজন, যারা কেবল নির্দিষ্ট শর্তে বিনিয়োগ করবে।’’
উল্লেখ্য, শনিবার ট্রাম্পও জানিয়েছেন, ভেনেজ়ুয়েলার জ্বালানিভান্ডার দখলের জন্য শীঘ্রই মার্কিন তেলের কোম্পানিগুলিকে অনুমোদন দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন তিনি। ট্রাম্প জানিয়েছেন, মার্কিন সংস্থাগুলি এই প্রকল্পে কোটি কোটি ডলার ব্যয় করবে। তিনি বলেন, ‘‘আমাদের বৃহত্তম তৈলসংস্থাগুলি এখানে আসবে এবং কোটি কোটি ডলার ব্যয় করবে। তারা ভেঙে পড়া জ্বালানি ব্যবস্থার মেরামত করবে এবং দেশের জন্য অর্থ উপার্জন শুরু করবে।’’
ভেনেজুয়েলার প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভ্লাদিমির পাদ্রিনো লোপেজ় রবিবার জানিয়েছেন, আমেরিকার অভিযানে প্রেসিডেন্ট মাদুরোর নিরাপত্তা রক্ষীদের অধিকাংশই নিহত হয়েছেন। নিরীহ নাগরিকদের ‘ঠান্ডা মাথায় হত্যা করা হয়েছে’ বলেও দাবি করেছেন লোপেজ়।
ভেনেজ়ুয়েলার পর কি আমেরিকার নিশানায় কিউবা? স্পষ্ট করে তেমন কিছু না জানালেও মার্কিন বিদেশসচিব মার্কো রুবিয়োর বক্তব্যে তেমনই ইঙ্গিত মিলেছে। রবিবার রুবিয়ো বলেছেন, কিউবান সরকার ‘একটি বিশাল সমস্যা’। তাঁর আরও দাবি, ধরা পড়ার আগে নিকোলাস মাদুরোকে পাহারা দিচ্ছিল কিউবানরাই। রুবিয়ো বলেন, ‘‘আমি মনে করি, তারা অনেক সমস্যায় আছে। এ বিষয়ে আমাদের ভবিষ্যতের পদক্ষেপ এবং নীতিগুলি কী হবে, তা এখনই বলব না। তবে আমি মনে করি না যে আমরা কিউবার শাসনের সমর্থক নই, এটি কোনও রহস্য।’’
রুবিয়ো আরও বলেন, ‘‘মাদুরোর অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ রূপে নিয়ন্ত্রণ করত কিউবানরাই। তারাই মাদুরোকে পাহারা দিত। ভেনেজ়ুয়েলার দেহরক্ষী নয়, মাদুরোর কিউবান দেহরক্ষী ছিল।’’ শুক্রবার রাতের অভিযানে অনেক কিউবান প্রাণ হারিয়েছেন বলেও দাবি করেছেন মার্কিন বিদেশ সচিব।
কিউবাকে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্টও। প্রেসিডেন্ট মিগেল দিয়াজ়-কানেলকে ‘ব্যর্থ শাসক’ বলে উল্লেখ করে ট্রাম্প বলেছেন, ‘‘কিউবার পরিস্থিতি এখন ভাল নয়। সেখানে প্রশাসনিক পরিকাঠামো ভেঙে পড়েছে। কিউবার জনগণের পক্ষে তা মোটেই সুখকর নয়। বছরের পর বছর ধরে কিউবার মানুষ ব্যর্থ শাসকের জন্য ফল ভুগছে। কিউবার মানুষকে এর থেকে মুক্তি দিতে হবে।’’
ভেনেজ়ুয়েলার ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রড্রিগেসকে আপাতত ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসাবে নিয়োগ করেছে সে দেশের আদালত। ভেনেজ়ুয়েলার সুপ্রিম কোর্ট এই নির্দেশ দিয়েছে। ক্ষমতা পেয়েই আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে কড়া বার্তা দিয়েছেন ডেলসি। অবিলম্বে প্রেসিডেন্ট মাদুরো এবং তাঁর স্ত্রীর মুক্তির দাবিও জানিয়েছেন তিনি। ভেনেজ়ুয়েলায় আমেরিকার অভিযানকে ‘বর্বরোচিত’ বলেও উল্লেখ করেছেন ডেলসি। উল্লেখ্য, মাদুরোকে অপহরণের পর ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন, আপাতত আমেরিকাই ভেনেজ়ুয়েলা চালাবে। এই ঘোষণার নিন্দা করে ডেলসি জানিয়েছেন, দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা করতে তাঁরা প্রস্তুত। তিনি বলেছেন, ‘‘আমরা কখনও কারও দাসত্ব করব না। কোনও সাম্রাজ্যের উপনিবেশ আর আমরা হব না। আমরা ভেনেজ়ুয়েলাকে রক্ষা করতে প্রস্তুত।’’
মাদুরোকে বন্দি করে ভেনেজ়ুয়েলার ‘দখল’ নেওয়ার পর মেক্সিকো, কলম্বিয়া এবং কিউবাকেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। ভেনেজ়ুয়েলার মতো পরিস্থিতি হতে পারে বলেও তিন দেশকে সতর্কবার্তাও দিয়েছেন তিনি। একইসঙ্গে ট্রাম্প এটাও বুঝিয়ে দিতে চেয়েছেন যে, মাদকপাচার এবং অনুপ্রবেশকারীর বিষয়ে তাঁর দেশ কোনও আপসের পথে হাঁটবে না। মাদক সন্ত্রাসকে রুখতে প্রয়োজনে যা করতে হবে, তা-ই করবেন তিনি। ট্রাম্প বলেছেন, ‘‘মাদক সন্ত্রাসকে রুখতে যদি ওই অঞ্চলে আমেরিকাকে পা রাখতে হয়, প্রয়োজনে সেটাও করতে প্রস্তুত। আর এর জন্য কারও চোখরাঙানিও মেনে নেব না।’’
ভেনেজ়ুয়েলার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ এনেছে আমেরিকা। মাদকসন্ত্রাস, কোকেন পাচারের মতো অভিযোগ তো রয়েইছে, এ ছাড়াও মাদুরোর বিরুদ্ধে অস্ত্র অপরাধের অভিযোগও আনা হবে। মার্কিন বিচার বিভাগ জানিয়েছে, মাদুরোর বিরুদ্ধে দুর্নীতিগ্রস্ত, অবৈধ সরকার পরিচালনার অভিযোগ আনা হয়েছে। ফার্স্ট লেডি সিলিয়া ফ্লোরেসের বিরুদ্ধেও সরকারি কর্তাদের প্রভাবিত করা, কোটি কোটি টাকা ঘুষ নেওয়া থেকে শুরু করে মাদক পাচারে মদত দেওয়ার মতো নানা গুরুতর অভিযোগ তুলেছে আমেরিকা।
ভেনেজ়ুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তুলে আনা কি উচিত হয়েছে আমেরিকার? বিশ্ব জুড়ে এখন এই প্রশ্নই উঠছে। ট্রাম্পের বন্ধু দেশ কিংবা রিপাবলিকানেরা ছাড়া প্রায় কেউই মার্কিন অভিযানকে ভাল চোখে দেখছেন না। শুধু বিদেশে নয়, আমেরিকার মধ্যেও ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনা চলছে। শিকাগো, ওয়াশিংটনের রাস্তায় জড়ো হয়ে বিক্ষোভ দেখিয়েছেন আমেরিকানরা। ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তের নিন্দা করেছেন ডেমোক্র্যাটরাও। তাঁদের নেত্রী কমলা হ্যারিস ট্রাম্পের এই পদক্ষেপকে ‘বেআইনি’ বলে কটাক্ষ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘‘ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ কখনওই আমেরিকাকে সুরক্ষিত বা শক্তিশালী করবে না।’’ কমলার মতে, মাদুরোকে স্বৈরাচারী, নিষ্ঠুর, অবৈধ শাসক বলে কখনওই ট্রাম্প এ ধরনের হামলায় যুক্তি খাড়া করতে পারেন না! শুধু একা হ্যারিস নন, নিউ ইয়র্কের মেয়র জ়োহরান মামদানিও নিন্দা করেছেন ট্রাম্প প্রশাসনের। তাঁর দাবি, ভেনেজ়ুয়েলার বিরুদ্ধে ‘যুদ্ধ’ ঘোষণা করেছেন ট্রাম্প।
ভেনেজ়ুয়েলার অপহৃত প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো এখন নিউ ইয়র্কের ডিটেনশন ক্যাম্পে বন্দি। শনিবার প্রাসাদে ঢুকে শোয়ার ঘর থেকে সস্ত্রীক মাদুরোকে তুলে নিয়ে যায় পেন্টাগনের ডেল্টা বাহিনী। প্রথমে তাঁদের নিউ ইয়র্কের স্টুয়ার্ট এয়ার ন্যাশনাল গার্ড বেসে নিয়ে যাওয়া হয়। তার পর সেখান থেকে হেলিকপ্টারে চাপিয়ে উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হয় ম্যানহাটনের ডিইএ-র সদর দফতরে। সেখান থেকে নিয়ে যাওয়া হয় ব্রুকলিনের মেট্রোপলিটন ডিটেনশন সেন্টারে। সংবাদসংস্থা সূত্রে খবর, মাদুরোকে ম্যানহাটনের ফেডারেল আদালতে পাঠানো হতে পারে। আমেরিকার অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বন্ডি জানিয়েছেন, সেখানে বিচারের আওতায় আনা হবে মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে।
আমেরিকার সঙ্গে ভেনেজ়ুয়েলার চাপানউতর চলছিল দীর্ঘ দিন ধরেই। দক্ষিণ আমেরিকার দেশটিতে তেলের ট্যাঙ্কার চলাচলের উপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছিলেন ট্রাম্প। স্পষ্ট জানিয়েছিলেন, ভেনেজ়ুয়েলা সীমান্তে কোনও তেল ট্যাঙ্কার আসা-যাওয়া করতে পারবে না। সঙ্গে ভেনেজ়ুয়েলা সরকারকে ‘জঙ্গি গোষ্ঠী’ তকমাও দিয়েছিলেন তিনি। মাদুরোকে ‘অবৈধ শাসক’ বলে অভিহিত করে তাঁকে পদত্যাগ করতেও বলেছিলেন।
এই মুহূর্তে বিশ্বের বৃহত্তম খনিজ তেলের ভান্ডার রয়েছে ভেনেজ়ুয়েলায়। প্রতি দিন প্রায় ১০ লক্ষ ব্যারেল তেল উৎপাদন হয় সে দেশে। ভেনেজ়ুয়েলার দাবি, তাদের সেই খনিজ সম্পদ লুট করতে চান মার্কিন প্রেসিডেন্ট। তা ছাড়া, গত কয়েক বছরে চিন এবং রাশিয়ার সঙ্গেও ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়েছে মাদুরোর সরকার। তার পর থেকেই নড়েচড়ে বসেছে ওয়াশিংটন।
আমেরিকা বার বার দাবি করেছে, মাদক পাচার এবং অন্যান্য অপরাধের জন্য তেল ব্যবহার করছে ভেনেজ়ুয়েলা। ওই তেল আদতে চুরি করা হচ্ছে ভেনেজ়ুয়েলার বিভিন্ন খনি থেকে। তার পর তা বিক্রি করে জঙ্গি কার্যকলাপে ব্যবহার করা হচ্ছে। সে সব রুখতে কয়েক মাস আগে থেকেই ক্যারিবিয়ান সাগরে বিপুল সংখ্যক যুদ্ধজাহাজ এবং পরমাণু-ডুবোজাহাজ নামিয়েছিল ট্রাম্পের সরকার। সর্ব ক্ষণ দেশটিকে একপ্রকার ঘিরে রেখেছিল মার্কিন ফৌজ।
ভেনেজ়ুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সস্ত্রীক বন্দি করে দেশছাড়া করা হয়েছে। শুক্রবার মধ্যরাত (স্থানীয় সময় অনুসারে রাত ২টো) থেকে ভেনেজ়ুয়েলায় সামরিক অভিযান চালিয়ে মাদুরোকে বন্দি করেছে আমেরিকা। আমেরিকার এই সামরিক পদক্ষেপের নিন্দা করেছে ভেনেজ়ুয়েলা। ভেনেজ়ুয়েলার সরকারের দাবি, সে দেশের খনিজ তেল এবং সম্পদ হাতানোর জন্যই এই কাজ করেছে আমেরিকা। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের এই চেষ্টা সফল হবে না বলে জানিয়েছে তারা। আমেরিকার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের বসতি এলাকাতেও হামলা চালানোর অভিযোগ তোলা হয়েছে। ইতিমধ্যেই মার্কিন হানার নিন্দা করে বিবৃতি দিয়েছে বিভিন্ন দেশ।
Or
By continuing, you agree to our terms of use
and acknowledge our privacy policy
We will send you a One Time Password on this mobile number or email id
Or
By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy