Nepal election 2026

রাজতন্ত্রপন্থীরা বিপর্যস্ত! নেপাল-ভোটে ভরাডুবির দায় নিয়ে রাজনীতিই ছেড়ে দিলেন রাষ্ট্রীয় প্রজাতন্ত্র পার্টির নেতা

২০২২ সালের নির্বাচনে নেপাল পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ ‘হাউস অফ রিপ্রেজ়েন্টেটিভস’ (প্রতিনিধি সভা)-এ রাজতন্ত্রপন্থী আরপিপির আসন ছিল ১৪টি। এ বার মাত্র একটি আসনে তারা এগিয়ে।

Advertisement

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ০৭ মার্চ ২০২৬ ১৬:০৬
Share:

(বাঁ দিকে) রবীন্দ্র মিশ্র এবং প্রাক্তন রাজা জ্ঞানেন্দ্র (ডান দিকে)। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

ব্যবধান ঠিক ১২ মাসের। রাজতন্ত্র ফেরানোর দাবিতে গত বছরের মার্চ মাসে প্রবল জনবিক্ষোভে উত্তাল হয়েছিল নেপাল। ‘হিংসাত্মক’ আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগে রাষ্ট্রীর প্রজাতন্ত্র পার্টি (আরপিপি)-একাধিক নেতার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা করেছিল পুলিশ। কিন্তু সদ্যসমাপ্ত সাধারণ নির্বাচনে নেপালে মুখ থুবড়ে পড়ল সেই দল। আর সেই হারের দায় স্বীকার করে ইস্তফা দিলেন অন্যতম শীর্ষনেতা!

Advertisement

নেপালের সাধারণ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে চলেছে গত সেপ্টেম্বরে ‘গণঅভ্যুত্থানে’ সরকার বদলের কারিগর জেন জ়ি-দের (তরুণ প্রজন্ম) পছন্দের দল রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (আরএসপি)। ওই দলের প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী তথা কাঠমান্ডুর প্রাক্তন মেয়র বলেন্দ্র শাহ সে দেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হতে চলেছেন। নেপাল পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ ‘হাউস অফ রিপ্রেজ়েন্টেটিভস’ (প্রতিনিধি সভা)-এর ২৭৫ আসনের সদস্যদের বাছতে বৃহস্পতিবার জোড়া ব্যালটে ভোট দিয়েছিল নেপাল। এর মধ্যে ১৬৫টিতে প্রত্যক্ষ এবং ১১০টিতে পরোক্ষ (সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব বা পিআর পদ্ধতিতে) নির্বাচন হয়েছিল। প্রত্যক্ষ নির্বাচনের গণনার ফল এবং প্রবণতা বলছে ১১৯টি আসতে চলেছে আরএসপির ঝুলিতে।

অন্যদিকে, , সে দেশের প্রাচীনতম রাজনৈতিক দল নেপালি কং‌গ্রেস ১৮, কমিউনিস্ট পার্টি অফ নেপাল-এর (ইউএমএল) ১৩ এবং প্রাক্তন মাওবাদী গেরিলা নেতা তথা আর এক প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী পুষ্পকমল দহাল ওরফে প্রচণ্ডের দল নেপালি কমিউনিস্ট পার্টি ৮টি আসনে জিততে চলছে। আর রাজতন্ত্রপন্থী আরপিপি? শনিবার সকাল পর্যন্ত একটি আসনে সামান্য ব্যবধানে একটি আসনে এগিয়ে রয়েছে তারা। বিপর্যয়ের দায় কাঁধে নিয়ে দলের সিনিয়র সহ-সভাপতি পদে ইস্তফা দিয়ে শনিবার রাজনীতি ছাড়ার ঘোষণা করেছেন প্রবীণ নেতা রবীন্দ্র মিশ্র। তিনি নিজেও এ বার ভোটে পরাস্ত হয়েছেন। এর আগে ২০২২ সালের সাধারণ নির্বাচনে প্রতিনিধি সভায় আরপিপির আসন ছিল ১৪টি।

Advertisement

গত সেপ্টেম্বর মাসে তরুণ প্রজন্ম (জেন জ়ি)-এর বিক্ষোভের জেরে নেপালে পতন হয়েছিল প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলির সরকারের। তার মাস ছ’য়েক আগে রাজতন্ত্র প্রত্যাবর্তনের দাবিতে আন্দোলন ঘিরে অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠেছিল নেপাল। রাজতন্ত্রের সমর্থক আরপিপির পাশাপাশি গণতন্ত্রপন্থী নেপালি কংগ্রেসের সমর্থকদের একাংশও ‘প্রতীকী রাজতন্ত্রের’ প্রত্যাবর্তনের দাবিতে রাস্তায় নেমেছিলেন সে সময়। ওলি সরকার সে সময় বলপ্রয়োগ করে দমন করেছিল সেই আন্দোলন। আরপিপির অনেক নেতা-কর্মীকে জেলে যেতে হয়েছিল। ঘটনাচক্রে, সাধারণ নির্বাচনের আগে গত মাসে নেপালে ফিরছিলেন ক্ষমতাচ্যুত রাজা জ্ঞানেন্দ্র। তাঁকে স্বাগত জানাতে রাজধানী কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সামনে ভিড় জমিয়েছিলেন হাজার হাজার মানুষ।

সে সময় অনেকে মনে করেছিলেন ভোটে চমকপ্রদ ফল করতে পারে আরপিপি। কিন্তু সেই পূর্বাভাস মিলল না। প্রসঙ্গত, দু’দশক আগে ভারতের উত্তরের পড়শি দেশ নেপালে প্রচলিত ছিল রাজতন্ত্র। শেষ রাজা ছিলেন জ্ঞানেন্দ্র। ২০০৬ সালে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন। এর পরে ২০০৮ সালের মে মাসে সংবিধান সংশোধন করে ২৪০ বছরের পুরনো রাজতন্ত্র ভেঙে নেপালে প্রতিষ্ঠিত হয় গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা। ২০১৫ সালে অনুমোদিত হয় নতুন ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ সংবিধান। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর জ্ঞানেন্দ্র নেপালের সাধারণ নাগরিক হিসাবে বাস করেন। তাঁর কোনও রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ক্ষমতা নেই। অনুমতি নেই রাজপ্রাসাদে যাওয়ার। এমনকি, সরকারি কোনও সুবিধাও তিনি পান না। নেপালে যখন রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত ছিল, সেই সময় দেশটি হিন্দুরাষ্ট্র হিসাবেই পরিচিত ছিল। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হওয়ার পরে নেপালকে ধর্মনিরপেক্ষ বলে ঘোষণা করা হয়। পরে দেশের সংবিধানেও সেই স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

প্রসঙ্গত, ১৭৬৮ সালে সেখানে শাহ রাজবংশের সূচনা হয়েছিল। জ্ঞানেন্দ্রের দাদা রাজা বীরেন্দ্র ছিলেন পৃথ্বীনারায়ণের নবম প্রজন্ম। তাঁকে হত্যা করে যুবরাজ দীপেন্দ্র আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। মৃত্যুশয্যাতেই তাঁর অভিষেক হয়। দীপেন্দ্র বাঁচেননি। ২০০১-এর জুন মাসের সেই হত্যাকাণ্ডের পর জ্ঞানেন্দ্র সিংহাসনে বসেছিলেন। রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং মাওবাদী সমস্যার মোকাবিলায় ২০০৫ সালের গোড়ায় নেপালে গণতান্ত্রিক সরকারকে সরিয়ে ক্ষমতা হাতে নিয়েছিলেন জ্ঞানেন্দ্র। তার পরে দ্রুত তাঁর বিরুদ্ধে গণবিক্ষোভ দানা বেঁধেছিল। তারই জেরে ক্ষমতা হারিয়েছিলেন তিনি। গণতন্ত্রের নেপাল এ বার তাঁর সিংহাসনে পুনর্বাসনের সম্ভাবনায় জল ঢেলে দিল বলেই রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের অনেকে মনে করছেন।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement