খোঁপার কাঁটার পরে এ বার টি-শার্ট। 

বাংলাদেশের বাজারে মেয়েদের জন্য এ বার এসেছে নতুন টি-শার্ট। আর এসেই সটান আলোচনার মধ্যমণি।

পক্ষে-বিপক্ষে কটু-কাটব্যের ঝড়। কেউ ‘গেল গেল’ রব তুলেছে, কেউ বলছে ‘অসভ্যদের লজ্জায় ফেলবে’। 

ছাঁট-কাটে এমন কিছু বিশেষত্ব নেই এই উজ্জ্বল এক রঙা টি-শার্টের। শুধু পিঠে লেখা— ‘গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না’। এই স্লোগান নতুন নয় বাংলাদেশে। যে অনলাইন ভিত্তিক ফ্যাশন সংস্থা টি-শার্টগুলো এনেছে, তারাই এর আগে খোঁপার কাঁটায় ছড়িয়ে দিয়েছিল এই বারণ। স্পষ্ট বার্তা বাসের কুমতলবি সহযাত্রীটির উদ্দেশে। ফ্যাশন সংস্থাটির দুই তরুণী উদ্যোক্তার এক জন জিনাত জাহান নিশা ফেসবুক পোস্টে জানিয়েছেন, ‘এই টি-শার্ট পরলেই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাগুলো বন্ধ হয়ে যাবে না। আমাদের সোচ্চার আওয়াজই পারে এই সব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাগুলো নির্মূল করতে।’

বাসে যৌন হয়রানির ঘটনা ঢাকা ও বাংলাদেশের অন্য শহরে নৈমিত্তিক। একটি সমীক্ষা জানিয়েছে, নিত্যযাত্রী মেয়েদের ৯৮ শতাংশই পুরুষ সহযাত্রীর খারাপ স্পর্শের শিকার। এমনকী স্কুলের ছোট ছোট মেয়েরাও হয়রানির হাত থেকে রেহাই পায় না। সংবাদ মাধ্যমকে জিনাত জানিয়েছেন, বছর খানেক আগে বাসে যৌন হয়রানির শিকার হওয়ার পরে তিনি প্রতিবাদে সরব হয়েছিলেন। কিন্তু অন্য সহযাত্রীরা তাঁর পাশে এসে দাঁড়ানোর বদলে উল্টে তাঁকেই মুখ বন্ধ করার পরামর্শ দেন। সে রাতে তিনি ক্ষোভে কাঁদতে কাঁদতে নতুন একটি খোঁপার কাঁটার ডিজাইন করেছিলেন, যাতে লেখা ছিল ‘গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না!’ পরে সেই প্রতিবাদী কাঁটা ছড়িয়ে পড়েছিল মেয়েদের খোঁপায় খোঁপায়। এর পরে এখন এই টি-শার্ট।

খোঁপার কাঁটা দেখে হিজাব পরা অনেক মেয়ে সংস্থার কাছে আসেন ‘হিজাব পিন’-এ ওই কথা লিখে দেওয়ার জন্য। জিনাত জানান— প্রমাণ হচ্ছে হিজাব-বোরখা পরা মেয়েরাও গণপরিবহণে নিরাপদ নয়। আর এই খবরটা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য তাঁরা ‘গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না’ লেখা হিজাব পিন বিনামূল্যে বিলোনোর কথা ভেবেছেন। কারণ হয়রানির প্রতিষেধক হিসাবে অনেকেই মেয়েদের হিজাব-বোরখায় চেহারা লুকিয়ে রাস্তায় বেরনোর পরামর্শ দেন। তাতেও যে যৌন হয়রানি থেকে রেহাই মেলে না, এটা সকলে জানুক। জিনাত বলেন, ‘‘ভিড়ের মধ্যে পুরুষ সহযাত্রীর স্পর্শ এড়ানো সম্ভব নয়। সব স্পর্শেই খারাপ উদ্দেশ্য থাকে, তা নয়। অনেক পুরুষই বেশ সহানুভূতিশীল হন। কিন্তু খারাপ মানুষ আবার ভিড়ের সুযোগ নিয়ে খরাপ আচরণ করতে মুখিয়ে থাকে। খোপার কাঁটা বা টি-শার্টের বার্তা তাদের জন্যই।’’

জিনাতের ফেসবুক পোস্টে মন্তব্যের ঢল নেমেছে। কারও কারও দাবি, টি-শার্টের এই বার্তা কুরুচিকর। ভিড়ের মধ্যে গা ঘেঁষে না-দাঁড়িয়ে উপায়ই বা কী! এক নারী অধিকার কর্মী আবার বলছেন, বাজার অর্থনীতিতে তো কত কিছুই বিক্রি হয়! এটাও তেমন গিমিক। তবে এই বার্তা যদি কারও মগজে একটু ধাক্কা দেয়, ক্ষতি কি? 

আবার অনেকের মন্তব্যেই যুক্তির বদলে উঠে এসেছে পুরুষতন্ত্রের নীচতা— নারী মাত্রেই যে ভোগ্যা। অনেকে হয়রানির জন্য নারীকে দায়ী করতেও লজ্জা পাননি।

তবে লুকিয়ে রাখা অস্বাচ্ছন্দ্য ও হয়রানির কাহিনি হঠাৎই আবার খুঁড়ে তুলে এনেছে ‘গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না’ টি-শার্ট।