রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থাগুলির গত অর্থবর্ষের (২০২৫-২৬) আর্থিক ফলে যুদ্ধের প্রভাব কার্যত শূন্য বলেই জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞেরা। তার পরেই ১০ দিনে চার বার পেট্রল-ডিজ়েলের দাম বাড়ানো নিয়ে তোপের মুখে পড়েছে তারা। তবে সংশ্লিষ্ট মহলের একাংশের দাবি, যুদ্ধের জেরে অশান্ত পশ্চিম এশিয়ার প্রভাব পড়বে চলতি অর্থবর্ষে। এই বছরের প্রথম ত্রৈমাসিকে অর্থাৎ এপ্রিল-মে-জুন এবং পরবর্তী জুলাই-অগস্ট-সেপ্টেম্বরের হিসাবের খাতাতেও দেখা যেতে পারে তার ছায়া।
তথ্যে দেখা গিয়েছে, ইন্ডিয়ান অয়েল, ভারত পেট্রলিয়াম এবং হিন্দুস্তান পেট্রলিয়াম— এই তিনটি রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থার মিলিত মুনাফার অঙ্ক ছুঁয়েছে ৭৭,৮২১ কোটি টাকা। যা সম্পূর্ণ স্বাভাবিক বলেই মনে করছে বিশেষজ্ঞ মহল। এই তিন সংস্থার মোট ব্যবসার অঙ্ক দাঁড়িয়েছে ২০-২১ লক্ষ কোটি টাকা। সাধারণ ভাবে এই ব্যবসার ৩-৪ শতাংশই মুনাফা হয়ে থাকে, যেটা হয়েছে। ফলে ফেব্রুয়ারির শেষ থেকে শুরু হওয়া ইরানের সঙ্গে আমেরিকা-ইজ়রায়েলের সংঘর্ষ এবং তার জেরে বিশ্ব বাজারে চড়তে থাকা অশোধিত তেলের চড়া দামের জের অন্তত গত অর্থবর্ষের মুনাফায় তেমন কোনও প্রভাব ফেলেনি। গত মার্চ থেকেই আন্তর্জাতিক দাম বাড়তে থাকায় ওই মাসে সংস্থাগুলির আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে দুশ্চিন্তা দানা বেঁধেছিল। কারণ তাদের তেল কিনতে হচ্ছিল বেশি দামে। কিন্তু তেল সংস্থা সূত্রেরই দাবি, মার্চে শোধন হওয়া তেল কমপক্ষে মাস দুয়েক আগে কেনা। ফলে তার আন্তর্জাতিক দামে তেমন হেলদোল হয়নি।
সংশ্লিষ্ট মহলের একাংশের দাবি, যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্ব বাজারে বেশ কিছু দিন অশোধিত তেলের দাম ব্যারেল পিছু ৭০-৭২ ডলারে ঘুরে বেরিয়েছে। গত অর্থবর্ষের আর্থিক ফল দেখার পরে মনে করা হচ্ছে, চাইলে তেল সংস্থাগুলি আমদানি খরচ কমার সেই সুবিধা ভারতের মানুষের হাতে তুলে দিতে পারত, কিন্তু দেয়নি। তখন দেশের বাজারে পেট্রল-ডিজ়েলে কিছুটা কমলে প্রয়োজনে তার বৃদ্ধি এতটা উদ্বেগ বাড়াত না।
তিন তেল সংস্থার পরিসংখ্যানেই দাবি, গত অর্থবর্ষে তাদের মুনাফা তার আগের অর্থবর্ষের তুলনায় ১৩০% বেড়েছে। সে বার অর্থাৎ ২০২৪-২৫ সালে তাদের মিলিত লাভ ছুঁয়েছিল ৩৩,৬০২ কোটি টাকা। আর এলপিজি বা রান্নার গ্যাসে ক্ষতি হয়েছিল ৪০,০০০ কোটি টাকার বেশি। তবে তারও আগের বছর অর্থাৎ ২০২৩-২৪ সালে এই মুনাফা ছিল প্রায় ৮১,০০০ কোটি টাকা।
তিন তেল সংস্থার দৈনিক ক্ষতি গত মাসে ১২০০ কোটি টাকা ছুঁয়েছিল। তবে গত ১২-১৩ দিনে চার দফায় পেট্রপণ্যের দাম ৭-৮ টাকা বাড়িয়ে দেওয়ার পরে সেই ক্ষতি কমে দাঁড়িয়েছে ৫৫০ কোটি টাকার আশপাশে। তবে পরিস্থিতি কতদিন এ ভাবে চলবে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে সব মহলেই। বিশ্ব বাজারে চড়া দাম কিংবা তেল সংস্থাগুলির ক্ষতির পরিমাণ চলতি অর্থবর্ষে বাড়তে থাকলেও দেশের বাজারে যাতে জ্বালানির কোনও কমতি না ঘটে তার জন্য কড়া নজর রাখছে রাষ্ট্রায়ত্ততেল সংস্থাগুলি।
ইতিমধ্যেই পেট্রলিয়াম মন্ত্রকের পক্ষ থেকে সব রাজ্যকে একাধিক নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তেল সংস্থাগুলির কাছ থেকে মেলা তথ্যের ভিত্তিতে সাধারণ পেট্রল পাম্প থেকে বেশি পরিমাণ ডিজেল (বাল্ক) বিক্রি বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি রাজ্যকে বিশেষ দল গড়ে নজর রাখার আর্জিও করা হয়েছে। ইন্ডিয়ান অয়েলের কর্তা তথা পশ্চিমবঙ্গের কো-অর্ডিনেটর জিতেন্দ্র কুমার জানান, গোটা রাজ্যে পেট্রল-ডিজেল কিংবা এলপিজি সব কিছুর যোগান ঠিক আছে। কেন্দ্রের তরফ থেকে চাহিদা এ যোগানের উপর নজর রাখা হচ্ছে। অযথা আতঙ্কিত হয়ে জ্বালানি কেনার বা গ্যাস বুকিং-এর কোনও কারণ নেই।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)