নেপালে ৮০০ কোটি টাকার সম্পত্তির ‘গপ্পো’ ফেঁদেই অপহরণকারীদের ‘টার্গেট’ হন নিউ আলিপুরের ভ্রমণ সংস্থার মালিক অরিন্দম ধর। তদন্তে নেমেই এমনটাই জানতে পেরেছে কলকাতা পুলিশ

বুধবার বিকেলে গ্রেফতার হওয়া পাঁচ অপহরণকারীদের মধ্যে ছিল অরিন্দমের মামার বন্ধু তপন সাহাও। অপহরণের সময়েই তপনকে চিনতে পারেন অরিন্দম। পরে বুধবার দুপুরে নিউ আলিপুরে অপহরণকারীদের কবল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর পুলিশকে সে কথা জানানও তিনি। বিকেলেই গ্রেফতার করা হয় তপন এবং নিউ আলিপুর এলাকার কুখ্যাত তোলাবাজ রাজা দত্ত-সহ আরও দুই দুষ্কৃতীকে। আগেই সাহাপুর কলোনির স্থানীয়দের হাতে পাকড়াও হয়েছিল সঞ্জয় রায় নামে অন্য এক দুষ্কৃতীকে।

কলকাতা পুলিশের গুন্ডা দমন শাখার গোয়েন্দারা রাজাকে জেরা করে জানতে পারেন যে, তাকে ভাড়া করেছিল তপন। সেই সূত্র ধরে তপনকে জেরা করতেই বেরিয়ে আসে অপহরণের নেপথ্যে থাকা মূল গল্প। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, নেপালের কাঠমান্ডুতে অরিন্দমের একটি ক্যাসিনো আছে। সেই ক্যাসিনোতে কাজ করত তপন। সেখানেই সে অরিন্দমের কাছে শুনেছিল যে, সে দেশে বিভিন্ন ব্যবসায় তাঁর প্রায় ৮০০ কোটি টাকা লগ্নি করা আছে। পুলিশের কাছে তপন জেরায় জানিয়েছে, কয়েক মাস আগে অরিন্দম নিউ আলিপুরে ভ্রমণ সংস্থার অফিস খোলেন। তিনি ওই ব্যবসায় মোটা টাকা ঢালেন। অন্য দিকে, গত এক বছরে অরিন্দম দু’টি দামি গাড়িও কেনেন। সব মিলিয়ে তপনের ধারণা হয় যে, অরিন্দম নেপালে লগ্নি করা ৮০০ কোটি টাকা তুলে এনেছেন এবং সেই টাকাই এ দেশে বিভিন্ন ব্যাবসায় লগ্নি করছেন। ওই ধারণা থেকেই তপন বেশ কয়েক বার টাকা চেয়ে অরিন্দমকে হুমকিও দেয়। কিন্তু অরিন্দম টাকা দেননি।

অরিন্দম ধরের ভ্রমণ সংস্থার অফিস।—নিজস্ব চিত্র।

তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, এর পরই টাকা আদায় করতে অপহরণের ছক কষে তপন। ভাড়া করে নিউ আলিপুর এলাকার কুখ্যাত তোলাবাজ রাজা দত্তকে। যদিও রাজাকে সে মূল গল্প বলেনি। শুধু জানিয়েছিল যে, অরিন্দমের কাছে ২০০ কোটি টাকা তার পাওনা রয়েছে। সেই টাকা উদ্ধার করে দিলে ৪০ শতাংশ পাবে রাজা এবং তার দলবল। মোটা টাকার লোভে অপহরণে রাজি হয়ে যায় রাজা। তপন তাকে অরিন্দমের গতিবিধি সম্পর্কে খুঁটিনাটি তথ্য সরবরাহ করে। সূত্রের খবর, তপনের পরামর্শেই গাড়িতে পুলিশ স্টিকার সেঁটে নিজেদের কলকাতা পুলিশের সন্ত্রাস দমন শাখা (এটিএস)-র আধিকারিক পরিচয় দিয়ে সেনার জংলা পোশাক পরে অপহরণ করতে যায় দুষ্কৃতীরা। যাতে পথচলতি লোকজন সন্দেহ না করে।

আরও পড়ুন: ২০০ কোটির মুক্তিপণ দাবি! অপহরণের মুখ থেকে ফেরা ব্যবসায়ীর কথাতেও অসঙ্গতি

জেরায় ধৃতরা জানিয়েছে, অরিন্দমের কাছে ২০০ কোটি টাকা চাওয়া মাত্রই তিনি বলেন, তাঁর কাছে মাত্র ২০ লাখ টাকা নগদ রয়েছে। তবে সেই টাকা রাখা রয়েছে তাঁর নিউ আলিপুরের অফিসের ভল্টে। অপহরণকারীরা তখন অরিন্দমকে বলে, টাকা কোনও কর্মীকে দিয়ে আনাতে। কিন্তু অরিন্দম জানান, তিনি নিজে না গেলে ভল্ট খোলা যাবে না। কারণ ভল্ট খুলতে অরিন্দমের আঙুলের ছাপ লাগবে। অরিন্দম অপহরণকারীদের জানান, তাঁর নিউ আলিপুরের অফিসে এক জন কর্মচারী ছাড়া কেউ নেই।

আরও পড়ুন: এ বার ইঞ্জিনিয়ারিং ছাত্রের আত্মহত্যার চেষ্টা, বাঁ হাতে ক্ষত, উদ্ধার করল পুলিশ

সেই কথায় বিশ্বাস করে অপহরণকারীরা অরিন্দমকে নিয়ে সাহাপুর কলোনিতে এসে পৌঁছয়। কিন্তু গাড়ি থেকে নেমেই চেঁচামেচি জুড়ে দেন অরিন্দম। অপহরণকারীদের চমকে দিয়ে অরিন্দমের অফিস থেকে বেরিয়ে আসে সাত-আটজন কর্মী। অত লোকজন দেখেই ঘাবড়ে যায় অপহরণকারীরা। ধরা পড়া এড়াতে তারা এক রাউন্ড গুলিও চালায়। কিন্তু তাতেও শেষ রক্ষা হয় না। অপহরণকারীদের এক জন ধরা পড়ে যায়। নিজেকে অপহরণকারীদের কাছ থেকে মুক্ত করে নেয় অরিন্দম। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ধৃত পাঁচ জন ছাড়াও আরও কয়েক জন ছিল ওই দলে। তাদের নাম পাওয়া গিয়েছে। তাদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। ডিসি সাউথ মীরাজ খালিদ জানিয়েছেন, ধৃতদের এ দিন আদালতে হাজির করানো হলে আগামী ৪ জুলাই অবধি পুলিশ হেফাজতের নির্দেশ দিয়েছেন বিচারক। তদন্তকারীরা এটাও খতিয়ে দেখছেন, কোথা থেকে অপহরণকারীরা হাতকড়া পেল। এক তদন্তকারী বলেন, ‘‘নিজের সম্পত্তি পরিমাণ সম্পর্কে মিথ্যা কথা বলেই বিপদ ডেকে এনেছেন অরিন্দম। এটা যে অরিন্দমের দীর্ঘ দিনের বদভ্যাস, তা তপন জানত না।”