ভোটে জিততে হাতিয়ার সোশ্যাল মিডিয়ার ‘টুল’
সেক্টর ফাইভে কর্মরত এক তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থার দায়িত্বপ্রাপ্ত সাইবার বিশেষজ্ঞ রণজয় দত্ত বলছিলেন, ‘‘গত দু’মাসে পুলওয়ামা থেকে বালাকোট, বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙা থেকে পাহাড়ের গুহায় মোদীর ধ্যান— সবেতেই আমরা মন্তব্য করেছি।
Social Media

কে, কোন বিষয়টিতে ‘লাইক’ দিয়েছেন। কোন প্রসঙ্গে মন্তব্য করেছেন। কোন বক্তব্যকেই বা ‘শেয়ার’ করেছেন! চলতি লোকসভা নির্বাচনে এ সবেরই চুলচেরা বিশ্লেষণ হয়েছে গত দেড় মাস ধরে। তার ভিত্তিতেই সোশ্যাল সাইট ব্যবহারকারীদের বিভিন্ন ‘গোত্রে’ ফেলে রণনীতি ঠিক করেছে রাজনৈতিক দলগুলি! ভোটের ফলের পর্যালোচনা করতে বসে এ কথাই জানাচ্ছেন সাইবার বিশেষজ্ঞদের বড় অংশ। তাঁদের অনেকেরই বক্তব্য, ‘‘সংগঠনের থেকেও এ বারের ভোটে অনেকেরই বড় ভরসা ছিল সোশ্যাল সাইটের ‘ডেটা অ্যানালিসিস টুল’। যাঁরা যত নিপুণ ভাবে এই কাজ করেছেন, তাঁরা তত ভাল ফল পেয়েছেন। যাঁরা পারেননি, তাঁরা ভুগেছেন।’’ 

সেক্টর ফাইভে কর্মরত এক তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থার দায়িত্বপ্রাপ্ত সাইবার বিশেষজ্ঞ রণজয় দত্ত বলছিলেন, ‘‘গত দু’মাসে পুলওয়ামা থেকে বালাকোট, বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙা থেকে পাহাড়ের গুহায় মোদীর ধ্যান— সবেতেই আমরা মন্তব্য করেছি। কখনও কখনও অন্যের মন্তব্যকে নানা ভাবে সমর্থনও জানিয়েছি। ‘ডেটা অ্যানালিসিস টুল’-এর সাহায্যে ওই মন্তব্যগুলিকেই পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করা হয়েছে।’’ তিনি জানান, প্রতিটি রাজনৈতিক দলের এখন নিজস্ব আইটি শাখা রয়েছে। সর্বভারতীয় দলগুলির কেন্দ্রীয় ভাবে তৈরি সেই শাখাগুলির পাশাপাশি কাজ করেছে রাজ্য ভিত্তিক আইটি শাখাও। প্রথমেই রাজ্যের জেলাগুলিকে বিভিন্ন জ়োনে ভাগ করে নেওয়া হয়েছে। এর পরে শুরু হয়েছে ‘ডেটা অ্যানালিসিস টুল’-এর ব্যবহার।

জ়োনের বাসিন্দা পিছু এতে আলাদা আলাদা ‘প্রোফাইল’ তৈরি হয়। ‘প্রোফাইলটি’র সোশ্যাল সাইটের ব্যবহার দেখে রাজনৈতিক দলটি বোঝার চেষ্টা করে যে, ওই ব্যক্তি তাঁদের সমর্থক না বিরোধী। সমর্থক হলে সমস্যা নেই। কিন্তু বিরোধী হলেই শুরু হয় তাঁর দুর্বলতা খোঁজা। অর্থাৎ, ওই ব্যক্তি কোন বিষয়ে চিন্তিত, তা বোঝার চেষ্টা হয়। একেই সাইবার বিশেষজ্ঞেরা বলছেন, ‘প্যানিক সেক্টর’! 

‘ইন্ডিয়ান স্কুল অব অ্যান্টি হ্যাকিং‌’-এর অধিকর্তা সন্দীপ সেনগুপ্ত এ বিষয়ে বলেন, ‘‘যে কোনও দল একাধিক কর্মসূচি নিয়ে ভোট লড়তে নামে। ধরা যাক, কোনও এক রাজনৈতিক দলের কর্মসূচিগুলির মধ্যে অন্যতম হল, অনুপ্রবেশ বন্ধ করা। এমনটা হতেই পারে, কোনও এক ব্যক্তি ওই রাজনৈতিক দলকে একদম পছন্দ করেন না। ওই দলের নেতাকে নিয়ে সোশ্যাল সাইটে সর্বক্ষণ রসিকতা করেন। কিন্তু অনুপ্রবেশ প্রশ্নে তিনি চিন্তিত। অনুপ্রবেশ আটকানো সংক্রান্ত পোস্টে সোশ্যাল সাইটে ‘লাইক’ও দিয়ে রেখেছেন তিনি। ডেটা অ্যানালিসিস টুলে অনুপ্রবেশ ‘মেটা কিওয়ার্ড’ লিখে সার্চ করলেই দেখিয়ে দেবে ওই ব্যক্তির ‘প্রোফাইল’। এর পরে ‘লাইক’-এর সূত্র ধরেই শুরু হবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে প্রভাবিত করার প্রক্রিয়া।’’ সোশ্যাল সাইটে অনুপ্রবেশ আটকানো সংক্রান্ত পোস্ট আগের চেয়ে আরও বেশি করে দেখতে পাবেন ওই ব্যবহারকারী। এই ধরনের ঝুলে থাকা ‘প্রোফাইল’ই চিনিয়ে দেয় ‘ডেটা অ্যানালিসিস টুল’। এমনকি, সোশ্যাল সাইটের ব্যক্তিগত ‘মেসেজ’ও এই পদ্ধতিতে সুরক্ষিত নয় বলে অভিযোগ সাইবার বিশেষজ্ঞদের একাংশের। বিধাননগর সাইবার থানার প্রাক্তনী নিরুপম হাঁসদা বলেন, ‘‘সোজা হিসেব, তাঁর চিন্তার জায়গাগুলি খুঁজে বার করা হয়। এ সব আটকাতে দ্রুত গোপনীয়তা বিল পাশ হওয়া দরকার।’’

সন্দীপবাবু জানাচ্ছেন, বুটশুট, ওপেন টেক্সট, হটসুইট ইনসাইটসের মতো এমন বহু ‘সেন্টিমেন্ট অ্যানালিসিস টুল’ রয়েছে বাজারে। বহু সংস্থা নতুন পণ্য বাজারে আনার আগে এখন এই ধরনের ‘টুল’ ব্যবহার করে। তা দিয়েই ক্রেতাদের মন বুঝে নেয় সংস্থাগুলি। ভোটের বাজারে এই ‘টুল’-এর মাধ্যমে মানুষের মতামত বুঝতে খরচ পড়ে মাত্র কয়েক লক্ষ টাকা। সন্দীপবাবুর কথায়, ‘‘ভোটে জিততে মরিয়া রাজনৈতিক দলগুলির কাছে এই খরচ তো নস্যি!’’

২০১৯ লোকসভা নির্বাচনের ফল

আপনার মত