Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

২৩ অক্টোবর ২০২১ ই-পেপার

পুস্তক পরিচয় ১

নদীর চলনের মতো মহাকাব্যিক

জয়া মিত্র
২১ মে ২০১৭ ০০:০০
নদীকেন্দ্রিক: কলসযাত্রা, মহানদী। নদী আর নদীতীরের মানুষের জীবনযাত্রা মিলেমিশে যায় এমন উৎসবে।

নদীকেন্দ্রিক: কলসযাত্রা, মহানদী। নদী আর নদীতীরের মানুষের জীবনযাত্রা মিলেমিশে যায় এমন উৎসবে।

মহানদী

লেখক: অনিতা অগ্নিহোত্রী

মূল্য: ৩০০.০০

Advertisement

প্রকাশক: দে’জ পাবলিশিং

একটি নদীর চলার নিজস্ব এক গতি থাকে। সেই গতিটি তার দুই পাশের তীরভূমি ও গমনপথের মধ্যে বিধৃত। তীরভূমির সমাজ-ইতিহাসে যেমন নদীর একটি ভূমিকা থাকে, তেমনই নদী কখনও কখনও সে বাস্তবতার নিয়ামকও হয়। নদীকে যদি চরিত্র বা পাত্র ধরি তা হলে স্থানের সঙ্গে তার কালও থাকে। সেই কালের সঙ্গে পরিবর্তিত হয় আপাতস্থির স্থান বা পাত্র। আধুনিক ভারতে সে স্থিতি মুহূর্মুহূ পরিবর্তনশীল, কিছু বা অস্থিরই। যেমন মহানদী। এই নদীর নামাঙ্কিত উপন্যাসটিতে সেই চলার কাহিনিই মূল বিষয়।

বাংলার সমকালীন কথাকারদের মধ্যে অনিতা অগ্নিহোত্রীর একটি স্বতন্ত্র জায়গা আছে। প্রথমাবধি তাঁর ছোটবড় গল্পে, উপন্যাসে দেখা যায় ভারতবর্ষের নিজস্ব মুখ। ভাঙাচোরা, ক্লান্ত, ‘মহান ভারত’-এর বাইরে, ভিড়ে মিলেমিশে থাকা অথচ নিজের মধ্যে নিজেই স্বস্থ মানুষ আর তার সামান্য জীবন রূপ পায় অনিতার অক্ষর ধরে ধরে। সে জীবন অনেক দেখেছেন তিনি। যত্নে দেখেছেন, যত্নে লিখেছেন। আর, সেই যত্নের সবটুকু যেন উজাড় করে দিয়েছেন তাঁর বিশাল উপন্যাস মহানদী-তে।

নদী বাংলার এতটাই গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা যে বাংলা সাহিত্যে নদীকে নিয়ে উপন্যাস লিখেছেন প্রধান সাহিত্যিকদের অনেকেই। তবু অনিতার উপন্যাসটি স্বাতন্ত্র্যের দাবি রাখে। সাধারণত নদীনামিক উপন্যাসে আমরা নদীতীরবর্তী মানুষদের জীবনকাহিনিই দেখেছি— কখনও ভাসা ভাসা, কখনও অনুপুঙ্খ। কিন্তু এখানে নদীটিই প্রধান চরিত্র। নদীই প্রধান বিষয়।



সাড়ে তিনশো পৃষ্ঠার এই উপন্যাসের চলন ঠিক নদীর মতই— সিহাওয়া পাহাড়ের কোল থেকে বেরিয়ে ছত্তীসগঢ়, ওড়িশার অনেকখানি মাটিকে সিঞ্চিত করে প্রায় হাজার কিমি দীর্ঘ মহানদী বঙ্গোপসাগরে গিয়ে মেশে। কিংবা বাঁধের শিকলে বাঁধা সে জল হয়ত আর স্বচ্ছন্দ নয় সাগরমিলন পর্যন্ত, তবু সে পার হয়ে আসে নানা ভূমি, নানা জনপদ, অনেক জীবনচিত্র। যাত্রাপথের ভিন্নতায় নদীর ভিন্ন ভিন্ন চলা, তার দুই তীরের স্থাবরত্বের চেয়ে ধারাটির জঙ্গমতাই উপন্যাসের মূল প্রতিপাদ্য। লেখক নিজেই বলেন ‘মহানদীর জলপ্রবাহ এপথ বেয়ে রোজ যায়। রোজই, প্রতি মুহূর্তে মালভূমি থেকে অরণ্য পর্বত পেরিয়ে গিরিখাত, গিরিখাত থেকে সমতলে আসে... অজস্র গ্রাম শহর জনপদ গঞ্জবাজারে...’ তাই অসংখ্য এর দুই পাশের জনপদসমূহের বিবরণ, অগণন চরিত্র এবং ভিন্ন ভিন্ন কাল। কিন্তু তারা সর্বদাই ভিন্ন। যদি কাল স্থান বা পাত্রের কোনও পারম্পর্য না থাকে তা হলে একে উপন্যাস বলছি কেন? উপাখ্যান সংগ্রহ নয় কেন? বিশেষত জায়গায় জায়গায় যখন বলা হয়ে যাচ্ছে প্রায় নিছক বিবরণের মতো? ‘গঙ্গদের উত্থান ও সোমবংশীয়দের ক্রমশ অবনমনের ফাঁকে একসময় বৌদ্ধ কন্ধমালের ইতিহাস ঝাপসা হয়ে আসে। একাদশ শতাব্দীতে অবশ্য রাজা আনন্দ ভঞ্জ এক নতুন রাজবংশের পত্তন করেন... এরপর মারাঠা শক্তির অভ্যুদয়। নাগপুর থেকে মহানদী কূলে বরমূল পাস দিয়ে অটক যাবার রাস্তা ছিল মারাঠাদের...’ (পৃ ১৩১)— এরকম অনেক। কোথাও মনে হয় এই নির্মোহ নিস্পৃহতাই বুঝি উপন্যাসের নিজস্ব চলন। কোনও গল্প বলার দায় নেই তার, এই কথন চায় কেবল লেখকের নিজস্ব ভাবনা, অনুভূতি, বিষয় সম্পর্কে তাঁর নিজের উপলব্ধির কথা বলতে। তার জন্য যে কোনও প্রকরণই তিনি নিতে পারেন। যদিও সমকালীন কথাসাহিত্যে এমন কথন বিরল, তবু লেখক যখন সেই মুনশিয়ানা আয়ত্ত করেন, তখন তাঁর মনন ও দৃষ্টির প্রকাশ-সাক্ষী থাকতে পারা পাঠকের এক আনন্দময় অভিজ্ঞতা। তাই কোনও ঘটনা বা কাহিনির ধারাবাহিকতা বজায় রাখার দায় নেননি লেখক, তিনি কেবল ধরেছেন নদীটির অভ্রান্ত স্থিতি ও নিত্য বহমানতাকে। সেই বহমানতা দেখা দিয়েছে ধমতাই মালভূমির জঙ্গল, গোঁড়দের বাস্তব ও মিথে মাখামাখি জীবনধারণে, যেখান থেকে নদীর শুরু, পার হচ্ছে হিরাকুদ বাঁধের উচ্ছিন্ন মানুষজনের ধ্বংস হওয়া জীবন, নিয়মগিরি, মাওবাদী— গ্রামীণ বৃত্তান্তের পাশাপাশি চলে রাজিম, কুলেশ্বর শিব, জাগতি গ্রাম, স্কন্দপুরাণের কাহিনিতে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলে চলা বিষ্ণু ও যমের উপাখ্যান, ইতিহাস। উপকূল অঞ্চলের মোহনা-সন্নিহিত ঘূর্ণিবাত্যা বিধ্বস্ত পারাদিপ, জগৎসিংহপুর, কেন্দ্রাপাড়ার কারখানা। অপচিত, যন্ত্রণাক্ত, অথচ সব হারের পর আবার ধ্বংসস্তূপ থেকে নিজের নিয়মে মাথা তোলা জীবন। প্রতিটি আখ্যানই জেগে উঠছে আর ভেসে যাচ্ছে ‘দিনে দিনে যেভাবে এসেছিল, সেভাবেই...জলই নিয়ে যাচ্ছে তাকে, আপন মনে’ (পৃ ৮৬)।

এই জলের চলাই বিধৃত উপন্যাসের সমগ্র শরীর জুড়ে। বারোটি খণ্ডে বিভক্ত আখ্যানের অধ্যায়গুলির নাম বিন্যাসেও তা স্পষ্ট। জঙ্গলখণ্ডের নাম ‘মহুল সই’। অধ্যায়ের নাম সরাসরি ‘সুবর্ণপুর’ ‘উপনদী’। সাতকোশিয়া গর্জের অধ্যায় ‘নির্জন, গভীর’। ‘মোহানা’ ‘বাতিঘর’। আর তারই মধ্যে মাখামাখি হয়ে আছে নদীর দুই তীরের পুরাণ, স্থাননামে গাঁথা ইতিহাস, জটিল রাজনীতি ও এনজিও-মণ্ডিত সমাজের হাতপা বাঁধা অবস্থা। প্রেম, যৌনতা, শ্রমশোষণ। প্রাচীন ও নবীন নানা উপাখ্যানের অদ্ভুত সমাহার।

অত্যন্ত সাবালক ও জোরালো এই উপন্যাসে অসংখ্য চরিত্র আছে, আছে তাদের জীবনখণ্ডের সুখ দুঃখ ওঠাপড়া মোচড় খাওয়া, কিন্তু তারা অনেকে মিলে ধরে আছে এক নিরবচ্ছিন্ন ধারাকে, নদীর জলকে যেমন নিয়ত বহে নেয় তরঙ্গমালা। সেই ঊর্মি পরিচয় গাঁথা আছে কখনও সংক্ষিপ্ত, কখনও ঈষৎ এলায়িত রেখায়।

বিশাল নদীর চলনের মতোই এ উপন্যাসের চলন। মহাকাব্যিক। এবং সেই মহাকাব্যকে শরীর দিয়েছে অসামান্য ভাষা। পাঠক খেয়াল না করে পারেন না, খেয়াল করে আশ্চর্য না হয়ে পারেন না, বাংলা শব্দ দিয়ে এখনও এমন লাবণ্য সৃষ্টি করা যায়! নিবন্ধের ভাষা অবলীলায় মিশে যাচ্ছে অতি কোমল উপাখ্যানের মায়াভাষার সঙ্গে- ‘পুলিশের গুলি নিয়েছিল অর্জুন রাউতের প্রাণ। আশাবরী, শনিচরীর মৃত্তিকাই তো ঝঞ্ঝা। ওকে নিতে এলে প্রাণ দেবে দুই নারী। প্রমাণ করবে রক্তের টান বলে সত্যি কিছু হয় না।’ ‘দীপজ্বালা ঘরে ঘুমোয় মা-মাসি-মেয়ে...ফাইলিন বাত্যা চলে গেছে, আরেকটি ঝড় আসার আগে অরণ্য এখন শান্ত ও নিশ্চিন্ত।... বাউরী ঠাকুরানী গভীর রাত্রে হেঁটে বেড়ান অরণ্য সন্নিহিত গ্রামের পথে। তাঁর কাঁখে জলের কলস, সঙ্গে পোষা শিশু বাঘ।’ (পৃ ২০২) বিরল আত্মবিশ্বাসে লেখক মহানদীকে চিত্রিত করছেন পাতার পর পাতা ঘটনাবিহীন, পাত্রপাত্রীহীন বিবরণে।

ধারাবাহিকতাহীন ধারাস্বভাবের এই লেখন সমকালীন বাংলা উপন্যাসের মানচিত্রে নিঃসন্দেহে একটি গভীর ও মনোময় সংযোজন যা কেবল দীর্ঘ হয়ে ওঠা কাহিনির ক্লান্ত নিগড়বদ্ধ পট থেকে পাঠককে এক মহাকাব্যিক বিস্তারের মুক্তি দেবে, যা বহু বার পঠনের সঙ্গী হয়ে থাকে। যা নিজের নিত্যদিনের ধুলোভরা জীবনের বাইরে পৃথিবীর অন্য এক রহস্যমুখের দিকে পাঠককে টান দেয়। অনিশ্চিতির কথা বলে।



Tags:

আরও পড়ুন

Advertisement