অভাবকে গ্রাহ্য করেনি ওরা। আধাপেটা খেয়েই চালিয়ে গিয়েছে পড়াশোনা। কারণ পড়াশোনা করে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর ইচ্ছাই ওদের শক্তি। তাই তো এ বার উচ্চমাধ্যমিক দিয়ে ভাল ভাবে পাশ করেছে দু’জনেই।

দ্বারিকানাথ বালিকা উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রী মালতী খাঁ। প্রাপ্ত নম্বর ৩৫১। ক্যানিংয়ের পূর্ব মালীরধার এলাকায় ইটের দেওয়াল, অ্যাসবেস্টরের ছাউনি দেওয়া বাড়ি। বাবা বিপ্লব খাঁ বছর পাঁচেক আগে মারা গিয়েছেন। মা অলোকা পরিচারিকার কাজ করেন। বোনের পড়াশোনার জন্য দাদা রবিন অষ্টম শ্রেণিতেই পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছেন। বাড়িতে ব্যাগ তৈরির কাজ করেন। সেই কাজে হাত লাগায় মালতীও। মালতি বলে, ‘‘ভাল করে পড়াশোনার জন্য সময় দিতে পারতাম না। দাদার কাজে সাহায্য করতাম। তা ছাড়া একটি টিউশনের খরচ জোগাড় করতে রেডিমেড ব্যাগ তৈরির কাজও করতাম। সেলাই-কাটিং করে যেমন কাজ হতো তা দিয়ে নিজের পড়ার খরচ চালানোর চেষ্টা করতাম।’’ সংস্কৃত নিয়ে পড়তে চায় মালতী। কিন্তু তার খরচ আসবে কোথা থেকে নিজেও জানে না মেয়েটি।

তার মা জানান, তিনিও চান মেয়ে পড়াশোনা করে বড় হোক। কিন্তু সংসার চালানোরই টাকা থাকে না। কী ভাবে মেয়ের পড়াশোনার খরচ চালাবেন তা নিয়ে চিন্তায় তিনি।

 

এন্তাজুল আলি মোল্লা

ক্যানিং ডেভিড সেশুন হাইস্কুল থেকে কলা বিভাগে ৪৩৬ নম্বর পেয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে পাশ করেছে এন্তাজুল আলি মোল্লা। ক্যানিংয়ের উত্তর অঙ্গদবেড়িয়ার ইয়াকুব মোল্লা ও ফতেমা মোল্লার ৬ ছেলে। এন্তাজ চতুর্থ। বাধা ছিল প্রতিপদে। তার মধ্যেই দাঁতে দাঁত চেপে সে লড়াই চালিয়ে গিয়েছে সব সময়। আর্থিক অবস্থা নুন আনতে পান্তা ফুরায়। বাবা এলাকা থেকে ধানের তুঁষ কিনে বাজারে বিক্রি করেন। তাতে যা আয় হয় তা দিয়ে চলে অভাবের সংসার। তবে ইয়াকুবের ৬ ছেলের মধ্যে ৪ ছেলের আলাদা সংসার। বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকে এন্তাজুল ও তার আর এক ভাই। পড়াশোনার পাশাপাশি এন্তাজুল সংসারের হাল ধরতে  ধানের তুষ কিনে বাজারে বিক্রি করে সে। শুধু তাই নয় দর্জির কাজ করে এবং ছাত্র পড়িয়ে নিজের পড়ার খরচ চালায়। নিজের কোনও গৃহশিক্ষক ছিল না। সারাদিন এই সব কাজ করে রাত জেগে পড়াশোনা করত সে। তাদের আর্থিক অবস্থা এতটাই খারাপ যে কলেজে ভর্তি হওয়া বা বই কেনার সামর্থ্য নেই। এন্তাজুল চায় শিক্ষকতা করতে। কিন্তু তার সেই স্বপ্ন পূরণ হবে কিনা তা নিয়ে চিন্তিত তার পরিবার।

এন্তাজুল বলে, ‘‘বাবার আর্থিক অবস্থা ভাল নয়। অভাবের সংসারে বাবাকে সাহায্য করতে বাড়ি বাড়ি থেকে তুষ সংগ্রহ করে বাজারে বিক্রি করতাম। এখন বুঝতে পারছি না, এতদিন যে ভাবে পড়ার খরচ চালিয়েছি আগামী দিনে তা পারব কিনা।’’ ভূগোল নিয়ে পড়াশোনা করতে গেলে কলেজে সময় দিতে হবে। এ দিকে কলেজে ভর্তি হওয়ার মতো টাকা নেই তার কাছে। কোথা থেকে কী হবে সে জানে না। 

ইয়াকুব মোল্লা বলেন, ‘‘আমরা চাই ছেলে শিক্ষিত হোক। ছেলেকে পড়ানোর মত আর্থিক সামর্থ্য নেই। নিজের প্রচেষ্টাতেই ওর এই সাফল্য। কোনও সহৃদয় মানুষ এগিয়ে এলে তবেই ও পড়তে পারবে। জানি না ওর সেই স্বপ্নপূরণ হবে কিনা।’’