কার্তিক পুজোর ধুমে বরাবরই নজর কাড়ে কাটোয়া। আর সেই পুজোর ধুমের সঙ্গেই জড়িয়ে সাবেক লোক-ইতিহাস ও থিমের ছড়াছড়ি।

কাটোয়ায় পুজোর শুরু নিয়ে দু’টি জনশ্রুতি প্রচলিত। কথিত রয়েছে, বাণিজ্য-সমৃদ্ধ জনপদ কাটোয়ায় বারবণিতাদের হাতেই চুনুরিপাড়া (বর্তমান নাম হরিসভাপাড়া) পুজোর শুরু হয়। আবার উল্টো দিকে তারকেশ্বর চট্টরাজের মতো লোক-গবেষকরা মনে করেন, শাক্তদের হাতে পুজোর শুরু। তবে বর্তমানে পুজোর রীতিতে বৈষ্ণব ও শাক্ত, উভয় মতেরই মেলবন্ধন দেখা যায়। নবান্নের মরশুমে পুজো হওয়ায় একে ‘নবান্নের কার্তিক’ও বলা হয়। লোকশ্রুতি, ১৯৩০ সাল থেকে পুজোর ধুম বাড়ে। তখন থেকেই সূত্রপাত ‘কার্তিক লড়াই’য়েরও। এই লড়াইয়ের পিছনে অবশ্য প্রতিমা কাঁধে নিয়ে যাওয়ার সময়ে দু’দলের সংঘর্ষের ইতিহাস রয়েছে বলে মত গবেষকদের একাংশের।

পানুহাটের ইয়ং স্টাফ ক্লাবের মণ্ডপ। নিজস্ব চিত্র।

সাবেক এই পুজোর পাশাপাশি কাটোয়ার বিভিন্ন পুজোয় এ বার বিচিত্র থিমের ছোঁয়া। তবে শিল্পীর অভাবে এ বার কার্তিকের ‘থাকা’য় খানিক ভাঁটা পড়েছে। তবে দর্শক টানতে কাছারিপাড়ার ঝঙ্কার ক্লাব ‘ময়ূরাকৃতি থাকা’ তৈরি করেছে। রয়েছে তারকাসুর বধের কাহিনিও। শিল্পীর অভাবে শাঁখারিপট্টির পুজোয় এ বার থাকা তৈরি হয়নি। তবে এখানে প্রতিমায় রয়েছে অভিনবত্ব। মানুষকে পরিবেশ সচেতন করতে কুঠারের আঘাতে গাছের কান্নার দৃশ্য কলেজপাড়া নবকল্যাণ সঙ্ঘের পুজোয়। থাকছে তিন দিনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

দর্শকদের হঠাৎ লোকশিল্পের স্বাদ দিতে জনকল্যাণ কমিটির বাজি, পুরুলিয়ার ছৌ। বাংলার ঐতিহ্যের ছোঁয়া রয়েছে মাধবীতলার নবাগত ক্লাবে। এখানে দেখা যাবে চড়ক মেলা। অন্যদের টেক্কা দিতে আলোকসজ্জা আর কাল্পনিক মন্দিরের থিমের উপরেই ভরসা রাখছে সার্কাস ময়দানের ইউনিক ক্লাব।

দর্শকদের মহাভারতের কথা মনে করাতে পানুহাটের ইয়ং স্টাফ ক্লাব ‘কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ’ বাধিয়ে দিতে চেয়েছে মণ্ডপে। পেতলের থালা, খড় দিয়ে তৈরি মণ্ডপে শরশয্যায় শায়িত রয়েছেন পিতামহ ভীষ্ম। যুদ্ধক্ষেত্র দেখে দর্শকেরা একেবারে ঘরের কথায় মা-ছেলের সম্পর্কের নিখুঁত বর্ণনা খুঁজে পাবেন ইয়ং বয়েজ ক্লাবের পুজো মণ্ডপে। উদ্যোক্তারা জানান, শিল্পী যামিনী রায়ের ছবি থেকেই তৈরি হয়েছে মণ্ডপ ভাবনা। নিউ আপনজন ক্লাবের মণ্ডপ সেজেছে হরিতকি আর বয়রা দিয়ে। থাকছে আঁকা প্রতিযোগিতা-সহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান। এই এলাকারই সংহতি ক্লাবের মণ্ডপটি আবার গুজরাটের আম্বাজি মন্দিরের আদলে তৈরি হয়েছে।

লোক ইতিহাস ছেড়ে বৈষ্ণব দর্শনের কথাও উঠে এসেছে পুজোর থিমে। কলেজপাড়ার ভণ্ডুলবাগানের সমাজকল্যাণ সমিতির প্রতিমায় রয়েছে কৃষ্ণ বিরহে কাতর মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যের কথা। এই এলাকারই দেশবন্ধু বয়েজ ক্লাবের প্রতিমাটি আবার তৈরি হয়েছে অর্জুন, বাবলা-সহ বিভিন্ন কাঠের কাঠের গুঁড়ো দিয়ে। মাটির বাঁড়ে মণ্ডপ সাজিয়ে পুজো মাত করতে চেয়েছে স্টেশন বাজারের জয়শ্রী সঙ্ঘ।