বিস্ফোরণের ন’দিন পর পিংলা কাণ্ডে ধৃত রঞ্জন মাইতির বাড়িতে তল্লাশি করল সিআইডি। শনিবার দুপুরে সিআইডি-র একটি দল ব্রাহ্মণবাড়ে পৌঁছয়। ছিলেন মামলার তদন্তকারী অফিসার (আইও) নীরেন ভট্টাচার্য। বম্ব স্কোয়াডকে সঙ্গে নিয়ে রঞ্জনের বাড়িতে ঢোকে দলটি। তবে সন্দেহজনক কিছুই মেলেনি।

সিআইডি সূত্রে খবর, বাড়ির মধ্যে কয়েকটি আলমারি রয়েছে। আলমারিগুলোয় তালা লাগানো রয়েছে। এ দিন সেই তালা খোলা হয়নি। রঞ্জন আগামী ২২ মে পর্যন্ত সিআইডি হেফাজতে থাকবে। এই সময়ের মধ্যে ধৃতকে নিয়ে এসে একবার তল্লাশি চালানো হবে। তখন আলমারির তালা ভাঙা হতে পারে। স্থানীয়দের একাংশের অবশ্য দাবি, আগে পুলিশ রঞ্জনের বাড়িতে তল্লাশি চালিয়েছে। তখনই সন্দেহজনক সমস্ত কিছু সরিয়ে ফেলা হয়েছে। পুলিশ এই দাবি উড়িয়ে দিয়েছে।

এ দিকে, জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা এনআইএ-র একটি দল বিস্ফোরণস্থল পরিদর্শনে আসবে বলে শনিবার সকাল থেকেই খবর ছড়ায় ব্রাহ্মণবাড়ে। তবে শেষমেশ তারা আসেনি। যদিও জানা গিয়েছে, কলকাতার ভবানী ভবন থেকে এনআইয়ের প্রতিনিধিরা পিংলা বিস্ফোরণ সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করেছেন। ৬ মে ওই বিস্ফোরণে ১২ জনের মৃত্যুর পরে পিংলা-কাণ্ডে এনআইএ তদন্তের দাবিতে সরব হয়েছে বিরোধীরা। তাদের দাবি, পিংলার ক্ষেত্রে সত্যিটা চাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে। বোমা কারখানাকে বাজি কারখানা বলে চালানো হচ্ছে। খাগড়াগড়ের সময়ও পুলিশ এ ভাবে লুকোছাপা করে। পরে এনআইএ তদন্তে সব সামনে আসে। নিরপেক্ষ তদন্ত হলে পিংলার ক্ষেত্রেও সব সামনে আসবে। সকাল থেকে ব্রাক্ষ্মণবাড়ে ছিলেন ডেবরার সিআই সুপ্রিয় বসু, পিংলার ওসি অমিত অধিকারী। দুপুরে ঘটনাস্থলে পৌঁছন খড়্গপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অভিষেক গুপ্ত, খড়্গপুরের এসডিপিও সন্তোষকুমার মণ্ডল। অবশ্য এনআইএ- র কোনও দল এ দিন এলাকা পরিদর্শনে আসেনি। এ দিন থেকেই বিস্ফোরণস্থল সাফসুতরো করার কাজ শুরু করে পুলিশ। সাফসুতরো করার কাজে সিভিক পুলিশদের লাগানো হয়। আনা হয় দু’টি জেসিবি মেশিন (মাটি কাটার যন্ত্র), তিনটি পিক- আপ ভ্যান। গত ৬ মে রাতে ভয়াবহ বিস্ফোরণ হয় ব্রাক্ষ্মণবাড়ে। মৃত্যু হয় ১২ জনের। জখম হয় ৪ জন। বিস্ফোরণের ক্ষতচিহ্ণ এখনও রয়েছে এলাকায়। চারিদিকে ছড়িয়ে- ছিটিয়ে কাপড়ের টুকরো। ঝলসে যাওয়া জিনিসপত্র। কিছু কাপড়ের টুকরো ৩০- ৪০ ফুট গাছের ডালে ঝুলছে। পড়ে রয়েছে বারুদ। এদিন সিভিক পুলিশের কর্মীরা বাঁশ উঁচিয়ে কয়েকটি কাপড়ের টুকরো গাছের ডাল থেকে নামান।

কেন বিস্ফোরণস্থল সাফসুতরো করার এত তত্‌পরতা? এর ফলে কি প্রমাণ লোপাট হবে না? পুলিশের দাবি, তদন্তকারী সংস্থা সিআইডি- র অনুমতি নিয়েই বিস্ফোরণস্থল সাফসুতরো করার কাজ শুরু হয়েছে। প্রমাণ লোপাটের প্রশ্নই ওঠে না। ইতিমধ্যে সিআইডি ঘটনাস্থলে এসেছে। প্রয়োজনীয় নমুনা সংগ্রহ করেছে। ‘সেন্ট্রাল ফরেন্সিক সায়েন্স ল্যাবরেটরি’র একটি দলও বিস্ফোরণস্থলে তল্লাশি চালিয়েছে। প্রয়োজনীয় নমুনা সংগ্রহ করেছে। গত বৃহস্পতিবার দুপুরে ভস্মীভূত বাজি কারখানা চত্বরে ফের বোমা ফাটার শব্দ পাওয়া যায়। ধিকিধিকি আগুন জ্বলতেও দেখা যায়। বিস্ফোরণস্থলেই ফের কেন বিস্ফোরণ, এই প্রশ্নে তেতে ওঠে রাজ্য-রাজনীতি। পুলিশের অবশ্য বক্তব্য, ঘেরা এলাকায় তুবড়ি বা পটকার মধ্যে বারুদ হয়তো থেকে গিয়েছিল। প্রচণ্ড গরমে সেটাই ফেটে গিয়েছে। এমন ঘটনা এড়াতেই বিস্ফোরণস্থল দাহ্যবস্তুমুক্ত করার কাজ শুরু হয়েছে বলে পুলিশের এক সূত্রে খবর। শুক্রবার রাতভর পুরো এলাকায় জল ছড়ানো হয়। শনিবার সকাল থেকে ‘অ্যান্টি সাবোতাজ চেকিং টিম’ পরপর তিন বার বিস্ফোরণস্থল ও তার আশপাশে তল্লাশি চালায়। এরপরই বিস্ফোরণস্থল সাফসুতরো করার কাজ শুরু হয়। খাগড়াগড়ের বিস্ফোরণের পর পরীক্ষা করার মতো নমুনা না রেখে হাতে পাওয়া সব আইইডি (ইমপ্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস) নষ্ট করে দেওয়ায় জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা (এনআইএ) নানা প্রশ্ন তুলেছিল। পিংলাতেও এনআইএ তদন্ত চেয়ে হাইকোর্টে মামলা হয়েছে।

এ ক্ষেত্রে পরবর্তীকালে একই প্রশ্ন উঠবে না তো? পুলিশের দাবি, এমন প্রশ্ন উঠতেই পারে না। এ দিন দুপুর আড়াইটে নাগাদ ব্রাহ্মণবাড়ে পৌঁছয় সিআইডি- র দলটি। বিস্ফোরণস্থলের পাশেই রঞ্জনের দো’তলা বাড়ি। অ্যাসবেসটসের ছাউনি দেওয়া। বম্ব স্কোয়াডকে সঙ্গে নিয়ে রঞ্জনের বাড়িতে ঢোকে তদন্তকারী দলটি। বাড়ির সমস্ত জিনিসপত্রই এলোমেলো হয়ে পড়ে রয়েছে। পিছনের দিকের রান্নাঘরটিতে পাঁচটি মাটির উনুন। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে রয়েছে বাসনপত্র। একতলার ঘরে তল্লাশি চালনোর পর তদন্তকারী দলের সদস্যরা দোতলাতেও যান। সাড়ে তিনটে নাগাদ রঞ্জনের বাড়ি থেকে বেরোয় সিআইডি-র দলটি। পরে ভস্মীভূত বাজি কারখানা চত্বরে যায়। সেখানে তখন সিভিক পুলিশের কর্মীরা সাফসুতরো করার কাজ করেছেন। জেসিবি মেশিন, পিক- আপ ভ্যান বিস্ফোরণস্থলে আসায় স্থানীয় উত্‌সাহী মানুষেরা ভিড় করেছিলেন। স্থানীয়দের অবশ্য ঘেরা জায়গার ধারেকাছে ভিড়তে দেওয়া হয়নি। স্থানীয়দের একাংশের দাবি, রঞ্জনের বাড়িতে বোমা তৈরির মশলা, স্টোনচিপস্ এ সব থাকবে না, এটা বিশ্বাস করা কঠিন। স্থানীয় ফেলু হেমব্রম, গোপাল প্রধানরা বলছিলেন, “এর আগে বেশ কয়েকবার রঞ্জনের বাড়িতে পুলিশকে ঢুকতে দেখা গিয়েছে। শুক্রবার রাতেও কয়েকজন পুলিশ কর্মী এই বাড়িতে ঢুকেছিলেন। সিআইডি যদি আগেই রঞ্জনের বাড়িতে তল্লাশি চালাত, তাহলে সন্দেহজনক কিছু পাওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও থাকতে পারত! এখন আর সেই সম্ভাবনা নেই বললেই চলে!”