কেউ ভোটার কার্ড বারে বারে দেখছেন। কেউ যত্নের সঙ্গে ভোটার কার্ড, আধার কার্ড থেকে শুরু রেশন কার্ড ঠিকঠাক রয়েছে কি না দেখে নিচ্ছেন আরেকবার। তার পরেও ইতিউতি জটলা। কেউ বলছেন, “কেন নাসিমার নাম উঠল না? তাহলে কি আমাদেরও বিপদ হতে পারে।”

অসমের নাগরিকপঞ্জি প্রকাশ হওয়ার পরে আবার একবার এক আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়েছে সাবেক ছিটমহলের একাধিক বাসিন্দার মনে। বিশেষ করে সাবেক ছিটমহলের বাসিন্দা নাসিমা খাতুনের নাম ওই নাগরিকপঞ্জিতে না থাকায় আশঙ্কা আরও বেড়েছে। নাসিমার নাম ছিল ছিটমহল বিনিময়ের সমীক্ষার তালিকায়। তার পরে ভারত সরকার তাঁকে ভোটার কার্ড, রেশন কার্ড থেকে আধার কার্ড সব দিয়েছে। তার পরেও অসমের নাগরিকপঞ্জিতে তাঁর নাম নেই। তিনি এখন ‘দেশহীন’।

সাবেক ছিটমহলের মশালডাঙার বাসিন্দা নাসিমার বাবা নৌসের আলি। তাঁর ভাই সাদ্দাম হোসেন অবশ্য কিছুটা ভরসা রেখে এখনও বলেন, “সরকার আমাদের নাগরিকত্ব দিয়েছে। দেশ দিয়েছে। তা তো আর নতুন করে কেড়ে নিতে পারবে না। আমাদের আশা খুব দ্রুত সাবেক ছিটমহলের যে মেয়েরা বিবাহসূত্রে অসমে রয়েছে প্রত্যেকেরই নাম নাগরিকপঞ্জিতে তোলা হবে।” সাবেক ছিটমহল আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত বিজেপি নেতা দীপ্তিমান সেনগুপ্তও আশ্বাস দিচ্ছেন, “ছিটমহল বিনিময় করেছে বিজেপি সরকার। সেখানকার মানুষের যাতে কোনও অসুবিধে না হয় সেটাও দেখছে বিজেপি সরকার। তাই কোনও সমস্যা হবে না।”

সাবেক ছিটমহলের অনেক বাসিন্দাই অবশ্য সে ভরসা রাখতে পাচ্ছেন না। সাবেক ছিটমহল পোয়াতুর কুঠির প্রবীণ বাসিন্দা মনসুর আলি থেকে যুবক সাদ্দাম মিয়াঁ, সবাই আশঙ্কার মধ্যে রয়েছেন। মনসুর বলেন, “এক দীর্ঘ সময় আমাদের কার্যত কোনও দেশ ছিল না। প্রত্যেকটি মুহূর্ত কষ্টের মধ্যে দিয়ে কেটেছে। এখন আবার এনআরসি নিয়ে আমাদের অসমে বিবাহিত মেয়েরা অসুবিধেয় পড়ছে। কার উপরে ভরসা রাখব।” সাদ্দাম বলেন, “বাংলায় এনআরসি হলে আমাদের হাজার হাজার মানুষের কী হবে? কারও ১৯৭১ সালের আগের কোনও কাগজ নেই। কোথায় যাব?”

সাবেক ছিটমহল বিনিময়ের পরে চার বছর কেটে গিয়েছে। ভারতীয় ভূখণ্ড দিয়ে ঘেরা বাংলাদেশের ৫১টি সাবেক ছিটমহল এখন ভারতের অংশ। এ ছাড়াও বাংলাদেশ ভূখণ্ড দিয়ে ঘেরা ভারতীয় সাবেক ছিটমহল থেকে প্রচুর বাসিন্দা এপারে চলে এসেছেন। বর্তমানে তাঁরা দিনহাটা-মেখলিগঞ্জ এবং হলদিবাড়িতে তিনটি সেটেলমেন্ট ক্যাম্পে রয়েছেন। সব মিলিয়ে সাবেক ছিটমহলের বাসিন্দারা সংখ্যা এখন প্রায় পনেরো হাজার। তাঁদের প্রত্যেকের নাম ভারত-বাংলাদেশ যৌথ সমীক্ষায় ছিল। এ ছাড়া ছিটমহল বিনিময় হওয়ার পরেই প্রত্যেকের ভোটার কার্ড, রেশন কার্ড, আধার কার্ড হয়েছে। জমির কাগজপত্র মিলতে শুরু করেছে। তার আগের যে দু-একটি নথি কারও হাতে, সেগুলি বাংলাদেশের।

বাসিন্দাদের কয়েকজনের কথায়, “ছিটমহল বিনিময়ের পর আমাদের কাগজপত্র হয়েছে। সেই নথি গুরুত্ব পাচ্ছে না বহু জায়গায়। এর আগে দিল্লিতে সাবেক ছিটমহলের বাসিন্দাদের অনুপ্রবেশকারী হিসেবে গ্রেফতার করা হয়েছে। এবারে অসমে এই এলাকার মেয়েদের নাম নাগরিকপঞ্জিতে নেই। তাহলে বাংলায় এনআরসি হলে কী হবে?”