সরকার হয়তো বাঁচল। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজার ও ঘরোয়া সঙ্কটে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক (আরবিআই) আগের মতো পরিত্রাতার ভূমিকা নিতে পারবে কি না, সেই সংশয়টা আরও জোরালো হয়ে উঠল।

দীর্ঘ টানাপড়েনের পর আরবিআই তার বাড়তি ভাঁড়ারের (সারপ্লাস) ভাগ কেন্দ্রকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সোমবার। আগেই যার সুপারিশ করেছিল বিমল জালান কমিটি। ঠিক হয়েছে, বাড়তি ভাঁড়ার থেকে ১.৭৬ লক্ষ কোটি টাকা রাজকোষে দেবে দেশের শীর্ষ ব্যাঙ্ক। আরবিআইয়ের ঘর থেকে এত বড় তহবিল এর আগে কখনও ঢোকেনি রাজকোষে।

কেন এ কথা বলছি, তা বোঝানোর জন্য আগে বলে নেওয়া দরকার, বিভিন্ন আর্থিক নীতি, নোট ছাপানো আর ব্যাঙ্ক পরিচালন ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করা ছাড়াও আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে আরবিআই। বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন প্রয়োজনে।

ঘর, বাইরের সমস্যায় রিজার্ভ ব্যাঙ্কই তো পরিত্রাতা

সেই প্রয়োজন যেমন হয় আন্তর্জাতিক মুদ্রাবাজারের কোনও সমস্যায়, তেমনই আরবিআই-কে সামলাতে হয় বিভিন্ন রকমের ঘরোয়া সঙ্কটও। আর সেই সব সঙ্কট, সমস্যাগুলি সামলানোর জন্যই একটি তহবিল রক্ষা করে চলতে হয় আরবিআই-কে। আমরা যেমন, ব্যাঙ্ক ছাড়াও ঘরে বিভিন্ন ভাবে টাকা জমিয়ে রাখি বিপদ, আপদে কাজে লাগতে পারে বলে।

সেই সব সঙ্কট, সমস্যা নানা রকমের হতে পারে। মূলত তিনটির কথা বলি।

আন্তর্জাতিক মুদ্রাবাজারের সঙ্কট

মার্কিন ডলারের তুলনায় ভারতীয় মুদ্রা (টাকা)-র দাম হঠাৎ অনেকটা চড়ে গেলে, রফতানি মহার্ঘ হয়ে পড়ে। সেটা হলে তখন টাকা বেচে ডলার কিনতে হয় সরকারকে। আর সে জন্যই আরবিআই টাকাটা খরচ করে তার ওই বাড়তি তহবিল থেকে।

সেই বাড়তি তহবিলেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ (এ ক্ষেত্রে ১.৭৬ লক্ষ কোটি টাকা) যদি এ বার আরবিআই কেন্দ্রকে দিয়ে দেয়, তা হলে বিদেশি মুদ্রাবাজারের সঙ্কটে রিজার্ভ ব্যাঙ্ককে আগের মতোই পরিত্রাতার ভূমিকায় দেখতে পাওয়া সম্ভব হবে কি না, সেই সঙ্গত প্রশ্নটা তো ওঠেই।

ব্যাঙ্কগুলির ঘরোয়া সঙ্কট

এই ঘরোয়া সঙ্কট মোটামুটি দু’ভাবে তৈরি হতে পারে। হয়, ব্যাঙ্কের হাতে নগদ (ক্যাশ) নেই, আর ধার দিতে পারছে না। না হলে, অনাদায়ী ঋণের (নন-পারফর্মিং অ্যাসেট বা ‘এনপিএ’) বোঝা কাঁধে এতটাই ভারী হয়ে চেপে বসেছে যে, ব্যাঙ্কগুলি আর ঋণ দিতে পারছে না। দু’টি ক্ষেত্রেই ভয়ঙ্কর সঙ্কটে পড়ে ব্যাঙ্কগুলি। মানুষের হাতেও টাকা পৌঁছয় না বলে তখন দেশের অর্থনীতির এগিয়ে চলার রথের চাকাও থমকে যায়।

আরও পড়ুন- কেন্দ্রকে পৌনে দু’লক্ষ কোটি টাকা দিচ্ছে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক, ফল ভাল হবে না, বলছেন রাজন​

আরও পড়ুন- ‘চুরি করে বিপর্যয় সামলানো যাবে না’, রিজার্ভ ব্যাঙ্কের ভাঁড়ারে ভাগ বসানোয় কেন্দ্রকে তোপ রাহুলের​

সেই চাকাটাকে আবার গড়িয়ে নিয়ে যেতে তখন সক্রিয় হতে হয় রিজার্ভ ব্যাঙ্ককেই। তা সে ব্যাঙ্কের নগদ সমস্যা মেটাতেই হোক, বা অনাদায়ী ঋণে ক্লিষ্ট ব্যাঙ্কের ভাঁড়ার ভরাতে সেই সময় এগিয়ে আসতে হয় আরবিআই-কেই। ওই সময় নিজের বাড়তি তহবিল থেকেই একটি অংশ নিয়ে ওই সব সমস্যা মেটায় আরবিআই। তাতে ব্যাঙ্কগুলির নগদ সমস্যা মেটে। অনাদায়ী ঋণে ক্লিষ্ট ব্যাঙ্কগুলি আবার ধার দেওয়ার জন্য পায়ের তলায় জমি পায়।

সমস্যা হলেই নোট ছাপানো তো কাজের কথা নয়!

আমার মনে হয়, রিজার্ভ ব্যাঙ্ক নিজের বাড়তি তহবিলের একটি বড় অংশ সরকারকে দেওয়ার ফলে, ওই দু’টি কাজই ব্যাহত হবে। কারণ, যখনই প্রয়োজন, তখনই তো আর নোট ছাপিয়ে নিয়ে সমস্যা সামলাতে পারবে না আরবিআই। তা করতে গেলে তো দেশে মুদ্রাস্ফীতি দেখা দেবে। যাতে আর্থিক বৃদ্ধির গতি শ্লথ থেকে শ্লথতর হয়ে পড়বে। সেটা মনে হয়, রাজনীতিকদেরও কাম্য হবে না।

আরবিআই-ও কি নেবে শুধুই স্বল্পমেয়াদি নীতি?

আরও একটি দিক রয়েছে। সেটা হল রিজার্ভ ব্যাঙ্কের মতো দেশের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার স্বশাসন (অটোনমি)।

এই স্বশাসন খুবই প্রয়োজন বলে আমি মনে করি। না হলে, সরকার যেমন ভাবে চালাতে চাইবে, আরবিআই-কে ঠিক সেই ভাবেই চলতে হবে। আরবিআই স্বতন্ত্র দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক নীতি নিয়ে ভাবনাচিন্তা ও সেগুলি প্রণয়ন করতে পারবে না। চাইলেও, পারবে না।

কারণ, যে দলই ক্ষমতায় আসুক, পরের বার ভোট পেয়ে ক্ষমতায় ফিরে আসার জন্য তারা সব সময়েই চাইবে বেশ কয়েকটি চটকদার জনমোহিনী আর্থিক নীতি ঘোষণা করতে। সেগুলিকে চটজলদি বাস্তবায়িত করে ভোটে তার সুফল কুড়োতে। আর সেটা পাঁচ বছরের মধ্যেই করতে চাইবে। কারণ, পরের পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকার সুযোগ যে তাঁরা পাবেনই, সেই আত্মবিশ্বাস তো রাজনীতিকদেরই থাকে না।

যদিও আমাদের মতো বিপুল জনসংখ্যার দেশে চটকদার জনমোহিনী প্রকল্প মানেই, বড় অঙ্কের টাকার বোঝা কাঁধে নেওয়া। যে বোঝা টানার দায়টা রাজনীতিকদের নিতে হয় না। সেই টাকা কোথা থেকে আসবে, তা নিয়ে পাঁচ বছরের পর চিন্তাভাবনা করারও কোনও সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা থাকে না, ফের ক্ষমতায় ফিরতে না পারলে।

কিন্তু রিজার্ভ ব্যাঙ্ককে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক নীতি নিয়ে ভাবতে হয়। তাদের স্বল্পমেয়াদি নীতি নিয়ে ভাবলে চলে না। বরং কোনও সরকারের স্বল্পমেয়াদি আর্থিক নীতির ফলে আগামী দিনে কী কী দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে, তার ভাল বা মন্দ দিকগুলি নিয়ে আরবিআই-কে ভাবতে হয়। সেটাই প্রত্যাশিত।

স্বশাসন না থাকলে, আরবিআই সেই ক্ষমতা হারাবে। তখন রিজার্ভ ব্যাঙ্কও কোনও সরকার বা রাজনীতিকদের মতো শুধুই স্বপ্লমেয়াদি আর্থিক নীতি বা প্রকল্প নিয়েই ভাবতে শুরু করবে। যা দেশের অর্থনীতির এগিয়ে যাওয়ার পক্ষে শুধুই উদ্বেগজনক নয়, বিপজ্জনকও।

এই টাকা হাতে আসায় সরকার খরচ করতে পারবে

ভাল দিক বলতে একটিই। খরচ করার মতো টাকা নেই সরকারের হাতে। আরবিআইয়ের এই সিদ্ধান্তের ফলে সরকার এ বার খরচ করার জন্য হাতে টাকা পাবে। খরচ করতে পারবে। বিভিন্ন প্রকল্পে। গত কেন্দ্রীয় বাজেটের একটি পরিসংখ্যানে দেখছিলাম, দেশের মোট যত খরচ, তার ২০ শতাংশেরও বেশি যায় নানা ধরনের ঘরোয়া ও বিদেশি ঋণের সুদ মেটাতে গিয়ে। আরবিআইয়ের এই টাকাটা হাতে এলে সরকারকে আরও বিদেশি ঋণ আর তার বাড়তি সুদের বোঝা কাঁধে নিতে হবে না।

সেখানেই বড় ‘কিন্তু’ রয়েছে!

কিন্তু...। হ্যাঁ, এখানেও একটি বড় কিন্তু রয়েছে। হাতে টাকা না থাকলে তো আর মানুষ জিনিস কিনতে আগ্রহী হবেন না। বুঝলাম, টাকা না থাকলে কম সুদে ধার দেওয়ার জন্য ব্যাঙ্ক রয়েছে। নানা ধরনের আর্থিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তাই দেশে এক সময় গাড়ি, বাড়ি, ফ্ল্যাট কেনার ধূম পড়ে গিয়েছিল।

সেই সব এখন অতীত। এখন চাকরিটা থাকে কি না, সেটাই সবচেয়ে বড় চিন্তার বিষয়। চাকরিই যদি না থাকল, তা হলে মানুষ পেট ভরাবেন কী ভাবে? আর আগে তো খাবার, তার পর গাড়িঘোড়া চড়া। দামি দামি জামাকাপড় পরা। ফলে, অটোমোবাইল ও বস্ত্রশিল্পের অবস্থা দিন কে দিন খারাপ হচ্ছে।

যার একটাই কারণ। আয়ের বৈষম্য। যা যত দিন যাচ্ছে, ততই বাড়ছে। এই বৈষম্য যত দিন না কমাতে পারছে সরকার, তত দিন সমস্যা যে তিমিরে ছিল, সেই তিমিরেই থাকবে বলে আমরা মনে হয়।

লেখক ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিকাল ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক

অনুলিখন: সুজয় চক্রবর্তী