চৌত্রিশ বছরের বাম আমলের অবসান ঘটিয়ে ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে ক’টি জনকল্যাণমূলক প্রকল্প বাস্তবায়িত করেছেন তার মধ্যে বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য হল ২০১৩ সালে রূপায়িত ‘কন্যাশ্রী’। এই প্রকল্পে সরকারি বিদ্যালয় বা কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রতিষ্ঠানে পাঠরতা ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সি অবিবাহিতা কিশোরীদের বার্ষিক ৭৫০ টাকা (এখন ১০০০ টাকা) এবং ১৮ বছর পূর্ণ হলে এককালীন ২৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়। প্রকল্পটির দু’টি মূল উদ্দেশ্য ছিল মেয়েদের বাল্যবিবাহ বন্ধ করা ও স্কুলছুটদের ফের স্কুলমুখী করা।

এ রাজ্যে প্রকল্পটির গুরুত্ব সন্দেহাতীত, কারণ এখানে কন্যাসন্তানদের বাল্যবিবাহের ঘটনা রীতিমতো বেশি। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গে ১৮ বছরের কম বয়সে বিবাহ হয়েছে এমন মহিলার সংখ্যা সমগ্র বিবাহিতা মহিলার সংখ্যার প্রায় ৪২ শতাংশ। সর্বভারতীয় স্তরে এই অনুপাত বেশ কিছুটা কম— ৩২ শতাংশের কাছাকাছি। পরম সংখ্যার দিকে তাকালে বিষয়টির গুরুত্ব আরও ভাল বোঝা যাবে। শুধু আমাদের রাজ্যেই ১ কোটি ১০ লক্ষের বেশি মেয়ে বাল্যবিবাহের মতো কুপ্রথার শিকার। এই বিষয়ে পশ্চিমঙ্গের স্থান ভারতে তৃতীয় (রাজস্থান ও অবিভক্ত অন্ধ্রপ্রদেশের পরেই)। অর্থাৎ, পশ্চিমবঙ্গের চেয়ে অনুন্নত বা সমুন্নত রাজ্যগুলো, যেমন বিহার, উত্তরপ্রদেশ এবং ওড়িশাও এই পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে এ রাজ্যের চেয়ে এগিয়ে।

এ বার দেখা যাক, অসময়ে স্কুলের পাঠ ত্যাগ করেছে এমন মেয়েদের পরিসংখ্যান। ২০০৫-০৬ সালের তৃতীয় জাতীয় পারিবারিক স্বাস্থ্য সমীক্ষার (এনএফএইচএস-৩) তথ্য অনুয়ায়ী বিদ্যালয়ে পাঠরতা ১১ থেকে ১৪ বছর বয়সি মেয়ের শতকরা অনুপাত ছিল ৭৪ শতাংশ, ১৫ থেকে ১৭ বছর বয়সিদের ক্ষেত্রে মাত্র ৩৩ শতাংশ। অর্থাৎ গড়ে ৪১ শতাংশ কিশোরী ১৪ বছর বয়স অতিক্রান্ত হলেই বিদ্যালয়ের পাঠে ইতি টেনেছে। এই বাস্তবের সম্মুখে কন্যাশ্রীর মতো একটি শর্তাধীন নগদ স্থানান্তর প্রকল্প খুব প্রয়োজন ছিল। কন্যাশ্রী এক দিকে কিশোরী মেয়েদের স্কুলে তালিকাভুক্ত থাকতে উৎসাহিত করে, কন্যা-শিশুর বিবাহ এবং অসময়ে বিদ্যালয় ত্যাগের (স্কুলছুট) প্রবণতাও কমায়। 

এ বার দেখা যাক প্রায় ৬ বছরে কন্যাশ্রীর প্রভাব কতটা। ২০০৫-০৬ সালের এনএফএইচএস অনুযায়ী, ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সি মেয়েদের প্রায় ৫৪ শতাংশ বাল্যবিবাহের শিকার ছিলেন, ২০১৫-১৬ সালের নতুন তথ্য অনুযায়ী যা ১২ শতাংশ কমে ৪২ শতাংশে পৌঁছেছে। শতকরা হারের এই নিম্নমুখী ধারার অন্যতম কারণ অবশ্যই কন্যাশ্রীর মতো প্রকল্প। তবে এই উন্নতির পুরোটাই যে কন্যাশ্রীর ফলে হয়েছে, এমন ধারণাও বোধ হয় অমূলক। ২০০৬-এ বাল্যবিবাহ নিষিদ্ধকরণের মতো আইন প্রণয়ন যেমন এই সাফল্যের একটা কারণ, তেমনই সমান্তরাল ভাবে চলতে থাকা দূরদর্শনে প্রচারিত সচেতনতামূলক বিজ্ঞাপনগুলোও কিছুটা কৃতিত্বের অধিকারী। তবে এ কথা মেনে নিতে আপত্তি নেই যে দেশ এবং বিশ্বের দরবারে কন্যাশ্রী তার নকশা এবং সুশাসনের বৈশিষ্ট্যের জন্য একটি মৌলিক সামাজিক জনকল্যাণমূলক প্রকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং যথেষ্ট প্রশংসিতও হয়েছে, তা সে এ দেশের নীতি আয়োগের প্রশংসাই হোক বা বিশ্বব্যাঙ্ক আয়োজিত রাষ্ট্রপুঞ্জের আলোচনাসভাতে ৬২টি দেশের মধ্যে সেরা সামাজিক কর্মকাণ্ডের স্বীকৃতিই হোক। প্রকল্পটির মৌলিকত্ব, অভিপ্রায় এবং মহত্ত্ব অনস্বীকার্য। তদুপরি, প্রতিষ্ঠিত গবেষকদের তাত্ত্বিক, প্রায়োগিক এবং আখ্যানভিত্তিক কিছু গবেষণাপত্র এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে বিপুলসংখ্যক কিশোরী এই প্রকল্পের যথাযোগ্য সুযোগ নিয়েছে এবং উপকৃত হয়েছে।

বার্ষিক শিক্ষা সমীক্ষার (এএসইআর) জানুয়ারি ২০১৯-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, গ্রাম এলাকার স্কুলে অ-নথিভুক্ত ১৫ থেকে ১৬ বছর বয়সি মেয়েদের সংখ্যা মাত্র ৫ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে, যা ২০০৬’এ ছিল ২৫ শতাংশ। তুলনায় উন্নত অন্যান্য রাজ্য যেমন পঞ্জাব, কর্নাটক এবং গুজরাতের গ্রামগুলোর চেয়ে আমাদের গ্রামবাংলা এ দিক থেকে অনেকটাই এগিয়ে। গুজরাতের গ্রামাঞ্চলে সমগ্র ১২ বছরে এই শতকরা হার ২৮ থেকে কমে হয়েছে মাত্র ২৫ শতাংশ। এই সফলতার সবটুকু না হলেও আংশিক কৃতিত্বের দাবিদার তো অবশ্যই কন্যাশ্রী।

যে কোনও কিছুরই ‘সব ভাল’ নয়। কন্যাশ্রীও তার ব্যতিক্রম নয়। একই বয়সের ছেলেদের ক্ষেত্রে যদি দেখি, ২০০৬ সালের তথ্য বলছে, স্কুলে তালিকাভুক্ত না থাকা ছেলের সংখ্যা ছিল ৩৩ শতাংশ, যা ২০১২ সাল অবধি একনাগাড়ে কমতে কমতে দাঁড়ায় ২০ শতাংশ। আশ্চর্যজনক ভাবে, ২০১২-র পরবর্তী সময়ের তথ্য বলছে, ১৫ থেকে ১৬ বছর বয়সি ছেলেদের ক্ষেত্রে এই কমার হার অপরিবর্তিত। এক কথায়, শেষ দশকে এক দিকে যেমন সমবয়স্কা কিশোরীদের স্কুলে যাওয়ার সংখ্যা বেড়েছে বলে অনায়াসে দাবি করা যায়, তেমনটা সমবয়স্ক কিশোরদের ক্ষেত্রে করা যাচ্ছে না। অনুরূপ অন্য একটি তথ্যভাণ্ডারের (ডিসট্রিকট ইনফর্মেশন সিস্টেম অব এডুকেশন যা রাজ্যের সমস্ত স্কুলের শিক্ষা সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করে) তথ্যানুসারে মাধ্যমিক স্তরে স্কুলে তালিকাভুক্ত মেয়েদের সংখ্যা ছেলেদের তুলনায় ২.২ লক্ষেরও বেশি। সুতরাং, বলাই যায়, স্কুলছুট ছেলেদের সংখ্যা আপেক্ষিক অর্থে মেয়েদের তুলনায় মোটামুটি ভাবে বেড়েছে। সাংস্কৃতিক ভাবে সমমনস্ক পাশাপাশি রাজ্যগুলো যদি দেখি, যেমন বিহার, অসম, ওড়িশা এবং ত্রিপুরা— সেই সব রাজ্যে কোথাওই স্কুলের তালিকাভুক্তিতে এই ধরনের ক্রমবর্ধমান লিঙ্গবৈষম্যের নজির দেখতে পাচ্ছি না। 

প্রশ্ন আসতেই পারে, ছেলেদের স্কুলছুটের তালিকা দীর্ঘ হলে অসুবিধে কোথায়? কেউ এমন বলতেই পারেন— মেয়েরা তো শিক্ষা পাচ্ছেই। তা হলে এ বার অসুবিধের জায়গাগুলো একটু ভাল করে দেখা যাক। এই যে ছেলেরা অসময়ে স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিচ্ছে, তার মানে তাদের ভবিষ্যতে অদক্ষ শ্রমিক হয়ে থেকে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। এতে দেশে যেমন অদক্ষ শ্রমিকের সংখ্যা বাড়বে তেমনই এই বিরাট পরিমাণ অদক্ষ শ্রমিকদের পর্যাপ্ত মজুরির/বেতনের চাকরি দেওয়াটা চরম সমস্যা হয়ে দাঁড়াতে পারে। অন্য দিকে, যথেষ্ট দক্ষ শ্রমিকের অভাব শিল্পায়নের গতিকে রুদ্ধ করে দিতে পারে। গ্রামবাংলা শিল্পায়নের ক্ষেত্রে এমনিতেই অবহেলিত, এর পর পর্যাপ্ত দক্ষ শ্রমিকের অভাব একে আরও তরান্বিত করার সম্ভাবনা। ওই একই সমীক্ষার (এএসইআর ২০১৯) তথ্য পরিসংখ্যান আরও খানিকটা খতিয়ে দেখলে দেখা যাচ্ছে, অষ্টম শ্রেণিতে পাঠরত ছাত্রছাত্রীদের ৭০ শতাংশ বা তার অধিক পাটিগণিতের সহজ ভাগ রপ্ত করতে পারেনি, ৩৮ শতাংশেরও বেশি দ্বিতীয় শ্রেণির সমতুল্য সাধারণ কোনও পাঠ্যবই থেকে পাঠ করতে অক্ষম। ভাববার বিষয় হল, এই যদি সামগ্রিক অবস্থা হয় তা হলে বর্তমানে পঠনরত শিশুকিশোর, যারা আগামী দিনে স্কুলটা হয়তো অসময়েই ছেড়ে দেবে, তাদের অন্নসংস্থান কতটা শোচনীয় হয়ে দাঁড়াবে এই কর্মহীন বৃদ্ধির বাজারে? মনে রাখা দরকার, এই অদক্ষ শ্রমিকের সংখ্যা কিন্তু জনসংখ্যায় বৃদ্ধির সঙ্গে বাড়তেই থাকবে সমান তালে। এই বৃদ্ধির হার যত বেশি হবে, গ্রামাঞ্চলে নতুন শিল্পায়নের প্রস্তাব ততই অনাকর্ষক হয়ে দাঁড়াবে শিল্পপতিদের কাছে।

এই সম্ভাব্য বিপুল অদক্ষ শ্রমিক সৃষ্টি হওয়াকে আটকাতে গেলে সর্বপ্রথমে ছেলে-মেয়ে নির্বিশেষে স্কুলছুটের সমস্যা বন্ধ হওয়াটা জরুরি। সুতরাং, ছেলেরা পুনরায় স্কুলমুখী হতে উৎসাহ বোধ করে, এ রকম পদক্ষেপ প্রয়োজন। একটা উপায় হতে পারে— উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার পরে পর্যাপ্ত বেতনের সুনিশ্চিত কর্মসংস্থানের আশ্বাস। ‘কর্মহীন-বৃদ্ধি’র এই যুগে তা হওয়া যথেষ্ট কঠিন। অতএব, কিশোরদের ক্ষেত্রেও শর্তাধীন নগদ হস্তান্তরের মতো কোনও প্রকল্পই হয়তো উপকারী হতে পারে— এই প্রকল্পের থেকে প্রাপ্য নগদ, তার তাৎক্ষণিক ছেড়ে দেওয়া আয়কে আংশিক ভাবে হলেও প্রতিস্থাপিত করবে, যা সে বিদ্যালয়ে নথিভুক্ত না থেকে অন্যথা উপার্জন করত। মেক্সিকো, কলম্বিয়া, নিকারাগুয়ার মতো অনেক বাইরের দেশই এই ধরনের প্রকল্প রূপায়িত করে যথেষ্ট সফলতা অর্জন করেছে। 

পরিশেষে, শিক্ষা সব শিশুরই একটি মৌলিক অধিকার। কিন্তু বিভিন্ন আর্থ-সামাজিক রীতিনীতির প্রভাবে, একটা নির্দিষ্ট বয়সের পরে মেয়েদের শিক্ষার ব্যাপারটা চিরকালই কম প্রাধান্য পেয়ে এসেছে। সেই সমস্যার হাল নিরূপণে কন্যাশ্রী একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। কন্যাসন্তানের প্রতি এই ইতিবাচকতা অক্ষুণ্ণ রেখেই এই সমস্যার সমাধান খোঁজা সমীচীন। 

এখন প্রশ্ন হল, তবে কি ‘শ্রী’ বৃদ্ধির প্রকল্প শুধু কন্যায় সীমাবদ্ধ না রেখে তাকে সর্বজনীন করার সময় এসে গিয়েছে? সর্বজনীনতাই কি এর একমাত্র সমাধানের পথ?

প্রশ্নগুলো সহজ, তবে উত্তর অজানা।

 

লেখকরা যথাক্রমে ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভেনিয়া, আমেরিকা ও সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ়, তিরুঅনন্তপুরমে অর্থনীতির গবেষক