“সত্যকে স্বীকার করতে ভীরুতা দ্বিধা সংশয় আমাদের জাগে। বিনা ক্লেশে যা মানতে পারি তাই মানি, কঠিনটাকে সরিয়ে রেখে দিই এক পাশে। তার সকলের চেয়ে বড় সত্যটাকে মেনে নিতে পারলুম না। এইখানেই তাঁকে মারলুম। তিনি এসেছেন, ফিরে গেলেন, শেষ পর্যন্ত তাকে নিতে পারলুম না।” বাংলা ১৩৩৯ সালের ৫ই আশ্বিন শান্তিনিকেতনে লিখছেন রবীন্দ্রনাথ। উদ্দিষ্ট মানুষটি তখন সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারার মধ্য দিয়ে দলিতদের হিন্দু সমাজ থেকে পৃথক করার সরকারি প্রয়াসের বিরুদ্ধে অনশনরত। পরবর্তী কালে এই অনশন ভঙ্গের দিনেই রবীন্দ্রনাথ যাবেন তাঁর কাছে। গাইবেন ‘জীবন যখন শুকায়ে যায়, করুণাধারায় এসো...।’ ভারতের ইতিহাসে বহু বিতর্কিত এই অনশন ও পরবর্তী পুনা চুক্তি। কিন্তু বাঙালির শ্রেষ্ঠ কবি এই যে নিতে না পারার জন্য আক্ষেপ করেছেন, গাঁধী সম্পর্কে আজও বাঙালির সেই একই মনোভাব। অবশ্য তার কারণ ভিন্ন।

গাঁধীর নাম শুনলেই বাঙালির ভ্রূকুঞ্চিত হয়, বাঙালির কাছে রাষ্ট্রীয় রাজনীতির সবচেয়ে অসহনীয় ব্যক্তি এই গাঁধী। তাই সত্তরের সেই মূর্তি ভাঙার দিনে গাঁধীর মূর্তি নিয়ে উদ্বেগ জন্মায়নি। সরকারি ভাবে পশ্চিমবঙ্গে গাঁধীর জন্মদিন কখনও-ই পালনীয় তালিকায় ওঠেনি। পাঠ্য ইতিহাসে গাঁধীকে বাদ দেওয়া যায় না বলেই রাখা, সেখানে তাঁর প্রতিটি আন্দোলনের বর্ণনার চেয়ে সমালোচনাই বেশি। মোটামুটি কলেজ পোঁছতে পোঁছতে ছেলেমেয়েরা প্রায় একমত যে— বাংলার পশ্চাৎপদতার অন্যতম কারণ এই লোকটা— মোহনদাস কর্মচন্দ গাঁধী, যার জন্য সুভাষ অন্তর্হিত, যার জন্যই দেশভাগ, যিনি বেনিয়া পুঁজিপতির দালাল এবং রীতিমতো ষড়যন্ত্র করে নেহেরুর জন্য সিংহাসন কায়েম করেছেন। সার্ধশতবর্ষের বছরেও বইমেলার টেবিলে টেবিলে তাঁকে নিয়ে কোনো সংখ্যা নেই। কার্ল মার্কসের দুশো, নভেম্বর বিপ্লবের একশ বছর নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ চর্চার দেখা মেলে। অথচ এ দেশে গাঁধীর প্রথম সফল আন্দোলনের সূচনায় যাঁর চম্পারন যাত্রা  এই কলকাতা থেকেই, জীবনের একেবারে শেষ পর্বে এই বাংলার দাঙ্গা বিধ্বস্ত নোয়াখালির গ্রামে গ্রামে যাঁর পথ হাঁটা, বাংলা বিদ্যাচর্চায় তাঁর উপস্থিতি খুঁজে পাওয়া শ্রমসাপেক্ষ।

আশি ছুঁই ছুঁই মানুষটি কাঁপাকাঁপা হাতে লিখেছেন তাঁর জীবনের সারাৎসার, আমার জীবনই আমার বাণী, বাংলা ভাষায়। তবু বাঙালির কাছে তিনি চির প্রত্যাখ্যাত। বাঙালি মনস্তত্ত্বের গভীরে আছে এর কারণ। বাঙালির ইষ্ট দেবতা হতে পারেন একমাত্র সেই একনায়ক, যিনি দুর্দম, একমেবাদ্বিতীয়ম, যাঁর পথ অবশ্যই পৌরুষদীপ্ত অর্থাৎ সহিংস এবং অগ্নিবর্ষী বাক্য ও একচ্ছত্র কর্তৃত্ব যাঁর বৈশিষ্ট্য- সেখানে চারিত্র পূজা নয়, ব্যক্তি পূজাই় প্রধান। এই ব্যক্তি অবশ্যই ভদ্রলোক, উচ্চবিত্ত সমাজের কেউকেটা হবেন। সাম্প্রতিক এক বিশেষ বিরোধী রাজনৈতিক সমাবেশে যেখানে মানুষ এসেছেন স্বতঃস্ফূর্ত প্রেরণায়, সেখানেও নেতাদের মুখে উচ্চারিত হতে থাকল প্রয়াত কোনও বাবুর নাম, যিনি কম্যুনিস্ট হয়েও শেষ পর্যন্ত কমরেড নন, ‘বাবু’। হিন্দু বাঙালির নেতৃবৃন্দ তাই উচ্চবর্ণীয় হিন্দু— কখনওই দলিত বা মুসলমান নয়। যিনি কোনও অবস্থাতেই নিজের ‘ভদ্রলোক’ চেহারা থেকে বেরিয়ে আসেন না। বাঙালি মানসের এই ‘মহানায়কের’ চূড়ান্ত রূপ হলেন নেতাজি, তিনি উচ্চশিক্ষিত, কুলীন এবং সংগ্রামী— বাঙালির হৃদয়পটে সতত সামরিক পোশাকে সজ্জিত যোদ্ধা, ঘোড়ায় চড়লে আরও ভাল! রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা দেওয়ার মতো ঘোর সহিংস প্রতিজ্ঞায় অঙ্গীকারবদ্ধ। এর পাশে গাঁধী যে কৌলিন্য থেকেই উঠে আসুন, শেষ পর্যন্ত তাঁর পোশাক দেখে শিউরে ওঠেন চার্চিল, যাঁর জীবন যাপনে এতটুকু আড়ম্বর নেই। ঘোড়া নয়, ট্রেনের থার্ডক্লাস তাঁর বাহন। সর্বোপরি তাঁর অহিংসা— কখনও মনে হয় ‘মেয়েলি’— বিপ্লবের পরিপন্থী। এখানে বলা ভাল গাঁধী বারবার ভারতীয় ক্ষত্রিয় ভাবনার যে পৌরুষ, তার বিপরীতে পুরুষের মধ্যে নারীত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন। বাঙালির কাছে গাঁধীর সবচেয়ে বড় অপরাধ তিনি নেতাজির বিরোধিতা করেছেন। ইতিহাসে বড় করে লেখা আছে সেই কংগ্রেস সম্মেলনের কথা, যেখানে পুনর্নির্বাচন প্রার্থী সুভাষ বসুর বিপক্ষে গান্ধীর সমর্থন পেয়েছেন অখ্যাত পট্টভি সীতারামাইয়া। বিপুল ভোটে সুভাষের জয় হলে, গাঁধী এটিকে নিজের পরাজয় বলে অভিহিত করেছেন।

অনশন ভঙ্গের দিন এই গানই গেয়েছিলেন কবিগুরু।

আরও পড়ুন: বাঙালি হয়ে ওঠার গোড়ার কথা​

ইতিহাসে যা লেখা নেই তা হল এই যে— সুভাষ ও গাঁধীর পারস্পরিক মৈত্রীবন্ধন। প্রথম সুভাষ চন্দ্রই সিঙ্গাপুর বেতার থেকে তাঁকে জাতির জনক বলে সম্বোধন করেন। নেতাজির মৃত্যু সংবাদ বাঙালির মতো গাঁধীও মানতে চাননি। হরিজন পত্রিকায় লিখেছেন— তাঁর স্বরাজের স্বপ্ন সার্থক হওয়ার আগে নেতাজি কখনও আমাদের ছেড়ে যেতে পারেন না। গাঁধী জানতেন, নেতাজির কাছে ব্রিটিশ শাসন থেকে দেশকে মুক্ত করাই প্রধান লক্ষ্য। এর জন্য তিনি নাজি হিটলারের সঙ্গে হাত মেলাতে পারেন। বিশ্বযুদ্ধকালীন পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ব্রিটিশকে চরম আঘাত দিতে পারেন। গাঁধী এই জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা কখনও-ই ছিলেন না। এ ব্যাপারে তিনি বরং রবীন্দ্রনাথের কাছাকাছি। শুধু শাসনের পরিবর্তন হলেই দেশের সবার উদয় হবে, এমনটা তিনি কখনওই ভাবেননি। তাই তিনি চেয়েছিলেন সেই সব সংকটের সামনে দাঁড়ানোর— যা জন্ম দেয় অশিক্ষা, অস্বাস্থ্য, কুসংস্কার, সাম্প্রদায়িকতা সর্বোপরি গ্রামসমাজের চূড়ান্ত দুর্দশার। তা ছাড়া যে কোনও কাজেই যেহেতু তিনি সত্যাগ্রহী, লক্ষ্য ও পথের বিশুদ্ধতায় তিনি জোর দিয়েছেন। ‘মারি অরি পারি যে কৌশলে’— এ ভাবনা গাঁধীর নয়। অথবা বিপ্লব হলেই সব সমস্যার আপনিই সমাধান হবে, এই সরল সমীকরণে তিনি কখনও ভরসা করেননি। গাঁধীবাদের সঙ্গে এইখানে সংঘাত যে, তিনি সংঘর্ষের পাশাপাশি নির্মাণকে সমান গুরুত্ব দিয়েছেন। ধৈর্য ও সময় নিয়ে কোনও এক স্থানে থিতু হয়ে সামাজিক কাজ করা তাঁর কাছে রাজনৈতিক আন্দোলনের চেয়ে কোনও অংশে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে চম্পারন হয়ে সেবা গ্রাম, গাঁধী যেখানেই আন্দোলন করেছেন পাশাপাশি গড়েছেন স্কুল ও আশ্রম, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের জন্য প্রতিটি কর্মীকে কাজ করতে বলেছেন, মেয়েদের যুক্ত করেছেন প্রতিটি ক্ষেত্রে।

পাশাপাশি নিজস্ব পরিবর্তনের উপর গাঁধীর যে ঝোঁক, যা নিয়ে তিনি কথা বলেন অনেকটা ধর্মগ্রন্থের মতোই— গোটা সমাজের কাছে দাবি করেন এক সমবেত নৈতিকতা, যা অনেকের কাছেই একধরনের বিশুদ্ধতাবাদী কাল্পনিকতা বলে মনে হতে পারে। এ ছাড়া গাঁধীর মূল ভাবনায় বিকেন্দ্রীকরণের যে প্রয়াস সেটিও প্রোলেতারিয়েতের কর্তৃত্বে সম্ভব নয়। মৃত্যুর দিন সকালে পরিমার্জিত করা তাঁর ‘ইচ্ছা পত্রে’ তিনি বলেছেন, ব্রিটিশ শাসনের অবসানে কংগ্রেসের দলীয় অবস্থানের আর প্রয়োজন নেই। দল ভেঙ্গে কর্মীরা চলে যাক সাত লক্ষ গ্রামে, নিয়োজিত হোক গ্রাম নির্মাণে। এই অংশটি শুধু বাঙালি কেন, মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবী ভারতের বহুলাংশেরই না-পসন্দ। গাঁধী হত্যা প্রসঙ্গে আশিস নন্দী লিখেছেন— গাঁধীর প্রকৃত হত্যাকারী ছিল নিরাপত্তাহীন শহুরে শিক্ষিত পাশ্চাত্য ভাবাপন্ন এলিট শ্রেণি, যাঁদের উচ্ছেদ করছিল গাঁধীর রাজনীতি । সর্বোদয়, অন্ত্যোদয়ের উদ্দেশ্য নিয়ে চরকা এবং খাদি অবশ্যই বিপ্লবী বাঙালির চেতনায় নিতান্ত হাস্যকর হিসেবে দেখা দিয়েছিল। ছাগলকে খাওয়াতে খাওয়াতে ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে আলোচনা করেন যিনি, যার জন্য দেশের সমস্ত নেতাকে ছুটতে হবে গরুর গাড়িতে চেপে গণ্ডগ্রামে, বিপ্লবে তার স্থান কোথায়? হয়তো এই কারণেই রবীন্দ্রনাথের ‘সমবায় নীতি’ বাঙালির পকেটে পকেটে ঘোরেনি, ‘স্বদেশি সমাজ’-এর মতো প্রবন্ধ নিয়ে আজও তেমন আলোচনা নেই।

সুভাষ চন্দ্রই প্রথম গাঁধীকে জাতির জনক বলে সম্মোধন করেন।

ফিরে আসি সুভাষ প্রসঙ্গে। মৃত্যুর কয়েক দিন আগে, তেইশে জানুয়ারি, দিল্লিতে তিনি নেতাজিকে স্মরণ করে বলেছেন, কী ভাবে নেতাজি তাঁর আইএনএ-তে জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সব ভারতীয়কে একসঙ্গে মেলাতে পেরেছেন। গাঁধী সারা জীবন তো এই মিলনই চেয়েছেন। কিন্তু বাঙালির কাছে দেশভাগের অন্যতম খলনায়ক তিনি। কারণ তিনি বলেছিলেন, “দেশ ভাগ হবে আমার মৃতদেহের উপর দিয়ে”। কোনও ভাবেই তিনি মানতে চাইবেন না যে হিন্দু এবং মুসলমান পরস্পর বিরোধী সংস্কৃতির পরিচায়ক— যিনি বলছেন, “আমার সমস্ত সত্তা এই ভাবনার বিরোধী যে হিন্দুত্ব ও ইসলাম দুই পরস্পর বিরোধী সংস্কৃতি”।

আরও পড়ুন: তীব্র তিরস্কার আপনার প্রাপ্য মেনকা​

অথচ, ১৯৪৭-এ তিনি জীবিত। ক’দিন পরেই দেশকে জুড়বার জন্যই প্রাণ দিলেন তিনি। আমরা মনে রেখেছি তিনি স্বাধীন ভারত সরকারকে চাপ দিয়েছেন পাকিস্তানকে অর্থ দেওয়ার, ভুলে গিয়েছি তিনি দিল্লির উন্মত্ত হিন্দু ও শিখ নিধনের বিরুদ্ধে অনশন করেছেন, তিনি প্রস্তুত হচ্ছেন উদ্বাস্তু পরিবারদের নিয়ে পায়ে হেঁটে লহৌর যাওয়ার। শুধু দেশ নয়, গোটা ভারতীয় উপমহাদেশকে এক করে যাওয়াই ছিল তাঁর স্বপ্ন। ভারত-পাকিস্তান বৈরিতা কোথায় নিয়ে যেতে পারে, তিনি তখনই জানতেন। আজ সেই পথ ধরেই দুই দেশ সর্বদা যুযুধান, পরস্পরের বোমার ভয়ে প্রতিরক্ষা বাজেট আকাশছোঁয়া, ও দেশের শিল্পী এ দেশে এলে বয়কট, বীর তিনিই যিনি পাকিস্তানকে এক হাত নিতে পারেন, আর উগ্র সাম্প্রদায়িক মতবাদের গাঁধী হত্যাকারী দল আজ দেশের সর্বোচ্চ ক্ষমতায় আসীন। সাম্প্রদায়িকতা প্রশ্নে গাঁধীর অবদান নিয়ে আজ সবচেয়ে বেশি চর্চা প্রয়োজন। কেন না রাজনীতিবিদ হিসেবে গাঁধী সেই এক জন, যিনি ধর্ম নিয়ে কঠিন পরীক্ষায় যেতে পেরেছিলেন, যার উদ্দেশ্য ধর্মান্ধতা নয়, সহিষ্ণুতা প্রতিষ্ঠা। আজকের পৃথিবীতে এ কথা আরও বেশি সত্য। ধর্মীয় উন্মাদনা, একমাত্র ধর্মীয় উন্মাদনা, জনসাধারণকে সর্বাংশে বেশি নিষ্ঠুর ও অসহিষ্ণু করে তুলছে। সে শুধুই মারছে, আর মরছে। এই মৃত্যু উপত্যকায় অকুতোভয়ে দাঁড়াতে পারতেন গাঁধী। সাতাত্তর বছর বয়সে জরাজীর্ণ দেহ নিয়ে তিনি গিয়েছিলেন নোয়াখালি। পুলিশ  বা  সেনার ছত্রছায়ায় নয়, গুটিকয়েক সঙ্গী নিয়ে। বিধ্বস্ত, আক্রান্ত গ্রামগুলিকে পায়ে হেঁটে ঘুরেছেন। মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। থেকেছেন দুই ধর্মের মানুষের ঘরে। এমন নিদারুণ পরিস্থিতিতেও যে মৈত্রীর দীপ জ্বলতে পারে, গাঁধী তা দেখিয়েছেন। নির্বিচারে নরহত্যা, মেয়েদের উপর চূড়ান্ত নিষ্ঠুরতা, লুণ্ঠন যা ভারত ইতিহাসে বারবার ঘটে চলেছে এবং নামাতে হয়েছে সেনা, সেখানে গাঁধী পদে পদে বিপদের সঙ্গে মোলাকাত করছেন, দুই সম্প্রদায়কে মেলাবার জন্য, পেরেওছেন অনেকাংশে।

সাতাত্তর বছর বয়সে জরাজীর্ণ দেহ নিয়ে নোয়াখালি গিয়েছিলেন গাঁধী।

এই ভয়াবহ পরিস্থিতির জন্য যাঁকে দায়ী করা হয়, সেই সুরাবর্দীকেও তিনি ডাক দিয়েছেন তাঁর কাজে। অবশেষে হিন্দুর দেবতার হেফাজত করতে এসেছেন মুসলমান। অনশন করেছেন আমাতুস সালাম। সে সময় তাঁকে দেখে এক সাংবাদিক বলেছেন, এ যেন এক তীর্থযাত্রা, ঠান্ডা মাটিতে খালি পায়ে হাঁটছেন লাঠি হাতে এক খর্বকায় মানুষ কোনও এক মহান মানবিক আদর্শের খোঁজে। নোয়াখালির শ্রীরামপুর যেখানে তিনি থেকেছেন টানা পঁয়তাল্লিশ দিন, প্রথম দিনেই সেখানে তিনি বলেছেন— দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা না ফিরলে তিনি পূর্ববঙ্গ ছাড়বেন না। এই আস্থা ছাড়া পাকিস্তান, হিন্দুস্তান সমস্ত অর্থহীন, এ দেশের জন্য পড়ে থাকছে শুধু পারস্পারিক দ্বন্দ্বে বিদীর্ণ এক ভয়াবহ দাসত্ব। ভারত ইতিহাসের এই ঘনীভূত সময়ে নেতারা চাইছিলেন তিনি অন্তত কলকাতায় থাকুন, তিনি শোনেননি। কেন না ক্ষমতা হস্তান্তরের চেয়ে সেই দিন অনেক বেশি প্রয়োজনীয় ছিল মানুষের মনে প্রলেপ দেওয়া, যে বোধ ছাড়া দেশপ্রেম কেবল প্রতীক মাত্র। গাঁধীর নোয়াখালি পর্বের পাতাগুলি বাঙালি উল্টে রেখেছে। আজ যখন কানের পাশ দিয়ে ছুটে যাচ্ছে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাণ, পথে ঘাটে হিন্দু বাঙালির প্রিয় উপাস্য যখন মারুতি, শুধু ভদ্রলোক বাবুর সেকুলারিজমের বক্তৃতা দিয়ে আর ঠেকানো যাচ্ছে না ঘৃণাকে, তখন আমাদের সামনে এসে দাঁড়ান গাঁধী— যিনি পরিত্রাতা নন, একক নায়ক নন, মানুষের সঙ্গে, মানুষের হাত ধরে হেঁটে চলার চিরন্তন আলো।

(লেখক সমাজকর্মী এবং লাভপুর সত্যনারায়ণ শিক্ষানিকেতন উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা)

অলঙ্করণ: তিয়াসা দাস।