চব্বিশ বছর পরে ছেলের হাত ধরে নিশ্চিন্দিপুর ফিরল অপু। চৈত্রের শেষ। ফেরার পরের দিন বিকেলেই চড়ক। অপু এসে হাজির হল গ্রামের চড়কের মেলায়। অপু দেখল, ছোটবেলার সেই চড়কের মেলাটা কেমন পালটে গিয়েছে। সেই জাঁক নেই, চড়ক গাছ পুঁতে ঘুরপাক খাওয়া নেই। পুরনো লোকগুলোই বা কোথায়? অপুর চোখ খুঁজছিল পরিচিত মুখ। হঠাৎ নজরে পড়ল চিনিবাস বৈরাগীকে।  সে আগের মতোই তেলেভাজার দোকান করেছে। 

অপুর মনে পড়ল, চব্বিশ বছর আগে চড়কের মেলার পরে পরেই ওরা নিশ্চিন্দিপুর ছেড়েছিল। সে চড়ক ভাল কাটেনি অপুর। এক দিকে দিদির শূন্যতা, অন্য দিকে তার প্রিয় গ্রামের সঙ্গে আসন্ন বিচ্ছেদ। মনটা গুমরে গুমরে উঠেছিল। চিনিবাস বৈরাগীর দোকান থেকে দু’পয়সার তেলেভাজা কিনে বাড়ির পথে হাঁটা দিয়েছিল অপু। 

গ্রামের মেঠোপথ ধরে যেতে যেতে অপু সে দিন ভেবেছিল, এই গ্রাম ছেড়ে যেখানে যাচ্ছে, সেখানে যদি চড়কের মেলা না পায়, তবে বাবাকে বলে চড়কের সময় ও কয়েক দিনের জন্য চলে আসবে এখানে। কিন্তু মানুষ ভাবে এক, হয় আর এক। সে দিন কে জানত, অনেক পথঘাট পেরিয়ে, অনেক ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করে গ্রামের চড়কে ফিরতে অপুর চব্বিশটা বছর লেগে যাবে!  

দিল্লি দখলের লড়াই, লোকসভা নির্বাচন ২০১৯

সন্ধে হয়ে গিয়েছে। অপু দেখল, চড়কের মেলা দেখে হাসিমুখে বাড়ির দিকে ফিরে যাচ্ছে ছেলের দল। কারও হাতে বাঁশের বাঁশি, কারও হাতে মাটির রং করা পালকি। অপুর মনে হল এই একটা জায়গায় মেলাটা যেন সেই আগের মতোই থেকে গিয়েছে।

গ্রামজীবনের নিপুণ কথাকার বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পথের পাঁচালী’, ‘অপরাজিত’ যাঁদের পড়া, তাঁদের কাছে নিজের গ্রামের চড়ক নিয়ে অপুর এই আবেগ, বিষণ্ণতা, স্মৃতিকাতরতা সবই জানা গল্প। তবু চৈত্রের অন্তিমে চড়ক হাজির হলে আর এক বার এই দুই উপন্যাসের পাতায় গিয়ে দাঁড়াতে ভাল লাগে।

অপু-কাহিনিতে মোট তিনটে চড়কের কথা আছে। প্রথম চড়কে দুর্গা ছিল। সে চড়কে গাজনের সন্ন্যাসীদের পিছনে পিছনে অপু-দুর্গা ঘুরে বেড়াত। গ্রামের এই বারোয়ারি চড়কে হরিহরের চাঁদা পড়েছিল এক টাকা। চড়কে অপুদের গ্রামে যাত্রা আসত। সে বার এসেছিল নীলমণি হাজরার যাত্রা। বিভূতিভূষণ চড়কের দিনটার বর্ণনায় যাননি। শুধু জানা গিয়েছে, ‘চড়কতলার মাঠের শেওড়াবন ও অন্যান্য জঙ্গল কাটিয়া পরিষ্কার করা হইয়াছে।’ 

দ্বিতীয় চড়কে চড়কের পুজো কেমন করে হল, সন্ন্যাসীরা কী করল সে সব নেই। তবে চড়কের মেলাটা আছে। দিদি নেই বলে মেলাটা অপুর ফাঁকা-ফাঁকা লাগছে। আগের বারে চড়কের মেলায় পট কেনা নিয়ে দিদির সঙ্গে কথা কাটাকাটির কথা অপুর মনে পড়ছে। অপু চির-কৌতূহলী। তবু এটা হতেই পারে, কিশোর অপুকে চড়কের পুজো-আচারের বীভৎসতার দিকে ইচ্ছে করেই লেখক মুখোমুখি করাননি।  করালে ১৮৯৪ সালে জন্মানো বিভূতিভূষণের কলমে গত শতকের প্রথম দশকের চড়কপুজোর একটা রূপরেখা উপন্যাস থেকেই তৈরি করা যেত। এমনকি তৃতীয় চড়কেও এটা নেই। 

তবে গ্রামজীবনে চড়কপুজোর আচারে তেমন বদল হয়ত তখনও আসেনি। ১৮৬৩ সালে ব্রিটিশ সরকার আইন করে শরীরে বাণ-বঁড়শি বেঁধানো নিষিদ্ধ করলেও গ্রামজীবনে এই আইনের তেমন প্রভাব পড়েনি। সেখানে চড়কের এমন আচারগুলো টিকেই ছিল। এমনকি আজও টিকে আছে অনেক জায়গায়।

প্রাক-আইন যুগে কেমন ছিল চড়ক? কলকাতার কথাই বলা যাক। খোলা যাক ‘হুতোম প্যাঁচার নকশা’।  ‘আজ চড়ক। ...চড়কগাছ পুকুর থেকে তুলে মোচ বেন্ধে মাথায় ঘি-কলা দিয়ে খাড়া করা হয়েছে, ক্রমে রোদ্দুরের তেজ পড়ে এলে চড়কতলা লোকারণ্য হয়ে উঠলো।’ কী কী বিক্রি হচ্ছে সেখানে? হুতোম জানাচ্ছেন, ‘চড়কতলায় টিনের ঘুরঘুরী, টিনের মুহুরী দেওয়া তলতা বাঁশের বাঁশী, হলদে রং করা বাঁখারির চড়কগাছ, ছেঁড়া ন্যাকড়ার তইরি গুড়িয়া পুতুল, শোলার নানা প্রকার খেলনা, পেল্লাদে পুতুল, চিত্তির করা হাঁড়ি  বিক্রি কত্তে বসেছে।’ চড়কের মূল আকর্ষণ চড়ক গাছে চড়ে ঘোরার দৃশ্য হুতোমের বর্ণনায় রয়েছে—‘একজন  চড়কী পিঠে কাঁটা ফুঁড়ে নাচতে নাচতে এসে চড়কগাছের সঙ্গে কোলাকুলি কল্লে-মৈয়ে করে তাকে উপরে তুলে পাক দেওয়া হতে লাগলো, সকলেই আকাশপানে চড়কীর পিঠের দিকে চেয়ে রইলেন। চড়কি প্রাণপণে দড়ি ধরে কখন ছেড়ে পা নেড়ে ঘুরতে লাগল। ‘দে পাক দে পাক’ শব্দ কারু সর্ব্বনাশ কারু পৌষমাস।’

কিন্তু চড়ক আসলে কী? অমূল্যচরণ ঘোষ বিদ্যাভূষণ, ‘আমাদের চড়ক’ প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘চড়ক’ শব্দ ‘চক্র’ শব্দ হইতেই ব্যুৎপন্ন। … ‘চড়ক’ বলিলে চক্র বা ঘুর্ণন-উৎসব বুঝাইবে।’ কিন্তু এই ঘূর্ণন তাও আবার চামড়ায় বাণ-বঁড়শি বিঁধিয়ে চড়কগাছে চড়ে, এর পিছনের কারণটা কী? 

পুরাণে চড়ক নিয়ে স্পষ্ট করে বলা নেই। ‘হরিবংশে’ কিছুটা ঈঙ্গিত রয়েছে। সেখানে দেখা যায়, শোণিতপুরের  কাছে রাজা বাণ  কৃষ্ণপুত্র এবং তাঁর কন্যা ঊষার প্রেমিক অনিরুদ্ধকে বন্দি করলে কৃষ্ণের সঙ্গে তাঁর যুদ্ধ বাধে। অসুররাজ বাণের ছিল হাজার  হাত। কৃষ্ণ সেগুলো বাণে বিদ্ধ করে তাঁর মাথা কাটতে উদ্যত হন। কিন্তু বাণ ছিলেন শিবভক্ত। ভক্তের এই দুর্দশা দেখে মহাদেব কৃষ্ণ ও বাণের মধ্যে দাঁড়িয়ে ভক্তকে রক্ষা করেন। বাণ তখন অনবরত নৃত্য করতে লাগেন। শিব এ সময় খুশি হয়ে বাণকে বর দেন, ‘আমার যে ভক্ত উপবাসী থেকে বাণবিদ্ধ হয়ে নৃত্য করবে, সে আমার পুত্রত্ব প্রাপ্ত হবে।’ 

কেউ কেউ আবার এই ঘূর্ণনের মধ্যে, ভারতীয় পঞ্জিকা অনুযায়ী চৈত্র সংক্রান্তির দিন সূর্যের যে অয়ন বা যাত্রা শুরু হয়, সেই আবর্তনের ছাপ  লক্ষ্য করেছেন। তবে আসলে কিন্তু এটি লোকউৎসব। একসময় শুধু পাশুপত  সম্প্রদায়ের মধ্যেই এটি প্রচলিত ছিল। অনেক পরে এটি বৃহত্তর সমাজে গৃহীত হয়। অনুমান করা হয়, সুন্দরানন্দ ঠাকুর নামে এক রাজা এই পুজো প্রথম শুরু করেন। 

চড়কপুজোয় সন্ন্যাসীদের দেহসম্পীড়নের নানা ভাগ আছে। বঁটিঝাপ, কাঁটাঝাপ, ঝুলঝাঁপ। চড়কগাছে বাণবিদ্ধ  হয়ে ঘোরাটা সবার শেষে। তার আগে রয়েছে জ্বলন্ত অঙ্গারের উপর দিয়ে হাঁটা, কাঁটা আর ছুরির উপর লাফানো, বাণফোঁড়া, অগ্নিনৃত্য এই সব। তবে বর্তমান মোবাইল ইন্টারনেটের যুগে আমাদের বেশিরভাগ লোক উৎসবের মতো চড়কেরও কোণঠাসা  অবস্থা। গ্রামজীবনে চড়কের মেলার একটা আকর্ষণ ছিল। আজ সেখানেও ভাটা। ‘পথের পাঁচালী’র যে পরিচ্ছেদে অপু দুর্গা দু’জনেই চড়কে মেতেছে, তার শিরোনাম—‘হলুদ বনে বনে’। পরিচ্ছেদের শেষে অপু জঙ্গলের মধ্যে গন্ধ ভেদালির পাতা খুঁজতে খুঁজতে অকারণেই আবৃত্তি করেছে  শিরোনামের ছড়াটা (‘হলুদ বনে বনে—/নাক-ছাবিটি হারিয়ে গেছে সুখ নেইকো  মনে’)। এখন ছড়াটাকে কিন্তু বেশ প্রাসঙ্গিক মনে হয়। আসলে আমাদের সংস্কৃতি নামের নাকছাবিটিও তো হারিয়ে যাচ্ছে ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপের হলদে বিনোদনের জঙ্গলে!

লেখক ভগবানগোলা হাইস্কুলের শিক্ষক