E-Paper

‘আর্থিক বৃদ্ধির বিরোধীরাই আসলে দেশদ্রোহী’

রাজনীতিকে শেষ অবধি এমন পথ খুঁজতেই হবে, যাতে সবাই জেতে— এক ভারতীয়ের জয় যাতে অন্য ভারতীয়ের জয়কে সহজতর করে তুলতে পারে, তেমন পথের সন্ধান করাই এই মুহূর্তে বিকল্প রাজনীতির সবচেয়ে বড় কাজ।

শেষ আপডেট: ৩১ জানুয়ারি ২০২৬ ০৮:৩১

প্রশ্ন: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে যে বিশ্বব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল, সাম্প্রতিক কালে মূলত ডোনাল্ড ট্রাম্পের দৌলতে তা ধসে পড়ার মুখে। বিভিন্ন বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান থেকে উদার অর্থনীতির মূল ধারণা, সবই বিপন্ন। এই নতুন পৃথিবীতে টিকে থাকার জন্য ভারত কতখানি তৈরি?

রঘুরাম রাজন: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর মিত্রশক্তি যে বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল, তাতে আমেরিকার ভূমিকা ছিল দায়িত্বশীল অভিভাবকের মতো। এ কথা বলব না যে, তাদের ভূমিকা সব সময় নিরপেক্ষ, অপরের স্বার্থের প্রতি সহানুভূতিশীল অথবা ন্যায্য ছিল। এই বিশ্বব্যবস্থা থেকে আমেরিকা বিপুল সুবিধা পেয়েছে, তা অস্বীকার করার কোনও কারণ নেই। কিন্তু এটাও সত্যি যে, এই ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য আমেরিকা করেছেও অনেক কিছু। খরচ করেছে, ঝুঁকি নিয়েছে, ক্ষেত্রবিশেষে নিজের স্বার্থ ভুলে সঙ্গী দেশকে সাহায্যও করেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকার এই ভূমিকার বিরুদ্ধে। প্রেসিডেন্ট হিসাবে তাঁর প্রথম দফাতেও তিনি এই বিশ্বব্যবস্থার বিরুদ্ধে খড়্গহস্ত ছিলেন— দ্বিতীয় দফায় তো আর কথাই নেই। তিনি এই গোটা ব্যবস্থাটির গুরুত্ব নষ্ট করছেন। তবে, একা যে ট্রাম্পই নন, সে কথাও মনে রাখা দরকার। দুনিয়া জুড়েই রাজনীতিতে উত্থান হয়েছে এমন বেশ কিছু নেতার, যাঁরা ব্যক্তিবাদী। পপুলিস্ট রাজনীতির কারবারি। ভারত বা রাশিয়ায় যেমন সেই উদাহরণ রয়েছে, তেমনই আছে ফ্রান্সের মতো ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও।

এই ব্যক্তিবাদী রাজনৈতিক নেতৃত্বের উত্থান ধনতন্ত্রের পুরনো মডেলকে— দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-উত্তর পর্বের বৈশ্বিক অর্থব্যবস্থা— চ্যালেঞ্জ করছে। ‘গ্লোবাল স্পিরিট’ বস্তুটা এখন দুর্বল। অন্য দেশের উন্নতি হলে পুঁজির নিয়মেই আমার দেশেরও উন্নতি হবে, এই বিশ্বাসটা আর রাজনৈতিক গুরুত্ব পাচ্ছে না। তার জায়গা নিয়েছে ‘জ়িরো সাম গেম’-এর ধারণা— অর্থাৎ, অন্যের যতটুকু ক্ষতি, আমার ঠিক ততটুকুই লাভ। ফলে, বৈশ্বিক অর্থব্যবস্থা দার্শনিক ভাবে প্রায় একশো বছর পিছিয়ে গিয়েছে— সবাই নিজের আখেরটুকু গুছিয়ে নেওয়ার কথা ভাবছে।

এই অবস্থায় ভারত কী করবে, সেটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। প্রথমত, মাঝারি মাপের আর্থিক ক্ষমতার অধিকারী দেশ হিসাবে ভারতকে নিজের ওজন বুঝতে হবে। আঞ্চলিক ভাবে শত্রু পরিবেষ্টিত হয়ে থাকা কোনও কাজের কথা নয়। চিন এবং পাকিস্তান, এই দুই দেশের সঙ্গেই সম্পর্ক অন্তত স্থিতিশীল হওয়া জরুরি। পাশাপাশি ভারতকে তাকাতে হবে দেশের অভ্যন্তরে। আর্থিক বৃদ্ধি অব্যাহত রাখতে হবে। যখন বৈদেশিক পরিস্থিতি প্রতিকূল, তখন দেশের মধ্যে ঐক্য বজায় রাখাও অতি গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

প্র: আর্থিক বৃদ্ধির দিক থেকে ভারত কি তৈরি?

উ: ভারতের আর্থিক বৃদ্ধির হার খুব আহামরি না হলেও তাকে মন্দ বলা যাবে না। বৃদ্ধির হার অবশ্যই বাড়াতে হবে। আর্থিক সংস্কারও প্রয়োজন। বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার বেশ কিছু সংস্কারমুখী সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, সেগুলোকে স্বাগত জানাতে হবে। কিন্তু, পাশাপাশি আর কয়েকটা কথা বুঝতে হবে। প্রথমত, ভারতের সামর্থ্য সীমিত, ফলে কোন খাতে কতখানি লগ্নি করলে সবচেয়ে ভাল ফলাফল পাওয়া সম্ভব, সে কথা বুঝে লগ্নি করতে হবে। আর্থিক বৃদ্ধির কিন্তু কোনও একটি নির্দিষ্ট পথ নেই— বিভিন্ন পথে বৃদ্ধি ঘটতে পারে। আমার মনে হয়, ভারতে শহর এবং শহরতলিতে পরিষেবা ক্ষেত্র বৃদ্ধির দিকে মন দেওয়া দরকার। সব পরিষেবাই যে উচ্চ দক্ষতার হতে হবে, এমনও নয়— মাঝারি দক্ষতাসম্পন্ন কর্মীর জোগান বাড়াতে হবে। আবার, আজ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যে ভাবে বিস্তার ঘটছে, তাতে স্পষ্ট যে, অদূর ভবিষ্যতেই দেশের আর্থিক সমৃদ্ধি বহুলাংশে নির্ভর করবে এই ক্ষেত্রে দক্ষতার উপরে। কাজেই এ দিকেও লগ্নি প্রয়োজন। এর পাশাপাশি ভারতকে তৈরি থাকতে হবে নিজের সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্যও। তার জন্য প্রতিরক্ষা খাতে লগ্নি বাড়াতে হবে।

আরও এক বার জোর দিয়ে বলতে চাই যে, ভারত এখন যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে দেশের অভ্যন্তরীণ সংঘাত ভারতকে দুর্বল করবে। বৈদেশিক শত্রুর সঙ্গে লড়তে গেলে একতাই শক্তি, এবং ভারত সেখানে খুব ভাল অবস্থায় নেই। ১৯৬২ সালে ভারত-চিন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সি এন আন্নাদুরাই স্বতন্ত্র দ্রাবিড়নাড়ুর দাবিতে চলা আন্দোলন প্রত্যাহার করে নিয়ে দেশের প্রধানমন্ত্রীর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। বলেছিলেন, চিনের প্রেসিডেন্টের থেকে স্বাধীনতা আদায় করার বদলে আমি জওহরলাল নেহরুর থেকে স্বাধীনতা আদায় করতে পছন্দ করব। একতার এই বোধটিতে ফেরত আসা প্রয়োজন।

প্র: আন্তর্জাতিক অর্থব্যবস্থা এখন যে ভাবে বিশ্বায়নের ভাল দিকগুলোর উল্টো পথে হাঁটছে, তাতে কিছু অর্থনীতিবিদ বলছেন যে, নেহরু-যুগের মিশ্র অর্থনীতির পথে ফেরত যাওয়া উচিত। অর্থাৎ, বৈদেশিক বাণিজ্যের উপরে নির্ভর না করে আমদানি-প্রতিস্থাপক উৎপাদনে জোর দেওয়া, প্রয়োজনে নিজেদের শুল্ক-প্রাচীর তৈরি করা।

উ: যে নীতির বিপদগুলো আমার জানা হয়ে গেছে, আবার তাতে ফেরত না যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। দরজা-জানালা আটকে বাঁচা অসম্ভব। এই মুহূর্তে ভারতের কর্তব্য ঠিক উল্টো— যত বেশি সম্ভব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করা, যাতে একটা দরজা বন্ধ হলে অন্য দরজা খোলে। ভারতের বিপুল বাজারের কারণেই বহু দেশ আমাদের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়, গভীরতর করতে চায়। স্বীকার করতেই হবে যে, ভারত সে সুযোগ যথেষ্ট নিতে পারেনি। বিশ্বমঞ্চেও নয়, আবার ঘরের কাছে পূর্ব এশিয়ার দেশগুলির ক্ষেত্রেও নয়। এই মুহূর্তে ভারতের কর্তব্য হল বৈশ্বিক জোগানশৃঙ্খলে নিজের জায়গা পাকা করা। অনেক রকম সম্ভাব্য সঙ্গী আছে— চিন বা কানাডা অথবা ইউরোপের বাজার যেমন, তেমনই পশ্চিম এশিয়া বা পূর্ব এশিয়ার সঙ্গেও বাণিজ্যিক সম্পর্ক তৈরি করা যায়। আফ্রিকাও চমৎকার বিকল্প। তবে, শুধু নিজের লাভের কথা ভাবলেই হবে না। যেমন, আফ্রিকার বাজারে ভারতীয় পণ্যের ব্যবসা চাইলে ভারতের বাজারও যথেষ্ট খুলতে হবে আফ্রিকান পণ্যের জন্য।

এ ক্ষেত্রে ভারতের কূটনৈতিক পারদর্শিতার প্রশ্ন উঠবে। বিশেষত প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে। ডক্টর সিংহ প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন খুব জোর দিয়ে বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, নেপাল এমনকি পাকিস্তানের সঙ্গেও সুসম্পর্ক বজায় রাখার কথা বলতেন। গত দশ বছরে ভারতীয় কূটনীতি এই জায়গাটা হারিয়েছে। আর, শুধু বাণিজ্যের জন্যই তো নয়— জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও প্রতিবেশীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক জরুরি। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতকে ‘বিগ ব্রাদার’-এর ভূমিকা পালন করতে হবে। তার জন্য যদি খানিকটা স্বার্থত্যাগ করতে হয়, তবে সেটা করা জরুরি। বিশ্বমঞ্চেও ভারতকে নিজের ঐতিহ্যের কথা প্রতিষ্ঠা করতে হবে— বাণিজ্যিক সম্পর্ক মানে শুধু লেনদেন নয়, তার চেয়ে গভীর, সংস্কৃতিগত সম্পর্ক। ভারতের কর্তব্য নিজেকে একটা ঐতিহ্যবাহী শান্তিপূর্ণ নিরাপদ শক্তি হিসাবে প্রতিষ্ঠা করা।

প্র: আপনি আর্থিক বৃদ্ধির ক্ষেত্রে শ্রমশক্তির দক্ষতা তৈরি করার কথা বললেন। ভারত কি সে ক্ষেত্রে যথেষ্ট বিনিয়োগ করছে?

উ: এক কথায় উত্তর, না। আরও বিনিয়োগ চাই, এবং তার চেয়েও বড় কথা— বিচক্ষণ বিনিয়োগ চাই। কোন গোত্রের দক্ষতা তৈরির জন্য বিনিয়োগ করলে শ্রমশক্তির সবচেয়ে বেশি লাভ হচ্ছে, সেটা মাথায় রাখতে হবে। আজকের প্রযুক্তির যুগে কাজটা সহজ। বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন, এমন কর্মীদের প্রশিক্ষণ-পরবর্তী কর্মজীবনের প্রথম কয়েক বছর যদি ট্র্যাক করা যায়, তা হলেই বোঝা যাবে যে, কোন ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ তাঁদের পক্ষে সবচেয়ে লাভজনক। বাজারে কিসের চাহিদা আছে। সেই অনুযায়ী লগ্নি করতে হবে। অভিজ্ঞতা থেকে শিখতে হবে, ভুল শুধরে নিতে হবে। কিন্তু তারও আগে প্রাথমিক শিক্ষা এবং শিশুর স্বাস্থ্য ও পুষ্টিতে অনেক বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। আজ যারা প্রাথমিক স্কুলে যাচ্ছে, আগামী ৪০-৫০ বছর তারাই ভারতের শ্রমশক্তি হবে। ফলে তাদের কর্মক্ষম হতে হবে, ভবিষ্যতের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করার মতো শিক্ষা থাকতে হবে। মানবোন্নয়নের ক্ষেত্রে ঠিক কোন পথে চলা উচিত, কেন্দ্রীয় সরকারকে তা স্থির করতে হবে রাজ্যগুলির সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে।

প্র: প্রায়শই অভিযোগ ওঠে যে, কেন্দ্রীয় সরকার যুক্তরাষ্ট্রীয়তার ধর্ম লঙ্ঘন করে। রাজ্যের সঙ্গে আলোচনা করে কেন্দ্র এই উন্নয়ন নীতি স্থির করবে, তা কি আশা করা যায়?

উ: হ্যাঁ, ভারতে যুক্তরাষ্ট্রীয়তার নীতি লঙ্ঘিত হচ্ছে। আমি জানি না, হয়তো দোষ দু’তরফেরই— কিন্তু এটা সত্যি যে, কেন্দ্রে বিজেপি সরকারের সঙ্গে বিজেপি-বিরোধী রাজ্যগুলির সরকারের সংঘাতে ক্ষতি হচ্ছে দেশের আর্থিক বৃদ্ধির, সামগ্রিক উন্নয়নের। যাঁরা দেশের আর্থিক বৃদ্ধির বিরোধী, তাঁরাই আসলে দেশদ্রোহী। উন্নয়নের প্রশ্নে অন্তত রাজনীতি কমাতে হবে। গণতন্ত্রে তো সুযোগ রয়েছে বিভিন্ন ধরনের অবস্থান সরাসরি মানুষের কাছে পেশ করার— মানুষই বেছে নেবেন কোন উন্নয়ন নীতি তাঁদের পক্ষে ঠিক। সে পথে হাঁটা দরকার।

প্র: কিন্তু, তার জন্য একটা সার্বিক বিশ্বাসের পরিবেশ দরকার। আপনি কি মনে করেন যে, গত এক দশকে ভারতে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক— সব দিক দিয়েই বিশ্বাসের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে?

উ: ঠিকই। ঐতিহাসিক ভাবেই ভারতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হল দেশের অর্থব্যবস্থায় একটা প্রতিযোগিতার পরিবেশ গড়ে তোলা, যা শুধু কয়েকটা বড়, শাসক-ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক গোষ্ঠীর পক্ষে ইতিবাচক নয়। ভারতে এখন তেমন কয়েকটি বড় পুঁজির কাছে ব্যবসা কার্যত ঝুঁকিহীন, আর বিশেষত ছোট ব্যবসার পক্ষে তুমুল ঝুঁকিপূর্ণ। এই পরিস্থিতি কখনও কাম্য নয়। ভারতের কম্পিটিশন কমিশনের কর্তব্য এ দিকে নজর দেওয়া— যেখানে কতিপয় বৃহৎ পুঁজির দাপট, সেখানে যথেষ্ট নজরদারি করা। রাষ্ট্রের প্রতি এই আস্থা ফেরত আনতেই হবে। ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ তৈরি করতে পারা খুব জরুরি। পরের প্রশ্নটি রাজনৈতিক আস্থার। অভিজ্ঞতা বলছে, গণতন্ত্রের পথে থাকা দেশের আর্থিক বৃদ্ধির পক্ষে খুব গুরুত্বপূর্ণ। নয়তো, ভাল সিদ্ধান্তও শেষ পর্যন্ত বাতিল হয়ে যায়। এই সরকারের কৃষি বিলের ক্ষেত্রে যেমন হল। মানুষের কথা শোনা হয়নি বলে শেষ অবধি সেই সংস্কার বাতিল করতে হল। শাসকের রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা অর্থব্যবস্থার পক্ষে সুসংবাদ নয়। এবং, বিরোধী মত না-শোনার অভ্যাসটি দীর্ঘস্থায়ী। আজ যাঁরা শাসক, তাঁরা যাঁদের অবজ্ঞা করছেন, ভবিষ্যতে সেই পক্ষ ক্ষমতায় এলে আজকের শাসকদের সঙ্গে একই ব্যবহার করবেন বলেই আশঙ্কা হয়। তাতে শেষ অবধি দেশের ক্ষতি। বিভিন্ন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে শাসক যদিনিজের রাজনৈতিক অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করতে থাকেন, তা হলেও এই ক্ষতিই হয়। ভারতে সেটা প্রবল ভাবে হচ্ছে।

প্র: ভারতীয় রাজনীতির মানচিত্রে এখন বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ নগদ হস্তান্তর কার্যত অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। উন্নয়নের ক্ষেত্রে এর কী প্রভাব পড়ছে?

উ: ভারতের এখন আর্থিক অবস্থা যে রকম, তাতে দরিদ্রতম জনগোষ্ঠীর হাতে নগদ তুলে দেওয়ার সামর্থ্য আমাদের আছে। এবং, উন্নয়নের স্বার্থে সেটা জরুরিও বটে— পাতে ভাতের ব্যবস্থা থাকলে দরিদ্র মানুষের পক্ষে সন্তানকে স্কুলে পাঠানো একটু হলেও সহজ হয়। সমস্যা হল, হস্তান্তর প্রকল্পগুলি ‘টার্গেটেড’ না-হয়ে যত বেশি সম্ভব মানুষকে এর আওতায় নিয়ে আসতে চায়। তার রাজনৈতিক কারণ সহজবোধ্য। কিন্তু, এটা করতে গিয়ে যদি শিক্ষা বা স্বাস্থ্যের ক্ষতি হয়, তা মানা যায় না। অভিজ্ঞতা বলছে, দেদার হস্তান্তর করতে গিয়ে রাজ্য সরকারগুলির হাতে যথেষ্ট টাকা থাকছে না। তাতে শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষেরই ক্ষতি হচ্ছে। কিন্তু তার পরও নেতারাও এই ধরনের প্রকল্প চান, কারণ এতে তাঁদের ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়; আর মানুষও চান, কারণ এই ধরনের প্রকল্পের সুফল সবচেয়ে কম সময়ে এবং সবচেয়ে প্রত্যক্ষ ভাবে পাওয়া যায়। দরিদ্রতম মানুষের জন্য সীমিত ভাবে যে প্রকল্প উন্নয়নের পক্ষে অনুকূল, সেটা শেষ অবধি সর্বজনীন উন্নয়নের বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে, এই দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতি থেকে বেরোনো দরকার।

প্র: আপনি একাধিক বার দেশের অভ্যন্তরীণ একতার কথা বললেন। ভারতের বর্তমান শাসকরা কি সেই অভ্যন্তরীণ একতা তৈরিতে যথেষ্ট উদ্যোগী? বিকল্প রাজনীতির চেহারা কেমন হলে সেই অভ্যন্তরীণ একতা প্রতিষ্ঠা করা যায়?

উ: সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী রাজনীতির সঙ্গে লড়ার সবচেয়ে বড় মুশকিল হল, এ ক্ষেত্রে উন্নয়নের অ্যাজেন্ডাকে অস্ত্র বানিয়ে লড়া যায় না। একটা পরিচিতির রাজনীতির বিপক্ষে খাড়া করতে হয় অন্য পরিচিতির রাজনীতিকে। শাসকের দ্বারা বঞ্চিত, এই পরিচিতির রাজনীতিও শেষ অবধি আইডেন্টিটি পলিটিক্স। এবং, তার বিপদ হল, পরিচিতির রাজনীতি শেষ অবধি ‘জ়িরো সাম গেম’-এর হিসাব বোঝে— এক পক্ষের লাভের জন্য অন্য পক্ষের ক্ষতি হতেই হয়। এটা অভ্যন্তরীণ একতা অর্জনের পথ নয়। রাজনীতিকে শেষ অবধি এমন পথ খুঁজতেই হবে, যাতে সবাই জেতে— এক ভারতীয়ের জয় যাতে অন্য ভারতীয়ের জয়কে সহজতর করে তুলতে পারে, তেমন পথের সন্ধান করাই এই মুহূর্তে বিকল্প রাজনীতির সবচেয়ে বড় কাজ।

রঘুরাম রাজন।

রঘুরাম রাজন।

সাক্ষাৎকার: অমিতাভ গুপ্ত

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Economist RBI

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy