২০১৮ সালের অগস্টে কেরলে এক ভয়ঙ্কর বন্যা-বিপর্যয় ঘটে। টানা এক সপ্তাহ ধরে মাত্রাতিরিক্ত বৃষ্টির জেরে রাজ্যের ১৪টি জেলায় বন্যার লাল সঙ্কেত জারি হয়। তার মধ্যে পশ্চিমঘাটে বিস্তৃত সাতটি জেলার অবস্থা দাঁড়ায় ভয়াবহ। জলের তোড়ে আর পাহাড়ের ঢাল ধসে ধ্বংস হয় দশ হাজার কিলোমিটারের বেশি রাস্তা, নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় কয়েক সহস্র বাড়ি, কফি বাগান, এমনকি বেশ কিছু বসত অঞ্চলও। সরকারি হিসাবেই মারা যান পাঁচশোর কাছাকাছি মানুষ। প্রায় এক শতাব্দী এমন ধ্বংসাত্মক বন্যা দেখেনি কেরল। ‘জাতীয় বিপর্যয়’ হিসাবে ঘোষিত সেই দুঃসময়ে উঠে আসে এক জন পরিবেশবিজ্ঞানীর নাম। বার বার আলোচিত হতে থাকে ২০১১ সালে করা তাঁর সাবধানবাণী— পশ্চিমঘাটের মতো সংবেদনশীল অঞ্চলে যদি যথেচ্ছ অরণ্য অপসারণের সঙ্গে বেআইনি খনি-খাদান, যেখানে সেখানে বড় বড় নির্মাণকাজ চলতে থাকে, তা হলে এক দশকের মধ্যেই কেরলের মতো রাজ্যে ভয়ঙ্কর বন্যা, ভূমিধসের মতো বিপর্যয় নেমে আসবে। বিজ্ঞানীর নাম— মাধব ধনঞ্জয় গ্যাডগিল!
জন্ম ১৯৪২ সালে পুণে শহরে। পিতা ধনঞ্জয় গ্যাডগিল বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ। প্রতিবেশী বিখ্যাত নৃতত্ত্ববিদ ইরাবতী কার্ভে, পিতৃবন্ধু ভারতের অগ্রণী পক্ষীবিদ সালিম আলি! ছোটবেলা থেকেই বাবার প্রত্যক্ষ সাহচর্য ও উৎসাহে তাঁর মনে গেঁথে গিয়েছিল প্রকৃতির মাঝে ঘুরে বেড়ানোর অভ্যাস। বালক বয়সেই ইরাবতী মাসির সঙ্গী হয়ে সুদূর কর্নাটকে ক্ষেত্রসমীক্ষার সময় দেখেছিলেন, কী ভাবে প্রান্তিক মানুষের সঙ্গে মেলামেশার মাধ্যমে তাঁদের জীবনযাপনের পদ্ধতিকে বুঝতে হয়। সালিম আলির সান্নিধ্যে পেয়েছিলেন পশুপাখি দেখার নেশা। প্রাণিবিদ্যা নিয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করার পর দেশীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বস্তাপচা সিলেবাস ও শিক্ষককুলের কূপমণ্ডূকতায় বীতশ্রদ্ধ মাধব পিএইচ ডি-র উদ্দেশ্যে পাড়ি দেন আমেরিকার হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটিতে।
হার্ভার্ডে তরুণ মাধব গ্যাডগিলকে নিজের পক্ষপুটে নিয়েছিলেন এডওয়ার্ড উইলসন, নিঃসন্দেহে ডারউইন-পরবর্তী কালের অন্যতম প্রভাবশালী বিবর্তনবাদী জীববিজ্ঞানী, যিনি আমৃত্যু ছিলেন মাধবের হিতাকাঙ্ক্ষী। তাঁরই উৎসাহে প্রাণিবিদ মাধব বেছে নিলেন হার্ভার্ডের কম্পিউটার সায়েন্স ডিপার্টমেন্ট, ম্যাথমেটিক্যাল মডেলিং-এর মাধ্যমে ইকোলজির নতুন পথে তাত্ত্বিক গবেষণার জন্য। তাঁর এই সাহসী পদক্ষেপের পিছনে আর এক জনের ভূমিকা অনস্বীকার্য— তিনি সুলোচনা, তাঁর গণিতবিদ সহধর্মিণী। ১৯৬৯ সালে হার্ভার্ডের ইতিহাসে প্রথম কোনও জীববিদ কম্পিউটার সায়েন্স ডিপার্টমেন্ট থেকে পিএইচ ডি পেলেন। পিএইচ ডি লাভ করেই হার্ভার্ডের জীববিদ্যা বিভাগে সরাসরি স্থায়ী লেকচারার পদ। এই সময়কালে মাধব গ্যাডগিলের করা গবেষণা আধুনিক ইকোলজির নতুন এক দিগন্ত উন্মোচন করেছিল, এবং গবেষণাপত্রগুলি ক্লাসিক হিসাবে পাঠ্যবইয়ে আজও উল্লিখিত হয়।
সামনে অ্যাকাডেমিক অগ্রগতির উজ্জ্বল দিগন্ত, কিন্তু বছর দুয়েক না কাটতেই মাধব দেশে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, ভারতের অনন্য জীববৈচিত্র আধুনিক ইকোলজির এক লোভনীয় প্রাকৃতিক পরীক্ষাগার, তা ফাঁকা পড়ে আছে। ভারতের প্রকৃতি, বিশেষত পশ্চিমঘাটের সঙ্গে তাঁর আত্মিক টান ও সেখানকার জীববৈচিত্রে ধনী পরিবেশ, যা যে কোনও ইকোলজিস্টের কাছে এক অনন্য প্রাকৃতিক পরীক্ষাগার— তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনে। দেশে ফিরে প্রথমে রাজ্য বিজ্ঞান সংস্থায় সামান্য বিজ্ঞানীর চাকরি, তার পর বেঙ্গালুরুর ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স। সেখানে গবেষণার পাশাপাশি তিনি আধুনিক ইকোলজির বিভিন্ন বিভাগে বিশ্বমানের গবেষণা ও শিক্ষাদানের জন্য সেন্টার ফর ইকোলজিক্যাল স্টাডিজ় (সিইএস) গড়ে তোলেন। প্রতিষ্ঠার এক দশকের মধ্যেই তাঁর নেতৃত্বে এই সেন্টার ভারতীয় উপমহাদেশের সেরা ও বিশ্বের অন্যতম ইকোলজি, হিউম্যান ইকোলজি, অ্যানিম্যাল বিহেভিয়ার ও জীববৈচিত্র সংরক্ষণ ব্যবস্থা সংক্রান্ত গবেষণা ও প্রয়োগের পীঠস্থান হয়ে ওঠে।
ভারতে ফিরে তরুণ ইকোলজিস্টের প্রথম ফিল্ডওয়ার্ক কলেজজীবনের এক বটানির অধ্যাপকের সঙ্গে। মহারাষ্ট্রে পশ্চিমঘাটের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা ‘পবিত্র অরণ্যভূমি’ বা ‘সেক্রেড গ্রোভ’গুলি ভাল ভাবে সমীক্ষা করে মাধব দেখলেন— জীববৈচিত্রে ভরপুর একটি অতি প্রাচীন বনখণ্ডকে স্থানীয় নিরক্ষর গ্রামের মানুষ কী ভাবে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত রেখে দিয়েছে আজও, যেখানে তার চার পাশের অরণ্য গিলে ফেলেছে চাষের খেত বা বনবিভাগের প্ল্যান্টেশন। ক্রমশ তাঁর সামনে স্পষ্ট হল ভারতের জনজাতীয়, প্রান্তিক স্থানীয় মানুষের অরণ্য ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারের পরম্পরা— সুস্থায়ী সংরক্ষণের অপূর্ব নিদর্শন। অন্য দিকে, ঔপনিবেশিক শাসকদের লাগামছাড়া শোষণে রিক্ত দেশের অরণ্যসম্পদ, তাদের উত্তরসূরি স্বাধীন ভারতের বনবিভাগ দেশীয় পরম্পরাকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে মুনাফাভিত্তিক অরণ্য পরিচালনায় ব্যস্ত। উন্নয়নের যে একতরফা শিল্পমুখী পশ্চিমি মডেল স্বাধীন ভারত অনুসরণ করে চলেছে, তা কার্যত পরিবেশ ও নিম্নবর্গ-বিরোধী, অনৈতিক এবং অ-সুস্থায়ী। পরিবেশ ইতিহাসবিদ রামচন্দ্র গুহের সঙ্গে যৌথ ভাবে লেখা দিস ফিশার্ড ল্যান্ড ও ইকোলজি অ্যান্ড একুইটি-র মতো বই এবং তাঁর আত্মজীবনীতে (বাংলায় যা অনূদিত চড়াই পথের চারণিক নামে) মাধব গ্যাডগিল এই মডেল ও পরিবেশ অপশাসনের চরিত্ররূপ একের পর এক গবেষণালব্ধ উদাহরণ দিয়ে সুস্পষ্ট করেছেন।
ভারত সরকারের পরিবেশ ও বন দফতরের এক জন প্রধান স্থপতি মাধব গ্যাডগিল রিয়ো ডি জেনিরো-তে প্রথম আর্থ সামিট থেকে গঠিত রাষ্ট্রপুঞ্জের এনভায়রনমেন্ট প্রোগ্রাম-এর বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির উপদেষ্টা প্যানেলের (ইউএনইপি-এসটিএপি)-এর প্রথম চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর বিজ্ঞান সংক্রান্ত পরামর্শদাতা কমিটি-সহ বহু দেশীয় ও আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ কমিটির অগ্রগণ্য সদস্য। ভারত সরকারের পরিবেশ ও বন দফতর-এর এক প্রধান স্থপতি মাধব গ্যাডগিল নির্ভীক ভাবে সওয়াল করেছেন পরিবেশ ধ্বংসকারী লাগামছাড়া উন্নয়নের বিরুদ্ধে, দাবি করেছেন স্থানীয় ও প্রান্তিক মানুষদের অধিকার ও অংশগ্রহণে ঋদ্ধ পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নয়নের সুস্থায়ী মডেলকে বাস্তবে প্রয়োগের জন্য।
কিন্তু, তাঁর বেশির ভাগ প্রচেষ্টাই ব্যর্থ করে দিতে ঝাঁপিয়ে পড়েছে মুনাফালোভী ব্যবসায়িক চক্র, সুবিধাভোগী উচ্চবর্গ, অসৎ প্রশাসক ও রাজনীতিকদের আঁতাঁত। ২০১০ সালে পশ্চিমঘাটে অর্থনৈতিক উন্নয়নের উদ্দেশ্যে প্রস্তাবিত শিল্প প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষেত্রে সরকারকে পরিবেশবান্ধব নীতি প্রণয়নের জন্য সুনির্দিষ্ট পরামর্শ দিতে গঠিত হয় পশ্চিমঘাট পরিবেশ বিশেষজ্ঞ প্যানেল (ডব্লিউজিইইপি)। সভাপতির দায়িত্ব নেন মাধব গ্যাডগিল। এই প্যানেলের প্রতিবেদন— যা ‘গ্যাডগিল রিপোর্ট’ নামে পরিচিত, যে সব পরামর্শ ও প্রস্তাব দিয়েছিল, তার মধ্যে প্রধান ছিল— তাদের কমিটি দ্বারা ‘পরিবেশগত ভাবে সংবেদনশীল’ বলে চিহ্নিত অঞ্চলগুলিকে সম্পূর্ণ সংরক্ষিত রাখা, এবং অন্যত্র কোনও বৃহৎ প্রকল্পের অনুমতি দান ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে স্থানীয় মানুষের সিদ্ধান্তকে আইনসিদ্ধ করা। এই রিপোর্টেই গ্যাডগিল কেরলে সম্ভাব্য বিপর্যয়ের ব্যাপারে সতর্ক করেছিলেন। প্রত্যাশিত ভাবেই এই রিপোর্ট প্রবল প্রতিরোধের মুখে পড়ে, কারণ তা প্রচলিত উন্নয়ন মডেলের পিছনে থাকা শক্তিশালী উচ্চবর্গের অর্থনৈতিক স্বার্থকে সরাসরি প্রশ্নের মুখে ফেলে দিত। গ্যাডগিল রিপোর্ট বাতিল করে কেন্দ্রীয় সরকার অন্তরিক্ষ বিজ্ঞানী কস্তুরিরঙ্গন-এর নেতৃত্বে নতুন করে রিপোর্ট করায় ও সেই রিপোর্ট গৃহীত হয়। বলা বাহুল্য, তাতে গ্যাডগিল কমিটির পরামর্শগুলিকে যতটা সম্ভব লঘু করে, অকেজো করে দেওয়া হয়েছিল।
আজ যখন উত্তরে হিমালয় থেকে দক্ষিণে গ্রেট আন্দামান দ্বীপ, পশ্চিমে আরাবল্লী থেকে পূর্বের অরুণাচল পর্যন্ত উন্নয়নের গ্রাসে ধ্বংস হচ্ছে অরণ্য, অরণ্যনির্ভর মানুষ ও তাঁদের মাটি-জল-হাওয়া, সেই ক্রান্তিকালে গত ৭ জানুয়ারি চির অবসর নিতে বাধ্য হলেন ভারতের আধুনিক ইকোলজি ও সংরক্ষণ-বিজ্ঞানের এই অগ্রপথিক।
জীববিদ্যা বিভাগ, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিশ্ববিদ্যালয়
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)