E-Paper

শুধু উপভোক্তা নন

আজ সেই রাজনীতিরও বিদায়-ঘণ্টা বেজে গিয়েছে। অপারেশন বর্গা, ভূমি সংস্কার এবং পঞ্চায়েত ব্যবস্থার মাধ্যমে বাম ফ্রন্ট গ্রামীণ বাংলাকে বদলে দিয়েছিল।

সোহম ভট্টাচার্য

শেষ আপডেট: ২২ জুন ২০২৬ ০৬:৫১
প্রশ্ন: বহরমপুরে পঞ্চায়েত সদস্যের বাড়ির সামনে ‘কাটমানি’ ফেরতের দাবিতে স্থানীয়দের বিক্ষোভ

প্রশ্ন: বহরমপুরে পঞ্চায়েত সদস্যের বাড়ির সামনে ‘কাটমানি’ ফেরতের দাবিতে স্থানীয়দের বিক্ষোভ

২০১৬ সালের গ্রীষ্ম। হুগলির এক গ্রামীণ পঞ্চায়েত অফিসের সামনে কয়েক জন প্রবীণ বামপন্থী কর্মী মুখ কালো করে দাঁড়িয়ে। সাদা এসইউভি থেকে তৃণমূলের যুবকেরা চালের বস্তা আর টাকার খাম নামাচ্ছেন। এক জন হেসে বললেন, “দিদি পাঠিয়েছেন।” দৃশ্যটি নিছক ক্ষমতা বদলের ছিল না। গ্রামবাংলার রাজনৈতিক ভাষা বদলেরও ছিল। ১৯৭৭ সাল থেকে যে লাল পতাকা মাঠঘাট, পঞ্চায়েত, সমবায় এবং স্থানীয় সমাজজীবনের উপর এক ধরনের নৈতিক কর্তৃত্ব বিস্তার করেছিল, এই মুহূর্ত তার সমাপ্তির সূচক। তার জায়গায় প্রতিষ্ঠিত হল এমন এক রাজনীতি, যা আদর্শের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয় পৃষ্ঠপোষকতাকে, সংগঠনের চেয়ে নেতৃত্বকে এবং রাজনৈতিক ভাষ্যের চেয়ে তাৎক্ষণিক সুরাহাকে।

আজ সেই রাজনীতিরও বিদায়-ঘণ্টা বেজে গিয়েছে। অপারেশন বর্গা, ভূমি সংস্কার এবং পঞ্চায়েত ব্যবস্থার মাধ্যমে বাম ফ্রন্ট গ্রামীণ বাংলাকে বদলে দিয়েছিল। মধ্য ও নিম্নবর্গের কৃষকসমাজ প্রথম বার রাষ্ট্রের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সম্পর্ক তৈরি করেছিল। কিন্তু সেই সাফল্যের ভিতরেই জমতে শুরু করেছিল ভবিষ্যতের সঙ্কট। কৃষির বৃদ্ধি থমকে গেল, উৎপাদন খরচ বাড়ল, বাজার অস্থির হল। ১৯৯১-পরবর্তী উদারীকরণের অভিঘাতে গ্রামবাংলার যুবকেরা কাজের সন্ধানে দূর শহরে পাড়ি দিতে শুরু করল। নতুন শব্দ এল— পরিযায়ী শ্রমিক। গ্রামীণ সমাজের প্রান্তিকতার সঙ্গে রাষ্ট্রের দূরত্বও বাড়তে থাকল। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বাম ফ্রন্টের ক্যাডারভিত্তিক কাঠামোকে ক্রমশ অনমনীয় বলে মনে হতে থাকে মানুষের।

গ্রামের মানুষ তখন এমন নেতৃত্ব চাইছিল, যে তাদের ভাষায় কথা বলবে এবং তাদের ক্ষোভকে সরাসরি উচ্চারণ করবে। তৃণমূল কংগ্রেস এই কথাটি দ্রুত বুঝেছিল। সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামের আন্দোলন সেই রাজনৈতিক সম্ভাবনাকে বিস্ফারিত করে। ২০১১ সালে ক্ষমতায় আসার পর এবং বিশেষত ২০১৬ সালের মধ্যে তৃণমূল গ্রামবাংলায় এক নতুন রাজনৈতিক মডেল গড়ে তোলে— উপরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্যারিশম্যাটিক নেতৃত্ব, নীচে বাস্তববাদী ও লেনদেন-নির্ভর স্থানীয় ক্ষমতাকাঠামো। প্রথম দিকে এই মডেল বেশ কার্যকরও ছিল।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই কাঠামোর মধ্যেই জন্ম নেয় নতুন এক সামাজিক গোষ্ঠী। ২০১৬ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থীদের মধ্যে ‘ব্যবসায়ী’ পরিচয়ের উপস্থিতি ক্রমাগত বেড়েছে। এঁরা মূলত স্থানীয় রাজনৈতিক অর্থনীতির উদ্যোক্তা— রাস্তার কনট্র্যাক্ট, বালি, পরিবহণ, জমি, সরবরাহ, সরকারি প্রকল্প এবং প্রশাসনিক মধ্যস্থতার সঙ্গে যুক্ত মানুষ। রাজনীতি তাঁদের কাছে শুধু ক্ষমতার পথ নয়, সম্পদ সঞ্চয়েরও পথ।

অধ্যাপক দ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য এই মডেলটিকে বলেছেন ‘ফ্র্যাঞ্চাইজ়ি পলিটিক্স’। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক ব্র্যান্ডের অধীনে স্থানীয় নেতারা কার্যত ফ্র্যাঞ্চাইজ়ির মতো কাজ করতেন। পঞ্চায়েত, সমবায়, সরকারি প্রকল্প এবং কল্যাণমূলক কর্মসূচির উপর তাঁদের নিয়ন্ত্রণ ছিল। বিনিময়ে তাঁদের দায়িত্ব ছিল ভোট, আনুগত্য এবং রাজনৈতিক স্থিতি নিশ্চিত করা। ফলে রাজনীতি, ব্যবসা এবং সামাজিক কর্তৃত্ব এক অদ্ভুত মিশ্রণে পরিণত হয়। বহু জায়গায় এই স্থানীয় নেতারাই হয়ে ওঠেন সরকারি সুবিধা পাওয়া বা না-পাওয়ার নির্ধারক। টিউবওয়েল চাই? বিধবা ভাতা চাই? রাস্তা চাই? সরকারি প্রকল্পে নাম তুলতে হবে? সমাধান: ‘দাদাকে বলো’। যে রাজনীতি পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা ক্রমে পৃষ্ঠপোষকতার অর্থনীতির ব্যবস্থাপক হয়ে ওঠে। ‘কাট-মানি’ শব্দটি জনজীবনের ভাষায় ঢুকে পড়ে; সর্বত্র সিন্ডিকেট সংস্কৃতি সর্বব্যাপী হয়।

ফ্র্যাঞ্চাইজ়ি মডেলকে টিকিয়ে রাখতে স্থানীয় ক্ষমতাকেন্দ্রগুলির অর্থনৈতিক শক্তি হয়ে ওঠার প্রয়োজন ছিল। সেই শক্তির উৎসই ছিল এই নিয়মমাফিক আহরণ। বহু মানুষ দীর্ঘ দিন পর্যন্ত তা মেনেও নিয়েছিলেন— “চুরি করে, কিন্তু কাজটুকুও করে।” কিন্তু এই সমঝোতারও সীমা আছে। যখন শোষণ দৃশ্যমান হয়ে ওঠে, তখন তার বৈধতা হ্রাস পেতে শুরু করে। ২০১৯ সালের পর গ্রামবাংলার চায়ের দোকান, হাট-বাজার ও আড্ডায় অসন্তোষ প্রকাশ্য হতে থাকে। মানুষের অভিযোগ ছিল, সরকারি সুবিধা পৌঁছনোর আগেই কমিশন কেটে নেওয়া হয়। তৃণমূলের বিরুদ্ধে দু’টি অভিযোগ ক্রমাগত সামনে আসে— দুর্নীতি এবং বেকারত্ব। প্রথমটি দরিদ্রদের বিচ্ছিন্ন করেছে, দ্বিতীয়টি যুবকদের ক্ষুব্ধ করেছে।

এই সঙ্কটের মুখে তৃণমূল নেতৃত্ব তাঁদের ভিত্তিপ্রস্তরস্বরূপ আঞ্চলিক রাজনৈতিক স্তরটিকে বদলানোর বদলে প্রযুক্তিগত সমাধানের দিকে ঝুঁকলেন। আই-প্যাকের মতো পেশাদার পরামর্শদাতা সংস্থার সাহায্যে শুরু হল প্রশাসনিক কেন্দ্রীয়করণ। ‘দুয়ারে সরকার’ শিবির সরকারি পরিষেবা সরাসরি পৌঁছে দিতে শুরু করল। সরকারি কর্মচারীরা তালিকা নিয়ে গ্রামে গেলেন। সরকারি উন্নয়নপ্রকল্প দলের স্থানীয় নেতৃত্বকে এড়িয়ে প্রশাসনের মাধ্যমে মানুষের কাছে সরাসরি পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। যা শুরু হয়েছিল বিকেন্দ্রীভূত ফ্র্যাঞ্চাইজ়ি রাজনীতি হিসাবে, তা ধীরে ধীরে রূপ নিল এক ধরনের ‘টেকনো-পপুলিস্ট’ কেন্দ্রীকরণে। স্থানীয় নেতা আর আগের মতো অপরিহার্য থাকলেন না। গ্রামের মানুষ সরাসরি প্রশাসনিক তালিকায় নিজেদের নাম খুঁজতে শুরু করলেন।

কিন্তু এই পরিবর্তন মৌলিক সঙ্কট দূর করতে পারেনি। শিল্প নেই, কৃষি-সঙ্কট বহাল, কর্মসংস্থান সীমিত, যুবকেরা এখনও বাইরে যাচ্ছে। লক্ষ্মীর ভান্ডার, কন্যাশ্রী, স্বাস্থ্যসাথী, পাড়ায় সমাধান— একের পর এক প্রকল্প মানুষের জীবনে বাস্তব স্বস্তি এনেছে, সন্দেহ নেই। কিন্তু অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের বিকল্প হয়ে ওঠেনি। অন্য দিকে, এক জন মানুষের পরিচয়ের বিভিন্নতা— হয়তো তিনি কোনও কৃষক পরিবারের সদস্য, কোনও তফসিলি জাতির অংশ, সামাজিক উৎসবের সংগঠক— দেখতে ক্রমশ ভুলে গেল রাষ্ট্রব্যবস্থা। তার চোখে সেই নাগরিক শুধুই ‘উপভোক্তা’।রাষ্ট্রের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক সামাজিকের চেয়ে প্রশাসনিক ও ব্যক্তিগত হয়ে উঠল। মানুষকে সর্বাঙ্গীণ নাগরিক হিসাবে নয়, কল্যাণভোগী হিসাবে চিহ্নিত করা হল। ব্যক্তিকেন্দ্রিক নব্যউদার অর্থনীতির অনিবার্য পরিণতি। এই শূন্যতা শুধু অর্থনৈতিক নয়, সাংস্কৃতিকও। বাংলার ভদ্রলোক সমাজ দীর্ঘ দিন ধরে নিজেকে উদার ও প্রগতিশীল বলে কল্পনা করেছে। কিন্তু গ্রামীণ প্রান্তিকতার সঙ্গে তার দূরত্বও কম ছিল না। বহু ক্ষেত্রে মুসলিম, মতুয়া, কুর্মি বা অন্যান্য প্রান্তিক গোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা মূলধারার সাংস্কৃতিক কল্পনায় জায়গা পায়নি। কল্যাণমূলক সুবিধা পাওয়া আর সামাজিক স্বীকৃতি পাওয়া এক জিনিস নয়।

এখানেই আরএসএস-বিজেপি একটি সুযোগ দেখতে পায়। তারা শুধু ভোট চায়নি; পরিচয়ের অন্য স্তরেও আবেদন জানিয়েছে। শাখা, সাংস্কৃতিক নেটওয়ার্ক, ধর্মীয় পরিসর, এমনকি ওয়টস্যাপ গোষ্ঠীর মাধ্যমে তারা এমন এক শূন্যতায় প্রবেশ করেছে, যা কেবল নগদ হস্তান্তর দিয়ে পূরণ করা সম্ভব ছিল না। এটি ‘প্যাসিভ রেভলিউশন’-এর নতুন পর্যায়। উপর থেকে সংস্কারের মাধ্যমে সম্ভাব্য প্রতিবাদী শক্তিকে ধীরে ধীরে শোষণ করে নেওয়া। নয়া-উদারবাদের সঙ্কট প্রায়শই নয়া-ফ্যাসিবাদী রাজনীতির ক্ষেত্র প্রস্তুত করে। বাংলার অভিজ্ঞতা সেই যুক্তিকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।

লাল পতাকার যুগ শেষ হয়েছে। পৃষ্ঠপোষকতার সবুজ রাজনীতিও ক্লান্ত। সামনে যে গেরুয়া উত্থান দেখা যাচ্ছে, তা কেবল নির্বাচনী ঘটনা নয়; দীর্ঘ সামাজিক পুনর্গঠনের ফল। এই কারণেই প্রগতিশীল শক্তিগুলির সামনে প্রশ্নটি শুধু সাংবিধানিক বা আইনি লড়াইয়ের নয়। শুধু সাম্প্রদায়িকতার সমালোচনা করলেই আর চলবে না। গ্রামবাংলার যে সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তার বিকল্প নির্মাণও জরুরি। সহিষ্ণু হওয়ার পাশাপাশি সহমর্মী ও সহযোগী না হতে পারলে অপরায়ণের রাজনীতির বিরুদ্ধাচরণ অসম্ভব।

কারণ, শেষ পর্যন্ত রাজনীতি কেবল ক্ষমতার লড়াই নয়। মানুষকে কে দেখে, কে শোনে, কে স্বীকৃতি দেয়— তারও লড়াই। বহু দিন ধরে বাংলার প্রান্তিক মানুষ সেই স্বীকৃতির অপেক্ষায় আছে। তাদের কণ্ঠস্বর যদি নতুন করে শোনা না যায়, তা হলে রাজনীতির ভবিষ্যৎ অন্য কেউ লিখে দেবে।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

government projects Rural Area

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy