• উর্বা চৌধুরী
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টিতে সরকারি ফাঁকি ও চরম উদাসীনতা

এই বিরাট অধর্ম সইবে তো

children

আজ দুপুরে কী খাবার? হইহই উত্তর: ডিম। সরকারি স্কুলের বাচ্চাদের মনের ও শরীরের মিড-ডে মিলের প্রত্যাশা নিয়ে বিতণ্ডার সুযোগ নেই। বিশ্ব ক্ষুধা সূচকের তালিকা থেকেই তা বোঝা যায়। এমতাবস্থায় শুরু হল লকডাউন। সরকারের মতি যে সুবিধের নয়, তার অজস্র অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও ধৈর্য রাখা জরুরি ছিল। তবে ধৈর্যেরও ব্যাকরণ থাকে। চার মাস পেরিয়ে যাওয়ার পরও দেখা গেল, সরকার আটপৌরে কাজেও গাফিলতি করছে। কেন্দ্রের সরকারের একমাত্র কাজ তো প্রলাপ বকা। রাজ্য সরকারগুলি যে যার মতো করছে। কিন্তু তাদেরও অগ্রাধিকারের তালিকায় শিশুরা যেন হারিয়ে গিয়েছে। যেমন, এ রাজ্যে কুকড মিড-ডে মিল প্রোগ্রামে প্রথম সাড়ে চার মাসে মাথা পিছু মোট ৯ কিলো চাল, ৯ কিলো আলু, ২৫০ গ্রাম মুসুর ডাল এবং ৫০ মিলিলিটার স্যানিটাইজার সরকারি স্কুলের বাচ্চাদের মধ্যে বিলি করা হয়েছে। মিড-ডে মিলে আনাজপাতি, ডিম ও জ্বালানির খরচ আসত দফতর থেকে। লকডাউনে জ্বালানির খরচ নেই। আশা করেছিলাম, বেঁচে যাওয়া খরচটুকু যোগ হয়ে বাচ্চাদের মধ্যে বিলি করা খাবারের পরিমাণ বাড়বে। প্রথম তিন দফায় সেটুকু যোগ তো হলই না, বরং মটর-মুসুর-আনাজ-সোয়াবিন-বড়ি-ডিম-তেল-মশলার খরচ মাসিক স্রেফ ২ কিলো আলুতে বিলীন হয়ে গেল! চতুর্থ দফায় ২৫০ গ্রাম মুসুর ডাল আর ৫০ মিলিলিটার স্যানিটাইজার বিলি হলেও মানুষের টাকা আর বাচ্চাদের অধিকারের অঙ্ক মোটেই মেলেনি। আর মেলে না বলেই ভারতকে বিশ্ব ক্ষুধা তালিকায় ১১৯টি দেশের মধ্যে ১০২ নম্বরে বসতে হয়। তবে ঘটে যাওয়া এই ত্রুটি সংশোধনের সুযোগ এখনও রয়েছে। সত্বর সরকারের তরফে গত চার মাসে ফাঁকি পড়া মূল্যের খাদ্যসামগ্রী বাচ্চাদের দেওয়ার এবং ভবিষ্যতেও যাতে বণ্টনে কোনও ফাঁকি না থাকে, তা সুনিশ্চিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া খুব জরুরি।  

তেমনই জরুরি বিদ্যালয় শিক্ষার ক্ষেত্রে সরকারি ফাঁকিটা অবিলম্বে দূর করা। সরকারের তরফে এখনও সর্বজনীন কোনও দিক-নির্দেশ আসেনি। হিড়িক উঠেছে অনলাইন ক্লাসের। মূলত বেসরকারি স্কুলে চলছে অনলাইন ক্লাস, লকডাউনের গোড়া থেকেই। সরকারি স্কুলে যে বাচ্চারা পড়ে, তাদের অধিকাংশই সম্বৎসর নানা সঙ্কটে থাকে। বেসরকারি আর সরকারি স্কুলের বৈপরীত্য নিয়ে এখানে কিছু বলার নেই। কিন্তু অনলাইন ক্লাসের উদ্‌যাপন দেখে আশঙ্কা হচ্ছে, অভিভাবকদের আর্থিক সামর্থ্যে চলা বেসরকারি স্কুলের মতো সরকারি স্কুলও কি কালে-কালে সেখানকার অভিভাবকদের আর্থিক সঙ্গতির মুখ চেয়েই চলবে? এ রাজ্যে সরকারের তরফে অনলাইন ক্লাসের জন্য লিখিত নির্দেশ চোখে পড়েনি, চোখে পড়ল সাধারণ ফোনে স্কুলের পাঠ শুরু হওয়ার ঘোষণা। সাধারণ ফোনের অভাবে মিড-ডে মিলের খাবার বিলির খবর বহু জনকে দেওয়া নিয়েই সমস্যা হয়েছে। তা হলে তাতে সবার জন্য ক্লাস হবে কেমন করে? সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বৈষম্য ছাড়পত্র পাবে? ‘প্রাজ্ঞতা’ নামের রঙচঙে গাইডলাইন ছেপেছে কেন্দ্রের মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রক— কেমন করে অনলাইন, সাধারণ ফোন বা টেলিভশন-রেডিয়ো মারফত ক্লাস নিতে হবে, তার গাইডলাইন (‘প্রাজ্ঞতা’ শব্দটা অভিধানে খুঁজতে যাবেন না, কারণ ওটি নেই!)। গাইডলাইনে গাম্ভীর্যের সঙ্গে লেখা, ভারত ছ’টি ক্যাটিগোরির গেরস্থালির ছ’নম্বরটি হল ‘হাউসহোল্ড উইথ নো ডিজিটাল ডিভাইস’। টেলিভিশন, রেডিয়ো, সাধারণ ফোন কিছু জোগাড় করতে না পারা এই বাচ্চাদের শিক্ষার উপায় প্রসঙ্গে একটি শব্দও লেখা নেই। শিক্ষা প্রসঙ্গে এই দরিদ্র বাচ্চাদের দিকে আঙুল দেখিয়ে সরকার তা হলে কী বলল? সৎ নীতি নির্ধারণ শুরু হওয়ার কথা সবচেয়ে বিপন্নদের দিকে তাকিয়ে, সেই শ্রেণিকে শেষে ঠেলে দিয়ে নয়, বরং এক নম্বরে রেখে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে ‘কিছু একটা তো হল’ সংস্কৃতিকে চ্যাম্পিয়ন বানিয়ে তৈরি হল ‘ডিজিটাল ডিভাইড’। এ কেমন সরকার? নির্বুদ্ধিতা না দুর্বুদ্ধি? শাসক দলগুলি ‘মূল্যবোধ’কে সূক্ষ্ম তত্ত্ব বানিয়ে ফেলছে। কিন্তু ন্যায্য বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়াই বেশির ভাগ বাচ্চাকে ফেলে রেখে এগিয়ে যাওয়া কি ২০০৯ সালের সব শিশুর বিনা ব্যায়ে বাধ্যতামূলক শিক্ষার অধিকার আইনটিও মঞ্জুর করে? বাচ্চার ও  মায়েদের একাধিক আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটেছে, এই বৈষম্যের চাপ সহ্য না করতে পেরে।

অথচ আমরা এমন কিছু নিরুপায় নই, যদি লোকসমুদয়কে যোগ্য মর্যাদা দিই। এ জন্য অগ্রাধিকারের প্রশ্নে দরকার সমাজের চিরায়ত পিরামিডটিকে উল্টে দেওয়া। এতে যে উপায় উদ্ভাবিত হতে পারে, তাতে প্রত্যেকটি বাচ্চাই শিক্ষার সুযোগ পেতে পারে। প্রতিষ্ঠানের সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে, স্বাস্থ্যবিধি মেনে সমুদয়কে কী ভাবে ব্যবহার করতে হয়, সে বুদ্ধি রয়েছে শিক্ষকদের মস্তিষ্কে, যা কেবল প্রযুক্তিনির্ভর নয়, বিজ্ঞাননির্ভর। যদি নিষ্ঠার সঙ্গে রাজ্যের হাজার হাজার শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনা করা হত, নিজেদের তাগিদেই তাঁরা উপায় খুঁজে বার করতেন, কেমন করে প্রতিটি বাচ্চার কাছে শিক্ষাকে পৌঁছে দেওয়া যাবে। এখনও ‘হাউসহোল্ড উইথ নো ডিজিটাল ডিভাইস’-এর বাচ্চারা হয়তো স্কুলুছুট হওয়ার মতো কোনও চরম সিদ্ধান্ত নেয়নি, শিশুশ্রমের বাঁধভাঙা বন্যা হয়তো এখনও ঠেকানো যায়। তার জন্য প্রয়োজন শিক্ষকদের কাণ্ডজ্ঞান ও আবেগের সহযোগিতায় অঞ্চলভিত্তিক পরিকল্পনা করা। শিক্ষা দফতরের বিকেন্দ্রীকৃত গঠন ও শ্রমশক্তি দিয়ে কাজে যথেষ্ট গতি আনলে পরিকল্পনা শেষ করে কাজে নেমে পড়তে বড়জোর ১৫ দিন লাগা উচিত। কারণ যে শিক্ষকেরা সবচেয়ে বিপন্ন বাচ্চাদের সঙ্গে কাজ করে অভ্যস্ত, সঙ্কটে তাঁদের মাথা চলে জোর গতিতে। এখনও শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনা করলে, সরকারকে হয়তো বহু বাচ্চার স্কুলছুট হওয়ার প্রধান কারণ হয়ে উঠতে হবে না।

বাচ্চাদের স্বাস্থ্যের ব্যাপারে উঠে আসছে মারাত্মক এক চিত্র। দেড় মাসের উপর সদ্যোজাত ও পাঁচ বছরের নীচের শিশুদের টিকাকরণ প্রক্রিয়া বন্ধ রাখা হয়েছিল গোটা দেশে। এই গোটা সময়ে যারা পোলিয়ো, হাম, হেপাটাইটিস-বি, মেনিনজাইটিসের মতো রোগের টিকাকরণ থেকে বাদ পড়ল, তাদের প্রজন্মের ভবিষ্যৎ ঠিক কতটা বিপর্যস্ত হতে পারে, তা এখনও নিশ্চিত ভাবে বলা যাচ্ছে না। ল্যানসেট-এ প্রকাশিত দু’মাস আগের একটি লেখায় জানা যাচ্ছে, উক্ত সময় অবধি এ দেশে মাম্পস, হাম, রুবেলা টিকাকরণের পরিমাণ কমেছে ৬৯ শতাংশ। এমনকি, স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে প্রসবের পরিমাণ কমেছে ২১ শতাংশ। ‘মাতৃ যান’ বা ‘নিশ্চয় যান’-এর মতো সরকারি ব্যবস্থা তো ছিল গর্ভবতী মায়েদের স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে নিয়ে গিয়ে প্রসবের কাজটি সেখানে করানোর জন্য, তবু আটকাল কেন সেই কাজ? যে শিশু ভূমিষ্ঠ হবে ও হয়েছে, যে মহিলা প্রসবসম্ভবা, তিনি ও তাঁর সন্তানের স্বাস্থ্য, বেঁচে থাকা বিপন্নতার মধ্যে রয়েছে। ক্ষতি হয়ে গিয়েছে অপূরণীয়, কিন্তু শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্যের কাজে আর যেন বিন্দুমাত্র ফাঁকি না হয়, তা দেখাটা জরুরি।  

“ধারণা যখন অস্পষ্ট ও দুর্বল থাকে তখন উদ্ভাবনাশক্তির আশা করা যায় না। এমনকি তখনকার উদ্ভাবনা অবাস্তবিক অদ্ভুত আকার ধারণ করে”— কেন্দ্র ও রাজ্যের সরকারগুলো বোধ করি রবীন্দ্রনাথের এই কথাকেই ফের প্রমাণ করছে। বড় বেশি মাসুল গুনতে হচ্ছে কোটি কোটি অসহায় শিশুকে। 

জোরালো বিরুদ্ধতা ছাড়া ভীষণ ওজনের এই অধর্ম দূর করা সম্ভব নয়। বঞ্চিতদের সঙ্গে সভ্য সমাজের অন্যান্যরা যদি এই বিরোধ সংগঠনে এগিয়ে না আসেন, তা হলে তা কার্যত সমাজের অসভ্যতার মাত্রাটিকেই দেখিয়ে দেয়।

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন