Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

১৯ জানুয়ারি ২০২২ ই-পেপার

বিদ্রোহীদের ‘হিন্দুস্তান’-এ হিন্দু ছিল, মুসলিমও

শেখর বন্দ্যোপাধ্যায়
০২ জুন ২০১৭ ১১:০০

গত ১০ মে আমরা ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের সূচনার ১৬০ বছর উদ্‌যাপন করলাম। দেশে এখন জাতীয়তাবাদের যে জোয়ার বইছে, তার প্রেক্ষিতে এই ঐতিহাসিক ঘটনাকে কী ভাবে বুঝব, এই উপলক্ষে সেটা একটু খতিয়ে দেখা যেতে পারে। ১৯০৯ সালে বীর সাভারকর প্রথম এই বিদ্রোহকে ভারতের জাতীয়তাবাদী ইতিহাসে স্থান করে দেন, একে স্বাধীনতা আন্দোলন বলে চিহ্নিত করেন। অবশ্য ‘প্রথম’ কথাটি তাঁর মূল প্রবন্ধের শিরোনামে ছিল না, পরে সংযোজিত। বিদ্রোহের ১৫০ বর্ষ পূর্তি উপলক্ষে ভারত সরকার একে ভারতের প্রথম স্বাধীনতা আন্দোলন বলে সরকারি ভাবে ঘোষণা করে, যদিও সে ঘোষণা বিতর্কমুক্ত ছিল না।

এই মহাবিদ্রোহ কি সত্যিই ভারতের প্রথম স্বাধীনতা আন্দোলন? ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের জন্মলগ্ন থেকেই তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে আন্দোলন হয়েছে। ১৮৫৭-র আগে সেনাবাহিনীর মধ্যেও বিদ্রোহ দেখা গিয়েছে। কিন্তু সেগুলি ছিল এই শাসনের নানাবিধ অত্যাচার বা বিশেষ কোনও পীড়নমূলক নীতির বিরুদ্ধে, ক্ষুদ্র এলাকায় সীমাবদ্ধ। বিদেশি শাসনের অবসান ঘটানোর সুস্পষ্ট উদ্দেশ্য এই আন্দোলনগুলির মধ্যে দেখি না। প্রথম ১৮৫৭ সালেই আমরা দেখলাম উত্তর ও মধ্য ভারতের এক বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে কোম্পানির শাসনের অবসানের জন্য ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন হল। সেই অর্থে হয়তো একে প্রথম স্বাধীনতার জন্য লড়াই বলা যেতে পারে। কিন্তু মনে রাখা দরকার, সারা ভারত এতে শামিল হয়নি। পূর্ব ও দক্ষিণ ভারত অপেক্ষাকৃত শান্ত ছিল, আর পঞ্জাবের লোকরা তো রীতিমত ব্রিটিশদের সাহায্য করেছিল বিদ্রোহ দমনে।

আর একটা প্রশ্ন হল, কী কারণে এই মহাবিদ্রোহ দেখা দিল? ঐতিহাসিকরা মনে করেন, সামগ্রিক ভাবে কোম্পানির অপশাসনের বিরুদ্ধে একটা অভিযোগের সুর, আর খ্রিস্টীয় ধর্মপ্রচারকদের সম্পর্কে সন্দেহ সমাজের সর্বস্তরে বিদ্যমান ছিল। কিন্তু বিদ্রোহের প্রেরণা জুগিয়েছে বিশেষ বিশেষ শ্রেণি ও সম্প্রদায়ের বিশেষ ধরনের অভিযোগ ও অসন্তোষ। প্রথমে এই আন্দোলন শুরু হয় বেঙ্গল আর্মিতে সিপাহি বিদ্রোহ হিসেবে। চাকরির শর্ত ও নিয়মকানুন নিয়ে সিপাহিদের অসন্তোষ বাড়ছিল সেই ১৮৩০-এর দশক থেকেই। তার সঙ্গে ছিল ধর্মান্তরকরণ সম্বন্ধে একটা সন্দেহ। তাই নতুন এনফিল্ড রাইফেল-এর টোটায় গরু ও শূকরের চর্বি মেশানোর খবরটা তাদের বিদ্রোহী করে তোলে।

Advertisement

অন্য দিকে এই সিপাহিদের সঙ্গে নিবিড় সামাজিক যোগাযোগ ছিল কৃষিসমাজের। যে সমাজ কোম্পানি সরকারকে উচ্চহারে ভূমিরাজস্ব দিতে গিয়ে নাজেহাল হয়ে পড়েছিল ইতিমধ্যেই। জমিদার-তালুকদারের মতো সামন্ত শ্রেণিও তাদের ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি হারিয়ে অসন্তুষ্ট হয়ে ছিল। লর্ড ডালহাউসি তাঁর স্বত্ববিলোপ নীতি দিয়ে অপুত্রক দেশীয় রাজন্যবর্গের দত্তকপুত্র নেওয়ার অধিকার কেড়ে নিয়ে তাঁদের রাজপাট বাজেয়াপ্ত করেন। কাজেই ১৮৫৭ সালের ১০ মে মেরঠ ক্যান্টনমেন্টে যে বিদ্রোহ শুরু হয়েছিল, সেটা অতি দ্রুত বড় আকার নিতে দেরি করেনি, কারণ তাতে যোগ দেয় গ্রামীণ সমাজের এক বিরাট অংশ।

আর একটা কথা। ওই বিদ্রোহে সরকার ও বিদ্রোহী দুই পক্ষই হিংসার আশ্রয় নেয় বেশ ব্যাপক ভাবে। হৃদয়হীন, নির্বিচার হিংসা। বিদ্রোহীরা নারী-শিশু নির্বিচারে অসামরিক শ্বেতাঙ্গদের হত্যা করে। তবে বিদ্রোহীদের এই নির্বিচার হত্যার নৈতিকতার বিচার করার আগে মনে রাখা উচিত ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তির দিকে। ইতিহাসবিদ রুদ্রাংশু মুখোপাধ্যায় দেখিয়েছেন এত দিন পর্যন্ত হিংসাত্মক আচরণের একচেটিয়া অধিকার ছিল ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের। এই বার প্রজারাও পাল্টা হিংসার মধ্যে দিয়ে তা ফিরিয়ে দিল। প্রতিশোধে ব্রিটিশরাও গ্রামকে গ্রাম পুড়িয়ে দেয়, কামানের গোলায় উড়িয়ে দেয় বিদ্রোহীদের দেহ, নির্দয় হাতে দমন করা হয় বিদ্রোহ।

পরবর্তী কালে সাভারকরের সময় থেকেই এই মহাবিদ্রোহকে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের ইতিহাসে প্রতিস্থাপিত করার চেষ্টা শুরু হয়। ইদানীং কালে তা আরও বেড়েছে। আনুমানিক দশটা চলচ্চিত্র তৈরি হয়েছে এ নিয়ে। এই কাহিনিকে কাজে লাগিয়ে জাতীয়তাবাদী আবেগ সৃষ্টির চেষ্টা হচ্ছে। লোকসভায় বক্তৃতা দেওয়া হয়েছে এই মর্মে। জাতীয়তাবাদ সব সময়ই ইতিহাসকে কাজে লাগায়। কিন্তু এই বিদ্রোহকে জাতীয়তাবাদী আখ্যা দেওয়ার আগে মনে রাখা দরকার, ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটিয়ে কোনও ভারতীয় জাতীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক চিন্তা-ভাবনা বিদ্রোহীদের মধ্যে ছিল না। তাঁদের অনেকেই ফিরে যেতে চেয়েছিলেন বিকেন্দ্রীভূত মুঘল রাষ্ট্রব্যবস্থায়।

কিন্তু আধুনিক জাতীয়তাবাদ না থাকলে কী ধরনের আদর্শবাদ বিদ্রোহীদের প্রেরণা জাগাল? সাভারকর মনে করেছিলেন যে বিদ্রোহীরা লড়ছেন ‘স্বরাজ্য’ ও ‘স্বধর্ম’-এর জন্য। অনেক আধুনিক ইতিহাসবিদ মনে করেন তাঁরা যুদ্ধ করেছিলেন ‘দীন’ (বিশ্বাস) ও ‘ধর্ম’-এর জন্য, যা তাঁদের মতে বিদেশি রাষ্ট্রের অনুপ্রবেশ ও শাসনের ফলে বিঘ্নিত হয়েছিল। অর্থাৎ, এই বিরোধে ধর্মের এক বিরাট ভূমিকা নিশ্চয়ই ছিল। ভারতীয় জনজীবন যে ধর্মকে বাদ দিয়ে সংগঠিত করা যাবে না, এই বিদ্রোহ তার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়। সেই অর্থে এই বিদ্রোহ পশ্চিমি সেকুলার রাজনীতির ধারণার সঙ্গে খাপ খাবে না।

কিন্তু এই ধর্মীয় সমীকরণের আর একটি উল্লেখযোগ্য বিশেষত্ব ছিল। ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহীরা লড়াই করেছিলেন পূর্বসূরিদের শাসনক্ষেত্রকে ফিরিয়ে আনার জন্য, যে শাসনক্ষেত্রের ভৌগোলিক পরিচয় ছিল ‘হিন্দুস্তান’। সামাজিক দিক দিয়ে হিন্দুস্তান ছিল মুসলমান ও হিন্দু, উভয়েরই বাসভূমি। তাই হিন্দু ও মুসলমান সিপাহি ও কৃষক বিদ্রোহী কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেছে, প্রাণ দিয়েছে বিদেশি শাসকদের হাত থেকে তাদের বাসভূমিকে উদ্ধার করার জন্য। একে অন্যের ধর্মবিশ্বাস ও আচারবিচারকে শ্রদ্ধা করেছে, স্বীকৃতি জানিয়েছে। সাম্প্রতিক কালের গবেষণায় দলিত সম্প্রদায় ও মহিলাদের ভূমিকা সম্বন্ধেও অনেক আকর্ষক তথ্য বেরিয়ে এসেছে।

অর্থাৎ এই বিদ্রোহ থেকে ভারতীয় সমাজের এক বহুত্ববাদী ও সহিষ্ণু ছবি বেরিয়ে আসে। আমাদের জাতীয়তাবাদে তার প্রতিফলন না হলে ইতিহাসের শিক্ষা মূল্যহীন হয়ে যাবে।

নিউজিল্যান্ডে ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি অব ওয়েলিংটন-এ ইতিহাসের শিক্ষক, নিউজিল্যান্ড-ইন্ডিয়া রিসার্চ ইনস্টিটিউট-এর অধিকর্তা

আরও পড়ুন

Advertisement