দুই হাজার ষোলোর ফেব্রুয়ারি হইতে দুই হাজার উনিশের জানুয়ারি— রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে কানহাইয়া কুমার, উমর খালিদ ও অনির্বাণ ভট্টাচার্যদের গ্রেফতার হইতে তাঁহাদের বিরুদ্ধে চার্জশিটে পৌঁছাইতে পূর্ণ তিনটি বৎসর কাটিল। কিংবা ঘুরাইয়া বলা সম্ভব, দুই হাজার উনিশ জাতীয় নির্বাচনের বৎসর বলিয়া চার্জশিটটি পূর্ণ তিন বৎসর পর বাক্স হইতে বাহির হইল। সর্বার্থেই ইহা মোদী সরকারের নিজস্ব স্বাক্ষরময় রাজনীতি। জাতীয়তাবাদ এবং প্রতিহিংসার কার্যক্রম— এই দুইটিকে যদি বর্তমান কেন্দ্রীয় শাসক দলের ডিএনএ বা মূল চরিত্রবৈশিষ্ট্য বলা যায়, তবে স্পষ্টতই এই চার্জশিটটির মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সরকার দুইটি উদ্দেশ্যই এক ধাক্কায় অনেকখানি অগ্রসর করিতে পারিল। গত কয়েক বৎসর ধরিয়া প্রমাণিত, বিপদে আপদ দেখিলেই নরেন্দ্র মোদী সরকার অন্ধ ভাবে জাতীয়তাবাদী ভাবাবেগ উস্কাইতে ব্যস্ত হইয়া পড়ে, সে উরি সার্জিকাল স্ট্রাইকই হউক, আর কাশ্মীরই হউক। আর দেশের সামনে কিছু জলজ্যান্ত ‘অ্যান্টি-ন্যাশনাল’কে টানিয়া আনিতে পারিলে তো কথাই নাই। অর্থাৎ রাষ্ট্রদ্রোহের চার্জশিটটি সব দিক দিয়াই সময়োচিত। গত তিনটি বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির ‘অপ্রত্যাশিত’ মন্দ ফলের পর হইতে সরকার জাতীয়তাবাদ (অর্থাৎ বিজেপির মৌলিকতম কর্মসূচিটি) লইয়া ঝাঁপাইয়া পড়িয়াছে। অসমের নাগরিকত্ব (সংশোধনী) বিলও সেই কর্মসূচির অংশ, সাত-সাত জন কাশ্মীরির নাম-সংবলিত রাষ্ট্রদ্রোহের চার্জশিটটিও। 

আপত্তিকর এই কর্মসূচির প্রধান সমস্যা: ইহা স্থূল ও চিন্তা-বিরহিত জাতীয়তাবাদের উত্তেজনায় নাগরিককে মাতাইয়া তুলিতে চায়। যে রাষ্ট্রদ্রোহ আইনের ভিত্তিতে এই বারের চার্জশিটটি আনা হইয়াছে, তাহা তলাইয়া দেখিলেই সমস্যাটি স্পষ্ট হয়। এই রাষ্ট্রদ্রোহ বিধি লইয়া সংশয় নূতন নহে। ব্রিটিশ ভারতে প্রচলিত যে আইনগুলি স্বাধীন ভারতে চালু রাখা হইয়াছিল, রাষ্ট্রদ্রোহ আইনটি তাহার মধ্যে পড়ে। অথচ খাস ব্রিটেনেই যখন সিডিশন আইন আর নাই, তাহা হইলে ব্রিটেনের প্রাক্তন উপনিবেশ কেন সেই ডাইনোসরকে বহন করিবে, তাহা বোঝা যায় না। ঔপনিবেশিক যুগে সিডিশন বলিতে যাহা বুঝাইত, একবিংশ শতকের স্বাধীন সার্বভৌম দেশেও সিডিশন সেই একই অর্থ বহন করে কি না— এই সংশয় উঠিয়াছে। প্রশ্ন উঠিয়াছে, যত ক্ষণ পর্যন্ত সক্রিয় ভাবে কেহ রাষ্ট্রকে ধ্বংস করিবার পরিকল্পনা না করিতেছে, রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ কেন উঠিবে? এমনকি প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু এই আইনকে ‘জঘন্য রকমের আপত্তিকর’ (অবনকশাস) বলিয়া নিন্দা করিয়াছিলেন।

তথাপি আইনটি আজও বলবৎ। এবং দলমতনির্বিশেষে শাসক পক্ষ সেই আইনের সাহায্যে বিরুদ্ধতা খর্ব করিতে নিয়মিত উদ্যত। তাই কাশ্মীর নীতির বিরুদ্ধে প্রশ্ন উঠিলেই এই আইন কাজে লাগে। মাওবাদী বিদ্রোহ কিংবা তাহার সমব্যথীদের নাগালে পাইলেই এই আইনের পুরা মাত্রায় ব্যবহার হয়। লক্ষণীয়, দুই মাস আগে পশ্চিমবঙ্গের জঙ্গলমহলের চার যুবককে যে যে ধারায় গ্রেফতার করা হয়, তাহার মধ্যেও ১২৪-এ বা ‘সিডিশন’ ছিল। অর্থাৎ রাষ্ট্রের নীতি ও পদ্ধতি লইয়া প্রশ্ন তুলিবার স্বাধীনতার পাশাপাশি তাহা না মানিবার স্বাধীনতাটির অবকাশ এই গণতন্ত্রে নাই। প্রসঙ্গত, পঞ্চাশ বৎসর আগে ‘চারুলতা’ ছবির একটি নৈতিক জিজ্ঞাসা মনে পড়ে: চারুলতার স্বামী ভূপতি ‘সেন্টিনেল’ নামে যে পত্রিকাটি সম্পাদনা করিতেন, তাহা কি সরকারের ‘সমালোচনা’ করিতেছিল, না কি ‘সিডিশন’ উস্কাইতেছিল? পরাধীন দেশ ইতিহাসে বিলীন, দেশ সত্তরতম প্রজাতন্ত্র দিবসের প্রস্তুতিরত, কিন্তু আজও রাষ্ট্রক্ষমতার সেই একই স্পর্ধা অব্যাহত। বিতর্কের সুযোগ না দিয়া রাষ্ট্রের সমালোচনা ‘রাষ্ট্রদ্রোহ’ বলিয়া গণ্য। রাষ্ট্রের কাটিয়া দেওয়া গণ্ডির মধ্যে ঘোরাফেরাটুকুই ‘রাজনীতি’ বলিয়া স্বীকৃত।