×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

১৮ জুন ২০২১ ই-পেপার

সম্পাদক সমীপেষু: মতুয়া ভোট ভাগাভাগি

০৮ জুন ২০২১ ০৫:৩১

‘বিশ্বাস নয়, কৌশলের ভোট’ (১৯-৫) নিবন্ধের শেষে রজত রায় লিখেছেন, “জাতপাতের প্রশ্নে তাঁদের চোখে ভারতীয় রাজনীতিতে সকলেই কম-বেশি ‘ব্রাহ্মণ্যবাদী’, তাই তাঁরা (মতুয়ারা) সকল রাজনৈতিক দলের প্রতি সমান ভাবে উদাসীন; এবং সর্বোপরি কোন রাজনৈতিক দল নাগরিকত্ব প্রদান করতে পারে, এই প্রশ্নে কৌশলগত ভাবে তৃণমূল এবং বিজেপিতে বিভক্ত।” এটা কি ঠিক? বনগাঁ এবং রানাঘাট লোকসভায় ১৪টি আসনের মধ্যে ১২টি আসন দখল করেছে বিজেপি। বনগাঁ লোকসভার (৫৫% মতুয়া ও নমশূদ্র ভোটার) সাতটি আসনই সংরক্ষিত, বিজেপি পেয়েছে ছ’টি। রানাঘাট লোকসভার (৫৩% মতুয়া ও নমশূদ্র ভোটার) সাতটি আসনের মধ্যে ছ’টি। এটা কেমন কৌশল? বাস্তব এই যে, এই দু’টি কেন্দ্র-সহ অন্যান্য কেন্দ্রের মতুয়া ভোট শতাংশের বিচারে কম হওয়ায় জয়-পরাজয়ে নির্ণায়ক হয়ে উঠতে পারেনি। তাই ওই সমস্ত কেন্দ্রে তাঁদের সঠিক অবস্থান স্পষ্ট করা কঠিন। এটা প্রমাণিত, লোকসভার নিরিখে মতুয়া ভোটের একটা অংশ মমতামুখী হয়েছে। রাজ্য সরকারের প্রকল্পগুলির সুফল মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া, দ্বাদশ শ্রেণির পড়ুয়াদের ট্যাব দেওয়ার নামে মানুষের হাতে টাকা পৌঁছে দেওয়া, ‘দুয়ারে সরকার’ প্রকল্পে তফসিলি জাতি ও জনজাতিকে অঢেল শংসাপত্র দান, ওবিসিদের সার্টিফিকেট প্রদান, এ সবের প্রভাব বনগাঁ ও রানাঘাটের মতুয়া ভোটব্যাঙ্কে চিড় ধরিয়েছে। কিন্তু হিন্দুত্বের প্রশ্নকে লঘু করতে পারেনি।

২০০৯ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মতুয়াদের রাজনীতির উপরিভাগে নিয়ে আসেন। ২০২১ সালে তাঁর দলের জয়ের কারিগর হতে পারল না মতুয়ারা! এই সম্ভাবনা মমতা আগাম আঁচ করেছিলেন বলেই এ বার মুসলিম ভোট ও প্রকল্পের সুবিধার উপর নির্ভর করেছিলেন। মতুয়া সম্প্রদায়ের মধ্যেও এখন রাজনীতির নিরিখে নানা রকম ভাগ হয়ে গিয়েছে। একটা ভাগ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রকল্পমুখী হলেও অন্য একটি বড় অংশ দুর্নীতি, সরকারের একনায়কত্ব, স্কুলে নিয়োগ নিয়ে ছেলেখেলা, স্থানীয় নেতার দাপট-সহ নানা বিষয়কে সামনে রেখে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর হিন্দুত্বের প্রতি আস্থা রেখেছেন। ১৪টি আসনের ফলাফলই তার প্রমাণ।

উত্তমকুমার বিশ্বাস, বাগদা, উত্তর ২৪ পরগনা

Advertisement

আসল প্রতিপক্ষ

‘বিশ্বাস নয়, কৌশলের ভোট’ নিবন্ধটি অত্যন্ত সত্য এবং বাস্তব। উনিশ শতকের শেষ দিকে মতুয়া সম্প্রদায়ের ধর্মগুরু হরিচাঁদ ঠাকুর বুঝতে পেরেছিলেন, নমশূদ্র সম্প্রদায়ের মানুষ শিক্ষা, আচার-আচরণে অন্যান্য সম্প্রদায়ের চেয়ে অনেক পিছিয়ে। এই সম্প্রদায়কে সমাজের মূল স্রোতে টেনে তুলতে হলে প্রথমে দরকার শিক্ষা। তাই তিনি তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের সহায়তায় প্রথমে অবিভক্ত ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহকুমার বিভিন্ন অঞ্চলে বেশ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন। হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের ছেলেমেয়েরা সেখানে পড়ার সুযোগ পায়। পরবর্তী কালে তাঁর ছেলে গুরুচাঁদ ঠাকুরের হাত ধরে নমশূদ্র সম্প্রদায় মানুষের মধ্যে আরও বেশি শিক্ষা বিস্তার করতে থাকে। অল্প দিনের মধ্যে শিক্ষাদীক্ষায় কিছুটা বলিয়ান হয়ে তাঁরা বুঝতে পারলেন, ব্রাহ্মণ্যবাদী সমাজ তাঁদের অচ্ছুত করে রেখেছে। শুরু হল ধর্মীয় আন্দোলন। সেই আন্দোলনই পরবর্তী কালে জাতপাতের আন্দোলনে রূপান্তরিত হয়। কিন্তু তাঁরা সেই সময়ে কোনও রাজনৈতিক দলের আঙিনায় আসেননি। ১৯৪৭ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রায় সমস্ত উচ্চবর্ণের হিন্দু ভারতে চলে আসেন, তৎসহ সামান্য কিছু মতুয়া সম্প্রদায়ও। নমশূদ্র সম্প্রদায়ের মানুষ পশ্চিমবঙ্গ-অসম-ত্রিপুরা, দণ্ডকারণ্য, আন্দামান প্রভৃতি স্থানে আশ্রয় নেন। কিন্তু অধিকাংশ নমশূদ্র মতুয়া সম্প্রদায়ের মানুষ পূর্ব পাকিস্তানে রয়ে যান। অত্যাচারিত হয়েও তাঁরা টিকে ছিলেন সেখানে।

কিন্তু ১৯৭০-৭১ সালের যুদ্ধে তাঁরা বিপর্যস্ত হয়ে শরণার্থী হিসেবে ভারতে, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ এবং অসমে প্রবেশ করেন। তৎকালীন কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ভারত সরকার তাঁদের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থানের দায়িত্ব নেয়। স্বাধীন বাংলাদেশে তাঁরা ফিরে গেলেন না। গ্রামেগঞ্জে, মাঠে-ময়দানে, খাস জমিতে, রেললাইনের পাশে— যে যেখানে পারলেন, থেকে গেলেন উদ্বাস্তু হিসেবে। পরবর্তী কালে এঁদের সমর্থন আদায় করতে সমর্থ হলেন বামপন্থীরা। ১৯৭৭ সালে বামফ্রন্টের ক্ষমতায় আসার পিছনে এঁদেরও কিছুটা অবদান ছিল। বামফ্রন্ট ক্ষমতায় এসে মতুয়াদের জমির পাট্টা, ভোটাধিকার, রেশন কার্ড ইত্যাদি প্রদানের মাধ্যমে আস্থাভাজন হয়ে উঠল। পরে মতুয়ারা ধীরে ধীরে বামেদের থেকে দূরে সরে যেতে থাকেন। ২০১১ সালে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলে যায়। মতুয়ারা সমাজে মানসম্মান, অধিকার এবং ক্ষমতার আশায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডাকে সাড়া দেন। এই প্রথম মতুয়া সম্প্রদায় হিসেবে রাজনীতিতে সরাসরি পদার্পণ।

কিন্তু ২০১৭-১৮ সাল থেকে নাগরিকত্বের প্রশ্নে তাঁরা বিজেপির দিকে ঝুঁকতে থাকেন। আর মতুয়া ঠাকুর বাড়ির নিজেদের কলহে মতুয়া সম্প্রদায় বিভক্ত হয়ে যায়‌। ২০১৯ সালে লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির প্রতি মতুয়াদের সমর্থন চোখে পড়ার মতো। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, তাঁরা কোনও রাজনৈতিক দলের সম্পদ নন। তাঁরা ‘যখন যেমন তখন তেমন’ মানসিকতায় বিশ্বাসী। বামফ্রন্ট, তৃণমূল, শেষে বিজেপি।

মতুয়াদের আসল লড়াই ব্রাহ্মণ্যবাদী, মনুবাদী সমাজের বিরুদ্ধে। ব্রাহ্মণ্য বৈদিক পন্থায় এঁরা বিশ্বাসী নন। ইতিমধ্যে নিজেদের মধ্যে পারলৌকিক ক্রিয়া, বিবাহ, ছোটখাটো গৃহাদি পূজা মতুয়া ধর্ম মতে এঁরা শুরু করেছেন। তাই তাঁদের কঠোর হিন্দুত্ববাদী বললে ভুল হবে। আশার আলো, এই সম্প্রদায়ের নতুন প্রজন্ম শিক্ষায় অনেক এগিয়েছে। তাঁরা অদূর ভবিষ্যতে হয়তো সাম্যবাদী সমাজ গড়ে তুলতে সক্ষম হবেন।

স্বপন আদিত্য কুমার, অশোকনগর, উত্তর ২৪ পরগনা

মতুয়া ভাবাদর্শ

রজত রায় লিখছেন, মতুয়াদের চোখে শুধু বিজেপি নয়, সব দলই কম বেশি ব্রাহ্মণ্যবাদী। এখানে দু’টি প্রশ্ন— ১) যে ভাবাদর্শ থেকে একটি জাতপাতহীন সমাজজীবন গঠন মতুয়াদের মূল উদ্দেশ্য ছিল, তার ভিত্তি সাম্য ও সর্বজনীন মানবতাবাদ। বর্তমানে এ দেশে, ‌তথা এ রাজ্যে বসবাসকারী মতুয়ারা কি আজও সেই ভাবাদর্শ ও জীবনচর্চার অনুসারী?
২) কোনও রাজনৈতিক দলকে সমর্থনের বিষয়ে মতুয়াদের কাছে ব্রাহ্মণ্যবাদী তত্ত্ব বিচার্য, না কি নাগরিকত্বের গ্যারান্টি?

আসলে মতুয়াদের নাগরিকত্বের বিষয়টি আজও স্বচ্ছ নয়। বিজেপি সরকার মতুয়াদের নাগরিকত্বের নিশ্চয়তা দেয়নি। অবশ্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সিএএ-র বিরোধিতা করে তাঁদের আস্থাভাজন হয়েছেন। তাঁরা এ দেশের নাগরিক— এ কথা রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রচারে বার বার এনে নিজেকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছেন। তাই কোনও রাজনৈতিক আদর্শ, বা নিজ সম্প্রদায়ের ভাবাদর্শ, ব্রাহ্মণ্যবাদী সামাজিক বিভেদের বিরুদ্ধে লড়াই, এর কোনওটাই তত গুরুত্বপূর্ণ নয়, মতুয়াদের কাছে এ দেশে থাকার গ্যারান্টি, নাগরিকত্ব আদায় যতটা বিবেচ্য। এ দেশের নাগরিকত্ব তাঁদের সামাজিক ন্যায় ও সুস্থ স্বচ্ছ জীবনের প্রদায়ক। যে হেতু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁদের নিরাপত্তা প্রদানকারী, কাছের মানুষরূপে উঠে এসেছেন, তাই মতুয়াদের রাজনৈতিক সমর্থন তৃণমূলের পক্ষে গিয়েছে।

কুমার শেখর সেনগুপ্ত, কোন্নগর, হুগলি

Advertisement