একটা ধাক্কা দেওয়া জরুরি
এক দিকে নয়া-উদার বাজারমুখী নীতি বলছে জনমোহিনী সরকারি খরচ কমাও, অন্য দিকে ভোটে জেতার চাপ।
election

অকৃষকের আয় দ্বিগুণ হবে। দশ বছরে নতুন কর্মসংস্থান হবে ২৫ কোটি। শিক্ষা-স্বাস্থ্যে উন্নতি হবে। বিজেপির ২০১৪ সালের ইস্তাহার আর নরেন্দ্র মোদীর ভাষণে থাকা প্রতিশ্রুতিগুলোর ঠিক কী হল? 

১৯৯১ সালে আর্থিক সংস্কার চালু হওয়ার সময় থেকে কৃষির গতিক খারাপ হতে থাকে। ২০০৩ সালের পর পরিস্থিতি একাধিক কারণে খানিক বদলায়। প্রথমত, ২০০৩-০৪ থেকে পরের দশ বছরে কৃষি মন্ত্রকের বরাদ্দ প্রায় দশ গুণ বেড়েছিল। চাষে সরকারি লগ্নি বাড়লে পরিকাঠামোর উন্নতি হয়, সহজে ফসল বাজারে নেওয়া যায়, চাষির আয় বাড়ে। দুই, ২০০৩-০৪ থেকে ২০১৪-১৫ অবধি ধান ও গমের সরকারি সহায়ক মূল্য যথাক্রমে বছরে গড়ে আট ও সাত শতাং‌শ হারে বাড়ে। তিন, গ্রামের লোকের রোজগার বাড়লে তাঁদের কৃষিজাত পণ্যেরও চাহিদা বাড়বে, ফলে চাষির লাভ হবে। একশো দিনের কাজের প্রকল্পের কল্যাণে গ্রামের অদক্ষ শ্রমিকদের আয় বাড়ে, তাঁদের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ে, যা কৃষকের আয় বাড়ায়।

২০১৩-১৪ থেকে কৃষির ফের দুর্দশা। ২০১৪-১৫ থেকে ২০১৮-১৯ ধান ও গমের সহায়ক মূল্যের গড় বৃদ্ধির হার ছিল ৫%। অর্থনীতিতে টার্মস অব ট্রেড বা আপেক্ষিক দামের হিসেব কষা হয়। চাষি ফসলের যে দাম পাচ্ছেন, ও অন্যান্য জিনিসপত্র কিনতে যে দাম দিচ্ছেন, তারই অনুপাত হল আপেক্ষিক দাম। যদি সেটা বাড়ে, বুঝতে হবে চাষির আর্থিক সঙ্গতি বাড়ছে। ২০০৩-০৪ থেকে ২০১০-১১ আপেক্ষিক দাম দ্রুত বাড়ে। কিন্তু ২০১০-১১-র তুলনায় ২০১৭-১৮-র আপেক্ষিক দাম কম। তার উপর প্রকৃতির মার। ’১৪ আর ’১৫ সালে পর পর অনাবৃষ্টি। প্রাকৃতিক দুর্যোগের হাত থেকে বাঁচতে সরকারি নীতি যে দিকে চলার কথা ছিল তার উল্টো পথে এগিয়েছে। ইউপিএ আমলে প্রতি বছর ২৬% হারে কৃষির বাজেট বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছিল। এনডিএ জমানায় বাড়ানো হয়েছে ৮.৭% হারে। 

দিল্লি দখলের লড়াই, লোকসভা নির্বাচন ২০১৯

২০১৪’র ভোটের আগে মোদী বলেছিলেন, ফসলের দাম চাষের খরচের দেড় গুণ করা হবে। কিন্তু কথা অনুযায়ী কাজ হয়নি। গত বছর আচমকা ঘোষণা হল, সহায়ক মূল্য নাকি দেড় গুণ করে দেওয়া হয়েছে! খতিয়ে পরীক্ষা করে দেখা গেল সহায়ক মূল্য যে খরচের দেড় গুণ করা হয়েছে তা আসল খরচ নয়, আসল খরচের কম একটি খরচ। 

২০১৪ সালে বিজেপির ইস্তাহার বলেছিল দশ বছরে ২৫ কোটি কর্মসংস্থান হবে। আশায় বুক বেঁধে যুবকযুবতীরা ভোট দিয়েছিলেন। কাজ পেলেন কি? বেকারত্বের হার দিয়ে কর্মসংস্থানের হাল বোঝা যায়। যত জন কাজ পেলেন না ও মোট যত জন কাজ খুঁজছিলেন, তার অনুপাত এই হার। ২০১৮’র হিসেবে ৪৫ বছরে সর্বোচ্চ বেকারির হার চলছে এখন। যাঁরা আশা-উদ্দীপনায় মোদীর ঝুলিতে ভোট ফেলেছিলেন সেই তরুণরাই বেকারির চোটে ধ্বস্ত। 

তথ্যগুলো সরকারি সংস্থাই কষে বার করেছে। শাসক দলের পক্ষে সংখ্যাগুলো সুখবর আনেনি। অতএব বেমালুম চেপে দেওয়া হয়েছে। সেই সত্যই প্রকাশ করা হবে, যা সুবিধেজনক। কী সেই সুবিধেজনক সত্য? যেমন প্রভিডেন্ট ফান্ডে অনেক লোক নথিভুক্ত হয়েছেন। অতএব দাবি: কর্মসংস্থান বেড়েছে। এটা কুযুক্তি। নথিভুক্ত হওয়া মানেই কর্মসংস্থান নয়। হতে পারে ওঁরা আগেও কাজ করছিলেন, নথিভুক্ত ছিলেন না। দ্বিতীয়ত, অনেক লোক হয়তো একই সময়ে কাজ হারিয়েছেন। সেই হিসেব ছাড়া কর্মসংস্থান বাড়ল কি না বলা যায় না। 

অন্য যুক্তি: জাতীয় আয় চড়া হারে বাড়ছে, কাজেই কর্মসংস্থানও চড়া হারে বাড়ছেই। যুক্তিটিতে ফাঁক বিস্তর। মার্ক্স বলেছিলেন, প্রতিযোগিতার তাগিদে পুঁজিপতি শ্রমিক-নির্ভরতা কমিয়ে যন্ত্রের সাহায্যে উৎপাদন করবে। প্রযুক্তির চমকপ্রদ উন্নতির দৌলতে সেটাই আজ প্রবল ভাবে ঘটছে। ফলে জাতীয় আয় বাড়লেও কর্মসংস্থান বাড়ছে শ্লথগতিতে। সিএমআইই-র তথ্য অনুযায়ী ২০১৮’র তুলনায় ২০১৭’য় মোট কর্মসংস্থান কমেছে।

কাজ নেই, আয় নেই, তার ওপরে সরকার জনকল্যাণমূলক খরচাপাতি ছেঁটেছে। ২০০৫-এ সরকার জাতীয় গ্রামীণ স্বাস্থ্য মিশন মারফত গ্রামের মানুষদের চিকিৎসার পরিকাঠামোর উন্নতিতে জোর দেয়। প্রাথমিক চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোকে মজবুত করে তোলা হয়। স্বাস্থ্যের সূচকগুলোর খানিক উন্নতি হয়। ২০১৩’য় এনআরএইচএম-এর জায়গায় আসে ন্যাশনাল হেলথ মিশন। মোদী জমানায় তার বরাদ্দ বাড়েনি, প্রতি বছর আধ শতাংশ-বিন্দু করে কমেছে। 

দুনিয়ায় যত অপুষ্টিতে ভোগা শিশু, তার প্রায় অর্ধেক ভারতীয়। অপুষ্টিতে ভুগলে বয়স অনুযায়ী বাচ্চাদের বাড় হয় না, উচ্চতা কম থাকে। একে বলে স্টান্টিং। ২০১৪’র বিশ্বব্যাঙ্কের তথ্য বলছে, পাঁচ বছরের কম ভারতীয় শিশুদের ৩৯% এই স্টান্টিংয়ে ভুগছিল। আফ্রিকার অনেক দেশের অবস্থা আমাদের চেয়ে ভাল। নাইজেরিয়াতে স্টান্টিং ছিল ৩৩%।  

স্বাস্থ্যের দুর্দশার একটা কারণ দারিদ্র। কিন্তু একমাত্র কারণ নয়। ভারতের থেকে কম আয়ের দেশ বাংলাদেশ স্বাস্থ্যে, উন্নয়নের মাপকাঠিতে আমাদের পিছনে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে। গ্রামের হাসপাতাল ঠিকঠাক কাজ করলে, অঙ্গনওয়াড়িগুলোয় পর্যাপ্ত কর্মচারী থাকলে গরিব শিশুরা পুষ্টি পাবে, চিকিৎসা পাবে। অথচ আইসিডিএস প্রকল্পে গত পাঁচ বছরে বরাদ্দ কমেছে। জনপ্রতি প্রকৃত বরাদ্দ তলানিতে। 

স্বাস্থ্যে সরকার অবহেলা করেছে। শিক্ষাক্ষেত্রে সরকার যেন যুদ্ধ ঘোষণা করে দিয়েছে। মেকি জাতীয়তাবাদের ধুয়ো তুলে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়, হায়দরাবাদ কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে বামপন্থীদের শায়েস্তা করা তো আছেই। পরিবর্তন আরও মৌলিক স্তরে চলছে। ২০০৫ সালে ইউপিএ জমানায় কেন্দ্র সরকার বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সঙ্গে গ্যাটস (জেনারেল এগ্রিমেন্ট অন ট্রেড অ্যান্ড সার্ভিসেস) চুক্তি করে দেশের শিক্ষাক্ষেত্রকে বিদেশি পুঁজির কাছে খুলে দিতে রাজি হয়। ২০১৫’য় সংস্থার বৈঠকে ভারত অংশীদার ছিল। স্থির হয়, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, গবেষণা, বিমা ইত্যাদিতে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ তৈরি হবে, দেশি বা বিদেশি বেসরকারি পুঁজি শিক্ষা বা স্বাস্থ্যে অবাধ ব্যবসা করতে পারবে, সরকারি প্রতিষ্ঠানে ভর্তুকি থাকলে তা প্রতিযোগিতাবিরোধী সাব্যস্ত হবে, কেননা ওই সুবিধে বেসরকারি শিক্ষার ব্যবসাদাররা দিতে পারছেন না। সুস্থ প্রতিযোগিতার জন্য ভর্তুকি তুলে দেওয়া শ্রেয়। অর্থাৎ সরকারের শিক্ষার বাজেটে কোপ। ২০১৪-১৫ সালে বাজেটের ৬.২% শিক্ষায় খরচ হয়েছিল, ২০১৭-১৮ কমে হয় ৩.৭%। গ্যাটস-নিদান মনে রাখলে মোদী সরকারের শিক্ষাসংক্রান্ত যুদ্ধকে হৃদয়ঙ্গম করা যায়।  

এক দিকে নয়া-উদার বাজারমুখী নীতি বলছে জনমোহিনী সরকারি খরচ কমাও, অন্য দিকে ভোটে জেতার চাপ। এই দ্বন্দ্বকে এ যুগে সমাধান করা হচ্ছে সম্প্রদায়ের মাঝখানে বিভেদ বাড়িয়ে দিয়ে। আমেরিকা বা ইউরোপে বিশ্বায়নের চোটে, পুঁজিবান্ধব নীতির ঠেলায় শ্রমজীবীদের কোমর ভেঙে গিয়েছে। বিক্ষুব্ধ সাদা শ্রমজীবীদের উস্কে দেওয়া হচ্ছে কালো, মেক্সিকান, মুসলমানদের বিরুদ্ধে। ভারতে সরকারি ব্যয়সঙ্কোচে সরকারি হাসপাতাল বিপর্যস্ত। ইস্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় টাকা না পেয়ে নাভিশ্বাস তুলছে। বা, পড়ার খরচ এত বেড়েছে যে শিক্ষা সাধারণ ছাত্রের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। করদাতার টাকায় তৈরি বাস পরিবহণ, হাওয়াই পরিবহণ, খনি, কারখানা জলের দরে নিলাম হচ্ছে। আর নাগরিককে লড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে ধর্ম, জাতির নামে। মোদী বিদায় নিলেই এই আর্থ-রাজনৈতিক প্রকল্পের থেকে নিস্তার নাও পাওয়া যেতে পারে। তবে একটা ধাক্কা দেওয়া জরুরি।

আইআইটি, গুয়াহাটি-তে অর্থনীতির শিক্ষক

২০১৯ লোকসভা নির্বাচনের ফল

আপনার মত