পদের মোহ নেই বলা আসলে রাজনৈতিক বিনয়
তাহা মনই জানে...
নরেন্দ্র মোদী হেরে গেলে বিরোধী জোটের প্রধানমন্ত্রী কে হবেন, সবটাই ভবিষ্যতের গর্ভে।
Alliance

প্রশ্নটা ছিল, আছে এবং ক্রমেই ডালপালা ছড়াচ্ছে। ভোটপর্ব শেষের মুখে এমনটাই তো হওয়ার কথা। কারণ ২৩ মে আসতে আর দেরি নেই। সকলের সব অনুমান-দাবি-হিসেবনিকেশের অবসান ঘটিয়ে সে দিনই স্পষ্ট হয়ে যাবে নরেন্দ্র মোদী ক্ষমতায় ফিরতে পারবেন কি না। স্বাভাবিক ভাবেই তাই বিরোধী শিবিরের অন্দরেও এখন থেকে তৎপরতা যে বাড়বে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। 

সেই প্রক্রিয়া শুরুও হয়েছে। আবার সক্রিয় হয়ে উঠেছেন চন্দ্রবাবু নায়ডু। তাঁর সক্রিয়তায় সাড়া দিয়ে ১৯ মে শেষ দফার ভোট মিটলেই বিরোধীরা যদি দল বেঁধে রাষ্ট্রপতির কাছে সরকার গঠনের পদ্ধতি নিয়ে আগাম বক্তব্য জানাতে যান, তবে সেটা হবে এই পর্বে তাৎপর্যপূর্ণ।

কিন্তু মূল প্রশ্নটি অন্য। সকলেই বুঝছেন। কিন্তু ঝেড়ে কাশতে চান না কেউ। সবার উত্তরেই আবছায়া। ফলে এখনও পর্যন্ত অবস্থান যথাপূর্বম্‌। নরেন্দ্র মোদী হেরে গেলে বিরোধী জোটের প্রধানমন্ত্রী কে হবেন, সবটাই ভবিষ্যতের গর্ভে।

এই নীরবতা বা অনিশ্চয়তার কারণও আছে যথেষ্ট। বিভিন্ন রাজ্যে আঞ্চলিক দলগুলির উত্থানের প্রবণতা তার অন্যতম। বিজেপিকে হারাতে একের বিরুদ্ধে এক প্রার্থী দেওয়ার উদ্যোগের সূচনা থেকেই আঞ্চলিক দলগুলির প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা ছিল এই রণকৌশলের একটি বড় লক্ষ্য। তা অনেকটাই সফল হয়েছে। বস্তুত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন সর্বপ্রথম বিজেপির বিরুদ্ধে ফেডারাল ফ্রন্ট গড়ে লড়াইয়ের ডাক দিয়েছিলেন, তখন তাঁরও উদ্দেশ্য ছিল বিভিন্ন রাজ্যে প্রধান আঞ্চলিক দলগুলিকে নিজেদের এলাকায় এগিয়ে আসার পথ খুলে দেওয়া। যাতে বেশি সংখ্যক আসনে জিতে তারা দিল্লির সরকার গঠনের ক্ষেত্রে ‘ওজনদার’ হয়ে উঠতে পারে। সেই জন্যই তখন জাতীয় দল কংগ্রেসের সঙ্গে সাধারণ ভাবে আসন ভাগাভাগির বিষয়টি গুরুত্ব পায়নি।

কিন্তু ঘটনা হল, রাজনৈতিক বাস্তবতা অনুযায়ী কংগ্রেসকে বাদ রেখে শুধু আঞ্চলিক দলগুলির পক্ষে জোট বেঁধেও অন্তত ২৭২ আসন নিয়ে সরকার গঠন যেমন কঠিন, তেমনই কংগ্রেস এবং তার ইউপিএ শরিকরা মিলে ২৭২ আসন জিতে সরকার গড়তে পারবে— তেমনটাও এখনই জোর দিয়ে বলা যায় না। তাই মোদীকে হারিয়ে বিকল্প একটি সরকার গড়তে হলে কংগ্রেসের সঙ্গে অন্য বিজেপি-বিরোধী আঞ্চলিক দলগুলির ‘মহাগঠবন্ধন’ই যে একমাত্র পথ, অচিরেই সেই উপলব্ধি হল সকলের।

‘নীতিগত ভাবে’ এ বারের নির্বাচনী লড়াই হয়তো সেই পথ ধরেই এগোতে চেয়েছে। হয়তো তাই কংগ্রেস-সহ বিরোধী দলগুলি বার বার একত্রে বৈঠক করেছে। মমতার ডাকে ব্রিগেডে ২৩টি বিরোধী দলের সভায় যোগ দিয়েছে কংগ্রেস। তবু বলতেই হবে, যে সব রাজ্যে বিজেপির মোকাবিলায় কংগ্রেস প্রধান শক্তি, সেখানে তাদের এগিয়ে দিয়ে অন্যান্য রাজ্যে বিরোধী আঞ্চলিক দলগুলিকে প্রাধান্য দেওয়ার তাত্ত্বিক ফর্মুলা সর্বত্র মসৃণ ভাবে কাজ করেনি। পশ্চিমবঙ্গে তো নয়ই, সবচেয়ে বেশি আসন যেখানে, সেই উত্তরপ্রদেশেও মায়াবতী-অখিলেশদের জোটের সঙ্গে শেষ পর্যন্ত কংগ্রেসের লড়াই এড়ানো যায়নি। 

অনেকের ধারণা, এই দুই রাজ্যেই কংগ্রেসের ফল আহামরি কিছু হওয়ার নয়। হয়তো দুই রাজ্যেই আঞ্চলিক দলগুলির গরিষ্ঠতা থাকবে। বিশেষ করে উত্তরপ্রদেশে সমাজবাদী ও বিএসপি জোট যদি এ বার কিছু বেশি আসন পেয়ে যায়, তাতে বিজেপির সমূহ ক্ষতি। একই ভাবে এই রাজ্যে তৃণমূল তার গরিষ্ঠতা বজায় রাখতে পারলেও আদতে বিজেপির ঘরে ফসল উঠবে না। বিজেপিকে দিল্লির মসনদে রুখে দেওয়ার অঙ্কে এগুলি অবশ্যই বিচার্য। কিন্তু সামগ্রিক ভাবে দেখলে মহাজোটের মূল ধারণা যে এতে কিছুটা ধাক্কা খায়, সেটা অনস্বীকার্য। ভবিষ্যতে সরকার গঠনের সুযোগ এলে তখন এর কোনও ছাপ পড়বে কি না, পড়লে কী ভাবে, তা এখনই নিশ্চিত বলা যায় কি?

এমনই এক পরিস্থিতিতে চন্দ্রবাবুর নতুন প্রচেষ্টা আবার কিছু জল্পনা উস্কে দিল। নায়ডু চান, ভোটের ফল বেরোনোর আগেই রাষ্ট্রপতির কাছে গিয়ে বিরোধীরা একজোটে বলুন, কোনও দল একক ভাবে সর্বোচ্চ আসন পেলেই তাদের যেন আগেভাগে সরকার গড়তে ডাকা না হয়। এই উদ্যোগের লক্ষ্য যে বিজেপিকে ঠেকানো, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সর্বভারতীয় দল হিসেবে কংগ্রেসের থেকে বিজেপির আসন যদি একক ভাবে বেশি হয়ে যায়, সেই সম্ভাবনার কথা ভেবেই আগাম এমন একটি ‘রক্ষাকবচ’ হাতে রাখার ভাবনা। ইতিমধ্যেই রাহুল গাঁধীর সঙ্গে এক প্রস্ত কথা বলেছেন চন্দ্রবাবু। কথা হয়েছে মমতার সঙ্গেও। 

শেষ পর্যন্ত এই পরিকল্পনা কার্যকর করা যাবে কি না, হলেও বিরোধীদের এই প্রস্তাব রাষ্ট্রপতি মানবেন কি না, সে সবই এখনও অজানা। কিন্তু আপাতত যা জানা যাচ্ছে তা হল, মমতা এবং মায়াবতী দু’জনের কেউই এখন এই ধরনের কোনও কর্মসূচিতে উৎসাহী নন। ভোটের ফল বেরোনোর পরে পরিস্থিতি দেখে তবেই তাঁরা পা ফেলতে চান। মমতা সর্বাগ্রে চান বিরোধীদের অভিন্ন ন্যূনতম কর্মসূচি।

বিরোধী জোটের সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে নেতাদের নীরবতা যেমন অর্থবহ, তেমনই অর্থবহ মমতা, মায়াবতীর মতো জাতীয় রাজনীতিতে ওজনদার দুই আঞ্চলিক দলনেত্রীর জল মেপে চলার এই কৌশল। প্রশ্ন জাগে, বিরোধী শিবিরে আসনের নিরিখে একক ভাবে কংগ্রেস এগিয়ে থাকতে পারে বলেই কি তারা চটজলদি সিদ্ধান্ত নিতে রাজি নয়?

রাজনীতির গতি বিচিত্রগামী। এবং ‘সঠিক’ সময় বুঝে উপযুক্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারা এক জন রাজনীতিকের দক্ষতার পরিচয়। তাঁদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা থাকাও কোনও অপরাধ নয়। সে দিক থেকে দেখলে জাতীয় রাজনীতিতে বর্তমানে সর্বাধিক আলোচিত  দুই নেত্রীর পদক্ষেপ আগ্রহ বাড়িয়ে দেয়। 

বিরোধীদের একমঞ্চে আনার পিছনে মমতার আগুয়ান ভূমিকা ইতিমধ্যেই জাতীয় রাজনীতিতে স্বীকৃত হয়েছে। মোদীর বিরুদ্ধে তাঁর প্রচারের তীক্ষ্ণতাও এ বার নজর কাড়া। এই রাজ্যে আসন ৪২টি। কিন্তু মোদী-দিদি দ্বৈরথ এমন এক মাত্রা পেয়েছে যে, প্রধানমন্ত্রী দেশের যে কোনও প্রান্তে বক্তৃতায় বা সাক্ষাৎকারে মমতার নাম টেনে আনছেন। বিরোধী শিবিরের নেতারাও নিয়মিত তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলছেন। আসলে সকলেই মনে করছেন, এই রাজ্য থেকে মমতার দল যতগুলি আসন পাবে তাতে সরকার গঠনের ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হবে। মমতা নিজেও বার বার বলছেন, ‘‘দিল্লিতে এ বার সরকার গড়বে বাংলা। সঙ্গে থাকবে উত্তরপ্রদেশ।’’ অর্থ পরিষ্কার। তাঁর হাতে যদি অধিক সংখ্যায় আসন থাকে, তা হলে দিল্লি দখলের দাঁড়িপাল্লায় তিনি বেশি ওজন চাপাতে পারবেন! একই লক্ষ্য মায়াবতীরও।

এই আশার পিছনে কোনও স্বপ্ন যে নেই, তা বলা যায় না। খেলা যত ক্ষণ পর্যন্ত শেষ না হচ্ছে, তত ক্ষণ কোথাকার বল কোথায় গড়ায় কে বলতে পারে! ‘আমার কোনও পদের মোহ নেই’ বলা তো আসলে এক রাজনৈতিক বিনয়। সে তো মমতাও বলছেন, রাহুল গাঁধীও বলছেন। কিন্তু পরিস্থিতি যদি কাউকে সত্যিই সেই আসনের দিকে এগিয়ে দেয়, তা হলে?

যাঁরা নিজেরা দৌড়ে নেমে পড়েছেন, অথবা যাঁদের দৌড়ে ‘নামিয়ে দেওয়া’ হয়েছে, এর উত্তর জানে শুধু তাঁদের মন। আর মনের কথা মুখে আনার মতো অবিবেচক তাঁরা কেউ নন। 

অতএব নীরবতা এখন হিরণ্ময়।

২০১৯ লোকসভা নির্বাচনের ফল

আপনার মত