আজ বিধানসভায় আক্ষরিক অর্থেই একটি সন্ধিক্ষণ উপস্থিত। দীর্ঘ অর্ধ শতকের ব্যবধানে এমন একটি সরকার বাজেট পেশ করতে চলেছে, যার কাঁধের উপরে কোনও বামপন্থী বোঝা নেই। দলের নামেও নয়, রাজনীতির চরিত্রেও নয়। আশা করা চলে যে, অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত মনে রাখবেন, রাজ্যের অর্থব্যবস্থা আজকের স্থবিরতাকে অতিক্রম করে ভবিষ্যতের জঙ্গম পথে চলার সামর্থ্য অর্জন করবে কি না, সে প্রশ্নের উত্তর বহুলাংশে নির্ভর করছে তাঁর এই বাজেটের উপরে। একটি বাজেটে অর্থব্যবস্থার গতিপথ কতখানি পাল্টে যেতে পারে, ১৯৯১-এর জুলাই মাসের পর ভারতে সে প্রশ্নের উত্তর নিয়ে কোনও সংশয় নেই। সত্য যে, রাজ্য-বাজেটের সামর্থ্য তুলনায় সীমিত। কিন্তু, ভবিষ্যতে রাজ্যের অর্থব্যবস্থা কোন পথে চলবে, তার রূপরেখা নির্ধারণের ক্ষমতা এই বাজেটের আছে। রাজনৈতিক কারণে পূর্ববর্তী জমানার কিছু নীতি এই পর্বেও অব্যাহত থাকছে— যেমন, লক্ষ্মীর ভান্ডার নাম পাল্টে অন্নপূর্ণা যোজনা হয়েছে, কিন্তু তার চরিত্রটি অপরিবর্তিত। উন্নয়নের স্বার্থে এই জাতীয় প্রকল্পের বিলক্ষণ গুরুত্ব রয়েছে। কিন্তু, এমন প্রকল্পে ব্যয়ের ঊর্ধ্বসীমাটি যে রাজ্যের আর্থিক সঙ্গতি দ্বারা নির্ধারিত হয়, শাসকের রাজনৈতিক পরিকল্পনার দ্বারা নয়, এই কথাটি ভুললে চলবে না। ইতিমধ্যেই বর্তমান সরকার অতীতের একাধিক অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প বন্ধ করেছে। সে ক্ষেত্রে আরও কঠোর নীতি অনুসরণ করতে হবে।
পশ্চিমবঙ্গের একটি উত্তরণ প্রয়োজন— সরকারি সাহায্যে কোনও ক্রমে বেঁচে থাকার থেকে বাজারে অংশগ্রহণের সামর্থ্য অর্জনের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহে উত্তরণ। তার জন্য জোগান এবং চাহিদা, উভয় দিকেই নজর দিতে হবে। জোগান, অর্থাৎ বাজারে অংশগ্রহণে সক্ষম শ্রমশক্তি নির্মাণ। তার জন্য যেমন প্রাথমিক শিক্ষার গুরুত্ব প্রশ্নাতীত, তেমনই জোর দিতে হবে কর্মমুখী শিক্ষার দিকেও। সাম্প্রতিক অতীতের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে এ বছরও রাজ্যের প্রায় সব কলেজেই বহু আসন খালি পড়ে আছে— বিশেষত বিজ্ঞানের পাঠ্যক্রমে ছাত্রের অভাব প্রকট। অর্থাৎ, প্রথাগত শিক্ষা অর্জনের পথে বাজারে যে কাজ মিলবে না, এ কথাটি রাজ্যের যুবসমাজ অভিজ্ঞতায় বুঝে নিয়েছে। এ রাজ্যে যথেষ্ট কাজ নেই, সেটি এই আশাহীনতার একটা কারণ বটে, কিন্তু অপর কারণটি হল, কাজের বাজারের চরিত্র পাল্টে গিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের যুবসমাজ যাতে সেই পরিবর্তিত বাজারে নিজেদের জায়গা করে নিতে পারে, তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব বর্তমান সরকারের। রাজ্যের অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের অনুপাতে শিক্ষার বরাদ্দ বাড়াতে হবে। এবং, মন দিতে হবে ফলাফলের দিকে— ছেলেমেয়েরা কতখানি শিখছে, এবং সেই শিক্ষা প্রয়োগ করার দক্ষতা তাদের গড়ে উঠছে কি না, সে দিকে নিয়মিত নজর রাখার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা চাই।
অন্য দিকে, শ্রমের চাহিদা বাড়তে পারে তখনই, যখন রাজ্যে বৃহৎ শিল্প আসবে। অতি ক্ষুদ্র বা ক্ষুদ্র শিল্পে বঙ্গ দীর্ঘ দিন ধরেই ভারতের প্রথম সারির রাজ্য। তাতে যে বিশেষ লাভ হয়নি, রাজ্যের মানুষের অবস্থাতেই তা স্পষ্ট। তার কারণ হল, এ রাজ্যে এমএসএমই-র নামে যা আছে, তার অধিকাংশই কোনও এক জন মানুষের বেঁচে থাকার মরিয়া প্রচেষ্টা— তাকে শিল্প বলা মানে অতিরঞ্জনের চূড়ান্ত। এ রাজ্যে বড় লগ্নি চাই। তার পরিকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। তার জন্য সরকারকে মূলধনি খাতে ব্যয় বাড়াতেই হবে। গত দফায় খয়রাতির তাড়নায় সরকার মূলধনি খাতের ব্যয়কে দীর্ঘ দিন ধরে অবহেলা করেছিল। তার পরিমাণ পশ্চিমবঙ্গ ভোগ করছে। এ বছর অর্থমন্ত্রীর কর্তব্য, শিল্পে বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য কয়েকটি ক্ষেত্রকে বিশেষ ভাবে বেছে নেওয়া, এবং সেই ক্ষেত্রগুলির জন্য যা করা প্রয়োজন, তার কিছুতেই কার্পণ্য না করা। পশ্চিমবঙ্গ দীর্ঘ দিন ধরে ধুঁকছে। তার ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য আর একটি দিনও অপেক্ষা করা চলে না।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)