বাংলা ভাষায় বিরতি শব্দটির মধ্যে একটি সাময়িক ভাব আছে। আশা করা যায়, গত রবিবার থেকে যে অতিপ্রতীক্ষিত সংঘর্ষ-বিরতিতে রাজি হয়েছে ভারত ও পাকিস্তান, প্রথম দিকে তাতে কিছু ছেদ পড়লেও শেষ পর্যন্ত ‘বিরতি’টি স্থায়ী হবে। দুই পক্ষই বুঝবে, পারস্পরিক সংঘর্ষে বিরাম থেকে অবসানের দিকে গেলেই তাদের, এবং এই উপমহাদেশের সমস্ত মানুষের মঙ্গল। ইতিমধ্যেই প্রমাণিত, সাধারণ মানুষের জীবন কিংবা সম্পদ রক্ষা করে আক্রমণ রচনার ক্ষেত্রে ভারতীয় সেনাবাহিনী কত দক্ষ ও কৌশলী। আত্মসংবরণের ক্ষেত্রেও ভারতীয় সেনা কতখানি প্রশংসার্হ, তাও প্রমাণিত। ভারতের পাশাপাশি পাকিস্তানও যদি সমপরিমাণ বিবেচনা ও সংবরণ দেখায়, তা হলে এই ভয়ঙ্কর যুদ্ধ-সম্ভাবনাকে পাশে সরিয়ে রেখে বিকল্প পথে সমস্যার সমাধান ভাবা সম্ভব হতে পারে। বস্তুত, দিল্লির সঙ্কটটি তীব্র। পহেলগাম-ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে জঙ্গি হানার বিপদ কত ব্যাপক ও ভয়ানক। এমন ঘটনার পর যে কোনও রাষ্ট্রই সামরিক পথে সন্ত্রাসবাদীদের উত্তর দেওয়ার দায় বোধ করতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে, কেবল সামরিক পথেই যে দেশবাসীকে এই ব্যাপ্ত বিপদ থেকে বাঁচানো সম্ভব না হতে পারে, সেটা বোঝাও কঠিন নয়। প্রয়োজন, অতীব ঠান্ডা মাথায়, সমস্ত কূটনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিক হিসাব করে পা ফেলা, মূল লক্ষ্য অর্থাৎ জঙ্গি ঘাঁটি ও কার্যক্রমকে ধ্বংস করা। বড় মাপের সামরিক আঘাত-প্রত্যাঘাতের গোলকধাঁধায় ঢুকে পড়লে অনেক সময়েই এই মূল লক্ষ্য গুলিয়ে যেতে পারে। বিশ্বজনমতও অপ্রীতিকর হয়ে উঠতে পারে। সে দিক থেকে দেখলে, ‘অপারেশন সিঁদুর’ যেমন ভারতের পক্ষে আবশ্যিক ছিল, সীমিত সময়কালে সেই ‘অপারেশন’কে বেঁধে রাখাও ছিল অত্যন্ত জরুরি কাজ। দু’টি কাজেই ভারত সফল।
প্রশ্ন উঠেছে, বাইরের কোনও দেশের শীর্ষনেতার মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি ঘোষিত হল কেন। নয়াদিল্লির আগেই আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কেন এই ‘বিরতি’ ঘোষণার সুযোগ পেলেন। দুই রকমের ক্ষতি দেখা সম্ভব এখানে। প্রথমত, বিরোধীদের সঙ্গত প্রশ্ন, এতে বিশ্বের সামনে ভারতের দুর্বলতাই কি প্রকাশিত হল না? দ্বিতীয়ত, কাশ্মীর-সমস্যা যে আসলে একটি দ্বিপাক্ষিক সমস্যা, সুতরাং তাতে বাইরের কোনও শক্তির হস্তক্ষেপের জায়গা নেই— এই মর্মে ভারতের যে দীর্ঘকালীন অবস্থান, বস্তুত ১৯৪৭ সাল থেকেই কাশ্মীর-প্রশ্নের আন্তর্জাতিকীকরণ নিয়ে দিল্লি ও ইসলামাবাদের যে দ্বন্দ্ব— তার পরিপ্রেক্ষিতে কি ভারতের সম্মান ক্ষুণ্ণ হল না? পুরনো ইতিহাস থেকে নানা দৃষ্টান্ত পেশ করেও যুদ্ধবাদীরা প্রধানমন্ত্রী মোদীর সমালোচনা করছেন। এ ক্ষেত্রে কয়েকটি কথা স্পষ্ট বলা দরকার। কাশ্মীর-প্রশ্নে ভারতের দীর্ঘকালীন দাবিটি যাতে ক্ষুণ্ণ না হয়, তা নিশ্চিত করার ভার অবশ্যই দেশের বর্তমান সরকারের। এ কেবল নেতা, দল বা সরকারের সম্মানের বিষয় নয়, রাষ্ট্রিক সম্মানের বিষয়। কিন্তু এও সত্য যে, ভারত-পাকিস্তানের সামরিক সংঘর্ষ বা যুদ্ধে মধ্যস্থতা করা, আর কাশ্মীর-সমস্যার সমাধানে অর্থময় ভূমিকা পালন করা— এই দুইটিকে একেবারে এক করে দেখা অনুচিত। পুরনো সময়ের সঙ্গে এখনকার তুলনা টানাও অসঙ্গত। গত কয়েক দশকে বিশ্বকূটনীতির ছবিটি প্রভূত পাল্টেছে। ফলে এখন যদি কোনও মধ্যস্থতার সূত্রেই সংঘর্ষ থেকে শান্তির পথে দুই বিবদমান দেশকে টেনে আনা হয়, সেই পদক্ষেপকে স্বাগত জানানোই জরুরি। মোট কথা, বৃহত্তর সংঘর্ষে ভারতীয় জনসমাজকে টেনে নিয়ে যাওয়ার কোনও যুক্তি নেই, তাতে সুফল বা নিরাপত্তার আশাও নেই। এখন প্রয়োজন, শান্তির পথে দৃঢ় ও অবিচলিত থেকে, কূটনৈতিক দক্ষতা দেখিয়ে দেশবিরোধী সন্ত্রাসকে প্রতিহত ও বিনাশ করা। প্রধানমন্ত্রী মোদী গত কালের ভাষণে বলেছেন, পাকিস্তানের সঙ্গে এ বার কথা হবে— সন্ত্রাস বিষয়েই। দেশের সমস্ত রাজনৈতিক দল, সামাজিক বলয় কিংবা গোষ্ঠী সে কাজে পূর্ণ সহায়তা দেবেন, এটাই প্রত্যাশিত।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)