E-Paper

স্বস্তিপর্ব

এ বারের ভোটে কেন্দ্রের বিপুল আধা-সামরিক বাহিনী প্রেরণ ও মোতায়েন নিয়ে অনেক কথা ইতিমধ্যেই হয়েছে— ২৪০৭ কোম্পানি মুখের কথা নয়। ভোটগ্রহণ পর্বের শেষে সারসংক্ষেপ, বেশ কিছু ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কঠোরতা দেখা গেল যা অনাবশ্যক ছিল।

শেষ আপডেট: ৩০ এপ্রিল ২০২৬ ০৭:২৮

পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনের দুই দফা সমাপ্ত। সাময়িক স্বস্তি। রাজ্যবাসী অনুভব করছেন— এ বার মোটের উপর শান্ত পরিবেশে ভোটদান সম্ভব হয়েছে। তার অর্থ এই নয় যে কোনও অশান্তির ঘটনা ঘটেনি। এর মধ্যেও বেশ কিছু জায়গায় দলবদ্ধ গোলযোগ, ভীতি প্রদর্শন, বলপ্রয়োগ, লাঠিচার্জ সবই চলেছে, যেমন ফলতায়, ভবানীপুরে, হাওড়ায়, তারকেশ্বরে। প্রথম দফার থেকে দ্বিতীয় দফায় অশান্তির ঘটনা বেশি— স্পষ্টতই। কিন্তু তা সত্ত্বেও দুই দফাতেই ভোটদানের হার নব্বই শতাংশ বিন্দু স্পর্শী কিংবা অতিক্রান্ত, যা সারা দেশের মধ্যেই দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা চলে। প্রথম দফায় কোনও পুনর্নির্বাচনের নির্দেশ আসেনি, আশা থাকছে দ্বিতীয় দফাতেও অধিক সংখ্যায় তা আসবে না। এই ভোটের জন্য অনেকখানি কৃতিত্ব দাবি করতেই পারে নির্বাচন কমিশন। পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন নিয়ে নির্বাচন কমিশন যে অদক্ষতা, অপরিণামদর্শিতা ও ক্ষেত্রবিশেষে অনৈতিকতার পরিচয় দিয়েছে, তার পাশাপাশি নির্বাচন পরিচালনায় দেখা গেল সুশৃঙ্খল ও সুষ্ঠু পরিকল্পনা। গ্রামীণ ও নাগরিক পরিমণ্ডলের জন্য আলাদা ভাবে নির্বাচন কমিশনের বিশদ বিবেচনা— প্রশংসার্হ।

এ বারের ভোটে কেন্দ্রের বিপুল আধা-সামরিক বাহিনী প্রেরণ ও মোতায়েন নিয়ে অনেক কথা ইতিমধ্যেই হয়েছে— ২৪০৭ কোম্পানি মুখের কথা নয়। ভোটগ্রহণ পর্বের শেষে সারসংক্ষেপ, বেশ কিছু ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কঠোরতা দেখা গেল যা অনাবশ্যক ছিল। বাহিনীর বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে ভীতিপ্রদর্শনের অভিযোগ উঠল, যা অবাঞ্ছিত ছিল। গ্রাম-মফস্‌সলে পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনী অকারণ প্রহারে আত্মসন্তোষ লাভ করল, এমনকি মহিলাদের উপরেও, যা অতীব আপত্তিকর। এতদ্ব্যতীত, বাহিনীর ভূমিকা সন্তোষজনক। তবে কিনা, এ বারের ভোটদানের হার বেশি থাকার প্রধান কারণ বাহিনী-বাহুল্য নয়— কেননা সংখ্যা ও পরিচালনার দিক দিয়ে ২০২৬ সালে দুই দফায় ২৪০৭ কোম্পানি, আর ২০২১-এ আট দফায় ১০৮৩ কোম্পানির বাস্তব উপস্থিতি মোটের উপর তুলনীয়ই বলা যেতে পারে। মূল হেতুটি হয়তো ভোট পরিচালনার আঙ্গিক পরিবর্তন। জনসংখ্যা অনুপাতে বুথ বাড়ানো, ব্যাপক প্রচার, যথাবিধি শাস্তির ভয়, সব মিলিয়ে ভোট-পরিবেশকে শান্তি-সহায়ক করা সম্ভব হয়েছে। প্রধান বিরোধী দল বিজেপির তাণ্ডব তৈরির প্রয়াস এবং শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের কর্মী-সমর্থকদের অতিপরিচিত গুন্ডামি, শাসানি, হুমকি কোথাও কোথাও নজরকাড়া হলেও অন্যান্য বারের মতো মাত্রাছাড়া নয়, রাজ্যের জন্য এটুকুই সুখবর।— অবশ্যই আংশিক সুখবর।

আংশিক, কেননা এ বারের ভোটে সুখবর কোনও মতেই সম্পূর্ণ হতে পারে না বিপুল বাতিল ভোটারদের কথা মনে রাখলে। ভোটের আগের দিনও সংবাদ এসেছে, ভোটার তালিকা থেকে শেষ অবধি কে বাদ পড়ছেন, কে পড়ছেন না। সোমবার রাত পর্যন্ত বিচারবিভাগীয় ট্রাইবুনালে নিষ্পত্তি হওয়া আবেদনের মধ্যে ১৪৬৮ জন ভোটাধিকার ফিরে পেয়েছেন, যাঁরা দ্বিতীয় দফার ভোটে যোগ দিতে পারলেন। এ দিকে যে-হেতু সাতাশ লক্ষ নামের মধ্যে অতি স্বল্প নামই আদৌ ট্রাইবুনাল পর্যন্ত পৌঁছেছে, ধরে নেওয়া যেতে পারে, যাঁদের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি, তাঁদের অনেকেই শেষ অবধি ভোটাধিকার ফিরে পেতে পারতেন, কিন্তু পেলেন না। অর্থাৎ তাঁরা ‘বৈধ ভোটার যাঁরা এ বার ভোট দিতে পারলেন না’। দেশের শীর্ষ আদালত যদিও জানিয়েছে এক বার ভোট দিতে না-পারা মানেই চিরতরে ভোটাধিকার চলে যাওয়া নয়, তবু গণতান্ত্রিক যুক্তি বলে, ভোটারকে এক বার ভোট দিতে না দেওয়াও রাষ্ট্রের অধিকারের মধ্যে পড়ে না। এই বিপুলাকার অন্যায় নির্বাচন কমিশনের ‘সৌজন্যে’ ঘটতে পারল। সুতরাং শেষ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের সুষ্ঠু সমাধা সত্ত্বেও নির্বাচন কমিশনের কৃতিত্ব— সীমিত ও আংশিক।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

West Bengal Politics Voters Election Commission of India central forces

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy