Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

২৮ জানুয়ারি ২০২২ ই-পেপার

চ্যানেলে মিটেছে পড়শির ঝগড়া, সিরিয়াল ভাগ দামে

কেবল টিভি এবং ডিটিএইচ পরিষেবায় চালু হয়েছে নতুন নিয়ম। তাতে ঘরে ঘরে ঝগড়া। কেবল কর্মীরাও সিঁটিয়ে। উল্টো ছবিও রয়েছে। লিখলেন অভিজিৎ চক্রবর্তীএত

১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ ০১:২৯
দর্শক: কেবল টিভিতে। নিজস্ব চিত্র

দর্শক: কেবল টিভিতে। নিজস্ব চিত্র

দিন চার-পাঁচেক হল ঠাম্মি-নাতনির মুখ দেখাদেখি বন্ধ। ছেলের কথা না শোনায় মায়ের সঙ্গে কথা বন্ধ ছেলের। ঠিকঠাক পড়াশোনা নেই। নিজের পছন্দের চ্যানেল রাখতে গিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে স্বামী। চ্যানেল বাছাইয়ে শান্তিকল্যাণের ঘটনাও ঘটছে। মুখ দেখাদেখি বন্ধ প্রতিবেশীর বাড়িতে গিয়ে সিরিয়াল দেখছেন পাড়াতুতো জা।

এত ঘটনা। কারণ একটি। ২৮ ডিসেম্বর মাঝ রাত থেকে কেবল টিভি এবং ডিটিএইচ পরিষেবায় চালু হয়েছে নতুন নিয়ম। ফলে বাজেট বুঝে গ্রাহকদের চ্যানেল বাছতে হবে। দূরদর্শনের চ্যানেলগুলো (২৫টি) নিয়ে মোট ১০০টি এসডি চ্যানেল দেখার অধিকার পেতে ক্যাপাসিটি ফি গুনতে হবে সর্বোচ্চ ১৩০ টাকা (জিএসটি বাদে)। চাইলে এমএসও বা কেবল অপারেট তারও কম নিতে পারেন। শুধু এফটিএ চ্যানেল নিলে ক্যাপাসিটি ফি গুনলেই হবে। পে চ্যানেলে লাগবে আলাদা মাসুল। খরচ নির্ভর করবে মূলত দু’টি বিষয়ের উপরে। প্রথমত, কতগুলো চ্যানেল দেখার অধিকার (নেটওয়ার্ক ক্যাপাসিটি) নেওয়া হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে কেউ ১০০টির অধিকার নিয়ে রেখেও শুরুতে ৫০টি চ্যানেল (দূরদর্শনের চ্যানেলগুলো ধরে) নিতে পারেন। সে ক্ষেত্রে পরে আরও ৫০টি নিতে পারেন আলাদা করে। সেক্ষেত্রে সংযোগ-ফি আর লাগবে না। এইচডি চ্যানেলের পুরো হিসেব আলাদা। একটি এইচডি চ্যানেল দু’টি এসডি চ্যানেলের সমান। ১০০টির বেশি চ্যানেল দেখতে প্রতি ২০টি বাড়তি চ্যানেলে সংযোগ ফি লাগবে ২৫ টাকা পর্যন্ত। এর সঙ্গে জিএসটি ধরা নেই। অর্থাৎ বাড়তি ৪০টি চ্যানেলে ৫০ টাকা। সঙ্গে পে –চ্যানেলের মাসুল। সবক্ষেত্রেই জিএসটি দিতে হবে।

এখন পরিস্থিতি কী? ১০০ টাকায় দূরদর্শন-সহ ১০০টি ফ্রি-টু-এয়ার (এফটিএ) চ্যানেল মেলে। সেগুলোর সঙ্গে আলাদা করে নিজের পছন্দ অনুযায়ী আরও এফটিএ এবং পে চ্যানেল (যার জন্য আলাদা টাকা লাগে) একটি একটি করে বাছা যায়। অনেক সময়ে দু’টি মিলিয়ে প্যাকেজ তৈরি করে দেয় এমএসও-গুলো। চ্যানেল সংস্থা নিজের একাধিক চ্যানেল নিয়ে প্যাকেজ বা তৈরি করতে পারে।

Advertisement

গ্রাহকদের একাংশের বক্তব্য, এলসিও বা এমএসও-দের কাছে পছন্দের তালিকা জমা দিলেও সেই অনুযায়ী চালু হয়নি পরিষেবা। ইচ্ছে না থাকলেও প্যাকেজ নিতে বাধ্য হচ্ছেন অনেকে। কিছু ক্ষেত্রে বন্ধ হয়ে গিয়েছে কেবল পরিষেবা। ট্রাই অবশ্য জানিয়েছে, মাল্টি সার্ভিস অপারেটরদের (এমএসও) দ্রুত সাময়িক প্যাকেজ চালু করতে বলা হয়েছে। সেই প্যাকেজে কিছু ফ্রি টু এয়ারের সঙ্গে কিছু পে-চ্যানেলও থাকবে। ৩১ মার্চের মধ্যে গ্রাহক তাঁর পছন্দের চ্যানেলের তালিকা দিলে সাময়িক প্যাকেজ বদলে সেই চ্যানেলগুলো চালু হবে।

নিয়মের ফেরে কেবল কর্মীদের কাছে যাতায়াত বাড়ছে উপভোক্তাদের। কোনও চ্যানেল থাকবে। আর কাকে বিদায় দেওয়া হবে। আর তাতেই ‘গৃহযুদ্ধ’ বাধার উপক্রম। সারা দিন কাজ সেরে স্বস্তিতে বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান চোখে পড়ছে বাচ্চারা কার্টুন পাচ্ছে না। খেলার উত্তেজনা থেকে বঞ্চিত তরুণদের একাংশ। সরকারের এমন ইতিবাচক সিদ্ধান্ত স্বাভাবিক হতে আরও সময় লাগবে। কিন্তু তার আগে জটিল সমস্যায় দাঁড়ি পড়বে কবে-তা কেউ ভাবতে পারছেন না। অস্বস্তিকর পরিবেশ কেবল প্রতিষ্ঠানগুলোতে। অপারেটরদের কাছে গিয়ে ঝগড়া শুরু করে দিচ্ছেন গ্রাহকদের একাংশ। তা দেখে কেবল কর্মীরা অফিস থেকে মাঝে মধ্যে উধাও হয়ে যাচ্ছেন। নিয়ম যে তৃণমূল স্তরে বিভ্রান্তি তা কেবল অপারেটরদের সঙ্গে কথা বললেই বোঝা যায়। যেমন পশ্চিম মেদিনীপুরের কেবল কর্মীদের দাবি, এখনকার সিস্টেমে বাড়িতে কেবল সুবিধা রাখতে গেলে ১৫৪ টাকা খরচ করতেই হবে। এর পর প্যাকেজ নির্ধারণ। খেলা খবর থেকে বিনোদনমূলক চ্যানেল দেখতে খরচ কমপক্ষে ২০-২৫ টাকা। দু’টি-তিনটি চ্যানেল রাখতে গেলেও জিএসটি খরচ নিয়ে ২০০ টাকা পড়বে। তার সঙ্গে খেলার চ্যানেল রাখলে আরও ৫০-৬০ টাকা যোগ হবে। এর সঙ্গে কার্টুন বা ডিসকভারি বা অন্য চ্যানেল নিলে আরও ২০০-৩০০ টাকা। এই সাধারণ হিসেবে খরচ দেড়শো টাকা থেকে এক ধাক্কায় বেড়ে হচ্ছে সাতশো টাকা। সাধারণ আয়ের পরিবারগুলো কোথায় পাবেন এত টাকা? ফলে চ্যানেলে কাটছাঁট। তার ফল সংসারে লড়াই।

ঘাটাল শহরের ইন্দু সরকার বলছিলেন, “আমি রোজ আটটি সিরিয়াল দেখি। চ্যানেল ঘুরিয়ে। এখন ওই সব সিরিয়াল দেখলে ৫০০ টাকা পড়বে। বাদ-টাদ দিয়ে ৩০০ টাকায় গোটা পাঁচেক সিরিয়াল দেখতে পেতাম। ছেলে যদিও বা রাজি হল, নাতনি বলছে ডিসকভারি এবং খেলার চ্যানেল নিতে হবে। ছেলে সংযোগ কেটে দিয়েছে।” দাসপুরের তরুণী প্রীতিলতা মণ্ডল বলছিলেন, “খেলার চ্যানেল রাখছি না বলে ছেলে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছে। সময়ে খাচ্ছে না। পড়তেও বসছে না। ঠিকঠাক কথা বলছেও না। কী করুন বলুত তো?”

ঘাটালের কেবল ব্যবসায়ী অরূপ মাঝি বলছিলেন, “সাময়িক ভাবে কেবল শিল্পে বড়সড় আঘাত এসেছে। আমাদের মুনাফাও কমেছে। কী ভাবে এরপর এত কর্মীর বেতন দেব, ভাবছি। বহু উপভোক্তা কমছে।”

ঘাটালের অন্য এক কেবল ব্যবসায়ী শৈবাল চট্টোপাধ্যায় এবং পার্থপ্রতিম চৌধুরী (টিঙ্কু) বললেন, “নতুন নিয়ম চালু হতেই ঘরে ঘরে ঝগড়া শুরু হয়েছে। সেসব সামালতেই আমাদের সময় দফারফা অবস্থা। ব্যবসায় ঘা পড়েছে। ব্যবসার ছন্দটা কেটে গেল।” মঙ্গলবার ঘাটাল শহরের এক কেবল অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে কোন্নগরের বাসিন্দা সুমিত্রা পাল আবার বলছিলেন, “লোকের কী হচ্ছে বলতে পারব না। আমরা একটা ব্যবস্থা করেছি। আমাদের অবস্থা অনুযায়ী, দু’টো সিরিয়াল চ্যানেল রাখছি। আমি আর পাড়ার এক জা দু’জনে মিলে টাকা দেব, আমিও ওদের বাড়ি যাব। ওই জা-ও আমাদের বাড়িতে আসবে।” সুমিত্রার কথায়, “এতদিন মুখ দেখাদেখি বন্ধ ছিল। এখন চ্যানেলের বাড়ন্ত কথা শুরুর পথ খুলে দিল।”

কেবল ব্যবসায়ী অরূপ মাঝি বললেন, “এটি একটি জরুরি পরিষেবা। বিচিত্র অভিজ্ঞতা হচ্ছে। কেউ ৭০০ টাকা দিয়ে চ্যানেল কিনছেন। কাউকে ২০০ টাকার চ্যানেল নিতে দশবার ভাবতে হচ্ছে।’’

অধিক ভাবনায় ব্যবসা নষ্ট। সংসারের শান্তিও।

আরও পড়ুন

Advertisement