বাংলা সংস্কৃতির সঙ্গে পীর ঐতিহ্যের যোগ অতি প্রাচীন। ইতিহাসবিদেরা মনে করেন, মধ্যযুগে বাংলায় ইসলাম ছড়িয়ে পড়ার পিছনে এই পীরদের অবদান ছিল। লোকসংস্কৃতি গবেষক মিহির চৌধুরী কামিল্যা তাঁর ‘আঞ্চলিক দেবতা ও লোকসংস্কৃতি’ গ্রন্থে পীরদের আধ্যাত্মিক গুরু বলে অভিহিত করেছেন। সাধারণত কোনও খ্যাতনামা সাধকের মৃত্যুর পরে তাঁকে পীরের মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করে, তাঁর অনুগামীরা সেই পীরের সমাধির উপরে মাজার তৈরি করতেন। বাংলার নানা প্রান্তে ছড়িয়ে রয়েছে এমন অসংখ্য পীরস্থান। এগুলি আবহমান কাল ধরে সম্প্রীতির সুরে বেঁধে রেখেছে হিন্দু-মুসলিম এই দুই সম্প্রদায়কে। সাধারণ ভাবে দেখা যায়, এই সব পীরের মাজারে হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষই শিরনি দেন, চাদর চাপান, বাতাসা ছড়ান। 

রাঢ় বাংলার নানা প্রান্তের সঙ্গে পীর ঐতিহ্যের যোগ অনেক পুরনো। রাঢ় বাংলার নানা জায়গায় অসংখ্য পীরের মাজার ছড়িয়ে রয়েছে। বর্ধমান শহরের খোক্কর সাহেব ও ‘পীরবহরম’, ঘুটিয়ারি শরিফের ‘পীর মোবারক গাজী’, বিষ্ণুপুরের ‘সত্যপীর’, মেমারির ‘মঙ্গলপীর’, উচালনের ‘মকদুমপীর’-এর মাজারে নানা ধর্মের মানুষ সমবেত হন। এই সব সমাধি অধিকাংশই মধ্যযুগের।

পূর্ব বর্ধমান জেলার একটি প্রাচীন জনপদ হল ‘জৌগ্রাম’। এই জৌগ্রামের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ‘বদরপীর’-এর প্রসঙ্গ। একটা সময় জৌগ্রামের বদরপীরতলা ছিল হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক মেলবন্ধন তৈরির অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র। তবে জৌগ্রামের ‘বদরপীর’ প্রসঙ্গে কিছু বলার আগে বদরপীর এবং জৌগ্রামের ইতিবৃত্তটা জেনে নেওয়া খুবই জরুরি।

সাধারণ ভাবে বদরপীরকে আমরা ‘জলপথের রক্ষাকর্তা’ হিসেবেই জানি। বাংলাদেশের উপকূলবর্তী জেলার নাবিকেরা নৌযাত্রার আগে বদরপীরের নাম উচ্চারণ করে হাল ধরতেন। এই বদরপীর এক সময় স্থানীয় ভাষায় ‘চাটি’ নামের ছোট প্রদীপ জ্বেলে একটি জনপদের সব ভূতপ্রেত দূর করা দায়িত্ব নিয়েছিলেন এমন মত প্রচলিত রয়েছে। সেই সূত্রেই বাংলাদেশের ‘চাটিগাঁ’ বা ‘চট্টগ্রাম’ নামের উদ্ভব বলে মনে করেন অনেকে। চট্টগ্রামে বদরপীরের বিরাট বড় মাজার রয়েছে। যেখানে বাংলাদেশের নানা প্রান্ত থেকে মানুষ এসে ভিড় করেন। এই ‘বদরপীর’ কে, কী কারণে তাঁকে ‘জলপথের রক্ষাকর্তা’ বলা হয়, তা নিয়ে নানা মুনির নানা মত। তবে বাংলাদেশের নানা প্রান্তে, এমনকি, আমাদের পশ্চিমবঙ্গেও মাঝিমাল্লারা জলযাত্রায় বিপদে পড়লে বদরপীরকে স্মরণ করতেন। 

জৌগ্রামের সঙ্গে আগে জলপথের একটি যোগ ছিল। পূর্ব বর্ধমানের জামালপুরের কাছে এক সময়ে দামোদরের মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একটি শাখা দক্ষিণ-পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয়েছিল। অনেকের মতে এই শাখাটির নাম উছবেলিয়া নদী। এই উছবেলিয়া নদীর ধারেই প্রাচীন জৌগ্রাম জনপদটি অবস্থিত। জৌগ্রামে প্রাচীন জলেশ্বর শিবের দেউলের পাশাপাশি রয়েছে বদরপীরের মাজার যা ‘বদরসাহেব তলা’ নামে পরিচিত। প্রধানত হিন্দু জনবসতিপূর্ণ স্থান হলেও এখানে অনেক দিন ধরে পূজিত হয়ে আসছেন ‘বদরপীর’। 

ঠিক কী কারণে জৌগ্রামের মতো একটি গ্রামে বদরপীরের মাজার গড়ে উঠল, তা নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। একাংশের মতে, আগে এই জলপথ ছিল পণ্য ও যাত্রী পরিবহণের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। জলপথে যাতায়াতের কারণেই, এই অঞ্চলের বাসিন্দাদের বদরপীরের প্রতি নির্ভরতা জেগে উঠেছিল বলে ইতিহাসবিদেরা মনে করেন। জৌগ্রামের বদরপীরকেও ‘জলপথের রক্ষাকর্তা’ বলে অভিহিত করা হয়ে থাকে। আবার ইতিহাসবিদদের একটি অন্য অংশের দাবি, মধ্যযুগে  কোনও এক সাধকের কারণে এই পীরের মাজারটি তৈরি হয়েছিল। এ বিষয়ে একটি জনশ্রুতিও প্রচলিত রয়েছে। সেই জনশ্রুতি অনুসারে, মধ্যযুগে এক  ফকির এই গ্রামে এসে সাধনা করতেন। গ্রামের হিন্দু–মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষই তাঁর শিষ্যত্ব নিয়েছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পরে তাঁর সমাধিকে কেন্দ্র করে এই পীরের মাজারটি গড়ে তোলা হয়। শোনা যায়, এখানে যে পীর সাহেব এসেছিলেন, তিনি ছিলেন অলৌকিক শক্তির অধিকারী। তিনি আজও সাদা ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে এলাকা প্রদক্ষিণ করেন— এমন বিশ্বাস প্রচলিত রয়েছে এলাকাবাসীর মধ্যে। তবে সেই সাধকের নাম কী ছিল, বা কোথা থেকে তিনি এসেছিলেন সে সম্পর্কে আজ আর প্রায় কোনও তথ্য পাওয়ার অবকাশ নেই। 

কালক্রমে জীর্ণ হয়ে এসেছে পীরের সমাধি ও তার উপরে গড়ে তোলা মাজারটি। মাজারের মূল কাঠামোটি এখন প্রায় ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়ে। মাজারের দেওয়াল ভগ্নপ্রায়। গাছের শিকড়ের উপরেই মাজারের খিলানটুকু কোনও রকমে দাঁড়িয়ে রয়েছে। মাজারের সামনে পড়ে রয়েছে অসংখ্য মাটির ঘোড়া। প্রতি বৃহস্পতিবার এখানে ভক্ত সমাগম হয়ে থাকে। ধূপ, মোমবাতি আর বাতাসা নিয়ে পীরের সমাধির সামনে আজও জড়ো হন গ্রামের বাসিন্দারা। বৃহস্পতিবারে আসা ভক্তেরাই এখানে পীরকে মাটির ঘোড়া নিবেদন করে তাঁদের মনস্কামনা জানান। দীর্ঘদিন বদরসাহেবতলার তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন মোলাম্মা। তাঁর প্রতি গ্রামবাসীদের ভক্তি আজও অটুট। তাঁর মৃত্যুর পরে এই পীরতলার দায়িত্ব সামলাচ্ছেন তাঁর ভাই ৮৮ বছরের রমজান আলি এবং তাঁর দিদি ৯৩ বছরের উমেতি বিবি। এখন আর এই এলাকায় নদীর কোনও অস্তিত্ব নেই। কিন্তু, বদরপীরের সৌজন্যে জৌগ্রাম হয়ে উঠেছে জাতিধর্ম নির্বিশেষে সকলের মিলনক্ষেত্র। 

প্রাক্তন ব্যাঙ্ককর্মী এবং মশাগ্রামের সাহিত্যকর্মী