রদ্দিমার্কা সিনেমাতেও এর থেকে ভাল চিত্রনাট্য দেখা যায়। পাঁচ জনকে এক দিনে দেশের নানা কোণ থেকে গ্রেফতার করা এবং অন্য আরও কয়েক জনের বাড়ি-অফিসে হানাদারির চিত্রনাট্য যিনি লিখেছিলেন, তাঁর এখনই চাকরি যাওয়া উচিত।

দিল্লি হাই কোর্ট যেন প্রকারান্তরে সেটাই দিল্লি ম্যাজিস্ট্রেটকে বলেছে। গৌতম নওলাখাকে জেলে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়ার আগে ওই ম্যাজিস্ট্রেট পুণের পুলিশের কেস ডায়রিটি পর্যন্ত দেখেননি। পুণে পুলিশ ডায়রিটি দেখাতেই পারেনি। এমনিতেও তার মর্মোদ্ধার করা দিল্লির পক্ষে মুশকিল ছিল, কেননা সেটা মরাঠি ভাষায় লেখা! তা, ম্যাজিস্ট্রেট মশাই অতশত ঝামেলায় না গিয়েই সোজা ইউএপিএ ধারায় নওলাখাকে অভিযুক্ত ধরে নিয়ে জেলে চালান করার হুকুম দেন।

হাই কোর্টের প্রশ্নটি মর্মভেদী। ম্যাজিস্ট্রেট কি ভুলে গিয়েছিলেন যে তিনি একটি গুরুতর সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করতে বসেছেন? তিনি কি জানতেন না যে তাঁর এক নির্দেশের ঘায়ে এক ব্যক্তির স্বাধীন জীবনযাপনের অধিকারটাও চলে যেতে পারে? ইউএপিএ (আন-ল’ফুল অ্যাকটিভিটিজ় প্রিভেনশন অ্যাক্ট) ধারায় অভিযুক্ত হলে কেউ জামিন পর্যন্ত পেতে পারেন না, সেইটুকু নাগরিক অধিকারও তাঁর থাকে না, অথচ কী অভিযোগ সে বিচার দূরস্থান, কিছু না দেখেই এমন একটা সাংঘাতিক অভিযোগ কী ভাবে সমর্থন করলেন তিনি?

ম্যাজিস্ট্রেটের দোষ কী। মঙ্গলবার যখন এঁদের আদালতে দাখিল করা হচ্ছিল, তখন পুলিশই তো ঠিক করে বলতে পারছিল না, কোন কারণে এঁদের আনা হয়েছে। আমতা-আমতা বক্তব্য শুনে উপস্থিত ব্যক্তিরা প্রথমে মনে করলেন, এঁরা প্রধানমন্ত্রীকে হত্যার পরিকল্পনা করছিলেন। কিছু ক্ষণের মধ্যে অভিযোগের চরিত্র পাল্টে গেল, শোনা গেল, এঁরা নাকি গত পয়লা জানুয়ারি মহারাষ্ট্রে ভীমা-কোরেগাঁওতে দলিত বনাম হিন্দুত্ববাদীদের মধ্যে সংঘর্ষে যুক্ত ছিলেন। দেশের অন্যতম প্রধান টেলিভিশন চ্যানেলকে পুণের সিনিয়র পুলিশ অফিসার বললেন, সন্ত্রাস তৈরির চেষ্টা করছিলেন এঁরা। অথচ ভীমা-কোরেগাঁও সংঘর্ষের পর যে চার্জশিট তৈরি হয়েছিল, তাতে এঁদের নামও ছিল না, এই পাঁচ ব্যক্তি সে দিন ভীমা-কোরেগাঁও অকুস্থলে হাজিরও ছিলেন না। ব্যাপারটা কী দাঁড়াল তবে? সুপ্রিম কোর্টের বিচারক চন্দ্রচূড়ের অবিশ্বাসময় তির্যক প্রশ্নই বুঝিয়ে দেয় পরিস্থিতি কতটা ভয়ঙ্কর: ‘‘কোরেগাঁও-এর নয় মাস পর আপনারা গেলেন আর এঁদের গ্রেফতার করে আনলেন?’’

অর্থাৎ, কোনও নাগরিককে, বিশেষত কোনও স্বনামধন্য মেধাজীবী নাগরিককে, গ্রেফতার করার জন্য যে আইন-মতে সতর্ক পথে এগোতে হয়, সেই প্রয়োজনটাকে আমাদের বর্তমান ভারত পাত্তা দেয় না। রাঁচিতে আশি বছরের ফাদার ও দলিত-সমাজকর্মী স্ট্যান স্বামীর বাড়ি তন্নতন্ন হানাদারি চলল, কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগটা কী, তিনি নিজে দাঁড়িয়ে থেকেও জানতে পারলেন না। গোয়ায় বর্ষীয়ান প্রফেসর তেলতুম্বডের অফিস ও বাড়িতে হানা দেওয়া হল তাঁর অনুপস্থিতিতেই, যেন এক জন অধ্যাপক আর এক জন চিহ্নিত সন্ত্রাসবাদীর মধ্যে কোনও পার্থক্যই নেই। অতীত ভারত হলে এ প্রশ্নও তুলতাম যে এমনকি সন্ত্রাসবাদীর বাড়িতেও এ ভাবে হানা দেওয়াটা নৈতিক কাজ কি না। কিন্তু এই বর্তমান ভারতে বসে আর সে প্রশ্ন তুলছি না। অপরাধ-অপ্রমাণিত নাগরিকের ক্ষেত্রেই প্রশ্নটাকে সীমাবদ্ধ রাখছি। যদ্দূর জানি, মানুষকে এ ভাবে ‘হ্যারাস’ করার আইন এখনও আমাদের নেই, বা থাকলেও সেই আইন সরকার-ঘোষিত জরুরি অবস্থা ছাড়া কখনও ব্যবহার হয়নি— তাই তো?

এমন নয় যে আগে কখনও অ্যাকটিভিস্টদের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ করা হয়নি কিংবা তাঁদের গ্রেফতার করা হয়নি। কিন্তু বলতেই হচ্ছে, এ বারের ঘটনাটা গত সব বারের থেকে আলাদা। মানবাধিকার কর্মীদের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক সব সময়ই গোলমেলে, আমাদের দেশেও চিরকাল তা-ই থেকেছে। কিন্তু এ বারের ঘটনা দেখিয়ে দেয়, এ কেবল অ্যাকটিভিস্ট বনাম রাষ্ট্রের পরিচিত সংঘর্ষ নয়, এর মধ্যে আরও বড় একটা বিষয় রয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের মাননীয় বিচারপতিরা একেবারে ঠিক জায়গাতেই তির মেরেছেন। এই পাঁচ জনের এক-এক জনকে ধরা হল কোন আইনের কোন ধারায়— এর মধ্যেই মামলাটা সীমাবদ্ধ নয়। এর মধ্যে একটা ‘বড় কথা’ আছে, ‘ডিসেন্ট’কে গলা টিপে মেরে ফেলার একটা বন্দোবস্তের বার্তা আছে। এই বার্তা যে— কোনও বিরোধিতা বর্তমান সরকার সহ্য করবে না।

পাঁচ জনকে ধরার পদ্ধতি থেকেই এই সিদ্ধান্তে আসাটা সহজ হয়ে যায়। আসল কথা, অভিযোগ এবং নথিপত্র ইত্যাদি নিয়ে ভাবার সময় হয়নি ততটা, সেগুলো গুরুত্বপূর্ণ নয় বলেই। ওঁদের ধরতে হবে, এটাই গুরুত্বপূর্ণ। এক সঙ্গে অনেকগুলি শহর থেকে অনেক মানবাধিকার কর্মী লেখক, সাংবাদিক, উকিলকে ধরতে হবে, কেননা এ সব দেখলে সকলেই বুঝবে, ট্যাঁফোঁ করা যাবে না, নয়তো মুশকিল হতে পারে। মানুষের কাছে, বিশেষ করে প্রতিটি লিবারাল মানুষের কাছে বার্তাটা পৌঁছে দেওয়া জরুরি যে যে কোনও মুহূর্তে তাঁরাও কিন্তু...

এ জন্যই ‘আর্বান নক্সাল’ বলে একটা মোক্ষম শব্দ সরকারি তরফে ঘোষিত হল, যাতে সমস্ত মুক্তচিন্তার মানুষ বুঝতে পারেন, তাঁরা প্রত্যেকেই টার্গেট। অর্থাৎ বর্তমান ভারতে ‘আর্বান নক্সাল’ হওয়া এবং/ফলত সরকারের নিশানা হওয়ার জন্য যে সামান্য ‘অপরাধ’টুকু ঘটানো দরকার, সেটা হল— সমাজের প্রান্তিক মানুষদের লড়াইকে সমর্থন করা, কিংবা কোনও না কোনও ভাবে কাজে বা চিন্তায় তাঁদের লড়াইয়ে শরিক হওয়া। এই যে পাঁচ জন, এখনও এঁদের কোনও অপরাধের খোঁজ পাওয়া যায়নি, কেবল জানা আছে এঁরা কোনও নিষিদ্ধ সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত নন, সকলেই সমাজের মূলস্রোতে বসবাস করেন, প্রফেশনাল জীবন যাপন করেন, আয়করও দেন। তার মধ্যেই তাঁরা প্রান্তিকদের আন্দোলন সংগঠন করার কথা বলেন, দলিত বা আদিবাসীদের পক্ষে দাঁড়িয়ে আদালতে সওয়াল করেন। গণতন্ত্রে এইটুকু অধিকার থাকারই কথা, কিন্তু বর্তমান ভারতে তা নেই, থাকবে না। 

বলতেই হবে, পুরো ঘটনাটা থেকে কিন্তু বড় একটা উপকার হল। সত্যিই তো, কোদালকে অন্য পাঁচটা নামে ডেকে দরকার কী। নরেন্দ্র মোদী সরকারের বিরুদ্ধে প্রথম বার, প্রত্যক্ষ ভাবে, ‘ফ্যাসিস্ট’ শব্দটা উচ্চারণের ঘটনা ঘটল এ বার, এ হয়তো কোনও আশ্চর্য সমাপতন নয়। কী অদ্ভুত পরিহাস, শোনা যাচ্ছে সেই উচ্চারণ ঘটেছে সরকারি আইনজীবীর মুখেই। পুণে আদালতে না কি সরকারি আইনজীবী নালিশ করেছেন যে— এই পাঁচ জন লোক ‘অ্যান্টি-ফ্যাসিস্ট ফ্রন্ট’ তৈরি করে সরকারকে উৎখাত করতে চাইছিলেন।— আরে, তাই তো, অ্যান্টি-ফ্যাসিস্ট ফ্রন্টকে আটকাতে চান যাঁরা, তাঁদের তো পুলিশ ডায়রির অপেক্ষা না করে দৌড়ে গিয়ে গ্রেফতার করতেই হবে!

যুক্তি একেবারে পরিষ্কার, নিজের নাক কাটার মতোই ক্ষুরধার! বুঝতে অসুবিধে হয় না, নিজেদের নাক কাটার মতো যুক্তিপদ্ধতি প্রকাশ হয়ে পড়বে বলেই বর্তমান ভারতের প্রধানমন্ত্রী কেবল নিজের ‘মনের কথা’ শোনান, ভুলেও আলাপ-আলোচনায় যান না, সাংবাদিক বৈঠক করেন না। যাতে কেউ তাঁকে জিজ্ঞাসা না করে— যারা সাংবাদিক গৌরী লঙ্কেশ বা ডাক্তার দাভোলকরকে প্রকাশ্যে মেরেছে, সেই হিন্দু সন্ত্রাসবাদী চক্রের সন্ধান মেলা সত্ত্বেও কেন তাদের ধরা হয় না, কিংবা দেশ জুড়ে খুনের পর খুন করে-চলা গোরক্ষকচক্র কেন পুলিশের অধরা থেকে যায়। মুসলিম কন্যাদের ধর্ষকরা বিজেপি নেতাদের পাশে আশ্রয় নিলেও পুলিশ কেন তাদের দেখতে পায় না। একতরফা কথা বলার এই এক মস্ত সুবিধে। অন্যের কথা না শোনার সুবিধে।

আর, শুনতে না চাইলেও যদি লোকগুলো কথা বলেই যায়, তা হলে? সোজা হিসেব। তাদের ‘আর্বান নক্সাল’ বলে দেগে দাও, ব্যবস্থা নাও।

সত্যি, বড় উপকার হল। পক্ষ দুটো জলের মতো পরিষ্কার হয়ে গেল। এই যদি হিসেব হয়, যে কোনও মুক্তবুদ্ধির মানুষের সামনে তবে এখন একটাই কাজ: দেশ জুড়ে ‘আর্বান নক্সাল ফ্রন্ট’ তৈরি করা। কাজটা সহজই। যে কোনও বিষয় ধরে বর্তমান সরকারের সমালোচনা করা, সেটাই যথেষ্ট! দেখাই যাক না, সত্তর বছরে গণতন্ত্র বলতে কী কতটুকু শিখেছি আমরা।