বামফ্রন্ট আমল। মেদিনীপুর তখনও পূর্ব-পশ্চিমে ভাগ হয়নি। কোনও একটি নির্বাচনের খবর সংগ্রহের কাজে সেখানে গিয়েছি। ঘুরতে ঘুরতে পৌঁছেছি বেলদায়। সিপিএমের এক পঞ্চায়েত সদস্যের সঙ্গে কথাবার্তার মধ্যে দুর্নীতির প্রসঙ্গ উঠল। পঞ্চায়েতে সিপিএমের বিরুদ্ধে আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ তখন মুড়ি-মুড়কির মতো হাতে আসত। কোথাও ভুয়ো মাস্টার রোল তৈরি করে টাকা তুলে নেওয়া, কোথাও প্রকৃত প্রাপকের টিপসই জাল করা, কোথাও পুকুর বা রাস্তার কাজ না করেই খরচ দেখানো— এমন বিবিধ অভিযোগের খবরও প্রকাশিত হত। তবে সিপিএমের প্রতাপ বা বিরোধীদের ভিন্ন মানসিকতা, যে কারণেই হোক, আজকের মতো সেই সময় কাটমানি আদায়ের নামে হামলা হত না।

তেমনই এক সময়ে বেলদার ওই ভদ্রলোক বলেছিলেন, ‘‘সৎ-অসৎ ঠিক করা কি এতই সোজা? যিনি পাঁচ হাজার টাকার লোভ সামলাতে পারবেন, তিনি পঞ্চাশ হাজার পেলে নিজেকে ঠিক রাখতে পারবেন কি না, আপনি জানেন? কেউ তো তাঁকে পঞ্চাশ হাজার দিয়ে যাচাই করেনি। আবার পঞ্চাশ হাজার পেয়ে গিয়ে তিনিই পাঁচ লাখের দিকে তাকিয়ে থাকবেন কি না, সেটাও বলা কঠিন।’’

বড় গভীর এই তত্ত্ব। ভেবে দেখার মতো! সত্যিই তো, সততার মাপকাঠি কী, সেটা নির্ধারণের কোনও স্বতঃসিদ্ধ পদ্ধতি আছে কি না, এ সবই তর্কসাপেক্ষ। স্থান-কাল-ব্যক্তি এবং কারণ ভেদে তার সংজ্ঞাও হয়তো বদলে যায়। যেমন, যুধিষ্ঠির কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ জয়ের কৌশলে দ্রোণাচার্যের কাছে গিয়ে উঁচু গলায় জানিয়েছিলেন, ‘অশ্বত্থামা হত’। তার পরে অতি অস্ফুটে উচ্চারণ করেছিলেন, ‘ইতি গজ’। শ্রোতার কান পর্যন্ত সে কথা পৌঁছয়নি। ফলে হাতির বদলে পুত্রের মৃত্যু হয়েছে বুঝে শোকে কাতর হয়ে অস্ত্র ত্যাগ করেছিলেন দ্রোণাচার্য। সততার নিরিখে বিষয়টি যে ভাবেই দেখা হোক, মহাভারতের ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির কিন্তু ব্রহ্মাণ্ডে সত্যনিষ্ঠার সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত।

বঙ্গ রাজনীতিতে তেমনই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সততার প্রতীক রূপে স্বীকৃতি পেয়ে এসেছেন। তাঁর রাজনৈতিক উত্থানে প্রাধান্য পেয়েছে তাঁর অনাড়ম্বর জীবনযাপনের কথা। বিরোধীপক্ষে যাঁরা মমতার সাদামাটা চালচলনকে কটাক্ষ করতে তৎপর, তাঁরাও কিন্তু তাঁর পায়ে হাওয়াই চটি, পরনে সাদা শাড়ি, কাঁধে ঝোলা ব্যাগের চেয়ে বেশি কিছু আজও খুঁজে পান না। নিন্দুকেরা একে যতই ‘লোক দেখানো’ বলে কটাক্ষ করুন, আজীবন এমন কৃচ্ছ্রসাধন তো মুখের কথা নয়! করে দেখাতে পারেন ক’জন? 

বস্তুত জনমনে মমতার এই ভাবমূর্তিই দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠিত। তাঁর ব্যক্তিগত সততার প্রতি বেশির ভাগ সাধারণ মানুষ তাই এখনও শ্রদ্ধাশীল। তাঁর দলের এবং চার পাশের লোকজন সম্পর্কে অভিযোগ নেই, তা তো নয়। কিন্তু ব্যক্তিগত ভাবে মমতাকে মানুষ এ সবের ঊর্ধ্বে বলে বিশ্বাস করেন। এটা তাঁর নিজস্ব অর্জন। তাঁর জোরেরও জায়গা।

তবে হ্যাঁ, ক্ষমতায় আসার পর থেকে কয়েক বছরের মধ্যে তাঁর দলে বিচ্যুতির যে বিষ ঢুকে গিয়েছে, বিভিন্ন স্তরে তা প্রসারিত। ফলে তৃণমূলের নেতা-কর্মী-জনপ্রতিনিধিদের অনেকের রাতারাতি বদলে যাওয়া জীবনযাপন এবং কার্যকলাপ সম্পর্কে জনমানসে বিরূপ ধারণা ক্রমে দৃঢ় আকার নিচ্ছে। তাঁদের কেউ পাঁচ হাজার টাকার লোভ সামলাতে পারছেন না, কেউ হয়তো পাঁচ কোটি টাকার। তবে রোগটা ব্যাপ্ত। এই নির্মম সত্যটি স্বীকার না করা রাজনৈতিক মূর্খামি। লোকসভা ভোটের ধাক্কায় সেই উপলব্ধিটুকু হয়েছে।

তাই আজ মমতার মুখ থেকে নিজের দলের লোকেদের সম্পর্কে ‘কাটমানি’ খাওয়ার কথাটি শোনার পরে চার দিকে এত আলোড়ন। প্রশ্ন উঠছে, সিপিএমের দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন লড়াই করে যিনি ক্ষমতায় এসেছেন, তাঁর দল সেই একই অন্যায় করবে কেন? মমতার দল বলেই বোধ হয় জনমনে এটা বেশি পীড়াদায়ক!

একুশে জুলাইয়ের সমাবেশে দাঁড়িয়ে তৃণমূল নেত্রীকে তাই আরও এক বার নিজের দলের নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে বলতে হয়েছে, ‘‘মানুষের কাজ ভাল ভাবে করতে হবে। সরকারি কাজে ভাগ বসানো যাবে না।’’ তাঁর এত দিন ধরে তৈরি হওয়া স্বচ্ছ ভাবমূর্তির পক্ষে এটা যে কত বড় চাপের এবং বেদনার, সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। 

নিজের হাতে তৈরি দলের কাছে আজ কি এটা মমতার প্রাপ্য ছিল!

তবে রাজনীতি অন্য ভাষায় কথা বলে। সেই জন্য তিনি কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার পাল্টা কর্মসূচি ঘোষণা করে এটাও বুঝিয়ে দিয়েছেন, এ বার আক্রমণই হবে তাঁর আত্মরক্ষার অর্থাৎ দল ‘বাঁচানো’র অন্যতম পন্থা। তৃণমূলের বিরুদ্ধে কাটমানির অভিযোগকে বিজেপির বিরুদ্ধে ব্ল্যাকমানির অভিযোগ তুলে ‘ভোঁতা’ করে দেওয়ার পরিকল্পনাতে সেই ভাবনা স্পষ্ট।

রাজ্য জুড়ে প্রধান বিরোধীর বিরুদ্ধে শাসক যদি এই আন্দোলন শুরু করে, তা হলে বিষয়টি হয়তো মাত্রা পাবে। রাজনীতির ময়দানে এমন একটি দাবি নিয়ে পথে নামার কিছু ফায়দা তো থাকবেই। আর ধোয়া তুলসীপাতাও কেউই নয়। তাই কে কার ব্ল্যাকমানি কোথা থেকে নিল বা কোথায় ঢুকিয়ে রাখল, সেটা প্রমাণের চেয়ে বড় হয়ে উঠবে ‘কালো টাকা ফেরত দাও’ স্লোগানটাই। মেঠো রাজনীতিতে দলকে চাঙ্গা করতে এই ধরনের স্লোগান অনেক সময় ‘কাজ’-এ লেগে যায়। 

এ তো গেল দলের মনোবল বাড়ানোর একটি টোটকা। সাংগঠনিক দুর্বলতার অন্য যে দিকটি মমতা তাঁর একুশের বক্তৃতায় তুলে ধরেছেন, সেটিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। তাঁর দলের নেতা-কর্মীরা জনসংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন, সেই বাস্তবতা তাঁর কথায় পরিষ্কার। লোকসভা ভোটের ফল পর্যালোচনা করতে গিয়ে তিনি এর আগে তৃণমূলকে পুরনো বিরোধী দলের ভূমিকায় ফিরে যেতে বলেছেন। বলেছেন, পুলিশি নির্ভরতা ছেড়ে মাঠে নামতে। আরও এক ধাপ এগিয়ে এ বার তাঁর নির্দেশ: ‘‘গ্রামে যান। বুথ স্তরে গিয়ে চায়ের দোকানে, খাটিয়ায় বসে মানুষের কথা শুনুন।’’

মাত্র আট বছর সরকারে থাকার ফলে একটি দল কেন এ ভাবে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তার কারণ খুঁজতেও গবেষণার প্রয়োজন নেই। এবং এখানেও মমতা তাঁর নিজের রাজনৈতিক জীবনে দৃষ্টান্তস্বরূপ। মুখ্যমন্ত্রীর ঘেরাটোপ উপেক্ষা করে জনসংযোগের ক্ষেত্রে তিনি এখনও আগের মতোই সাবলীল। চলার পথে এখনও তিনি গাড়ি থেকে অনায়াসে নেমে মানুষের কথা শুনতে চলে যান। ভিড়ের দিকে হাত বাড়িয়ে দেন। মানুষ তাঁকে ছুঁতে পারে। রাজনীতিতে, বিশেষ করে মমতা যে ধারার রাজনীতি করে এসেছেন সেখানে, এগুলি খুব কার্যকর।

অথচ, তাঁরই দলের নব্য নেতা-মন্ত্রী বা জনপ্রতিনিধিরা অনেকেই, মনে হয়, ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকাটা নেতাগিরির ‘প্রকাশ’ বলে মনে করেন। ক্ষমতার দর্প জাহির করে মানুষকে সচেতন ভাবেই তাঁরা কাছে আসতে দিতে চান না। তাঁদের অনেকের গাড়ির কালো কাচের আড়াল ভেদ করে মুখই দেখা যায় না। পুলিশ, নিরাপত্তা বাহিনীর দাপট তো আছেই! ক্ষমতার বৃত্তে তাঁরা তাই কার্যত ‘একা’। মানুষ তাঁদের কার্যকলাপে ‘রহস্য’ খোঁজে! 

দলনেত্রী তথা মুখ্যমন্ত্রী মমতা এ সব কিছুই জানতেন না, সেটা বলব না। তবে এখন সমস্যাটি টের পেয়েছেন। ভোটের রায় থেকে তিনি দেখেছেন, জনবিচ্ছিন্নতা শুধু যে দূরত্ব তৈরি করে দিচ্ছে তা-ই নয়, মানুষের অভাব-অভিযোগ জানারও উপায় থাকছে না। এতেও দুর্নীতি দানা বাঁধার সুযোগ পেয়ে যায়। লোকের ক্ষোভ বাড়ে। বিরোধীরা পরিসর পান। তাই তাঁর নিদান, মাটিতে নেমে মানুষের পাশে যেতেই হবে। 

‘কাটমানি’র কথা বলার পরে এ বার ‘উন্নততর’ তৃণমূল গড়তে দলকে এ ভাবেই ফের পরীক্ষায় ফেলে দিলেন নেত্রী স্বয়ং। পরীক্ষা আসলে তাঁদের, যাঁদের সোনার গদি ছেড়ে মাঠে নামতে হবে। গর্বান্ধ যে-সব নেতার মাটিতে পা পড়ে না, তাঁদের সামনে সময় সত্যিই কঠিন!